‘বাঘের কবলে পড়ে পথহারা ছাগ/উদ্ধারি আনিল এক সাধু মহাভাগ।’ বাঘের কবল থেকে উদ্ধার করে নিজের ডেরায় নিয়ে আসা সাধুর মহানুভবতায় মুগ্ধ ছিল অসহায় ছাগশিশু। ‘দিনের আলো নিভে যবে আঁধার ঘেরিল/সাধুবাবার হাতের ছোরা ছাগশিশু হেরিল।’ শেখ সাদি ছাড়া এমন উক্তি আর কেইবা করতে পারেন! জগৎ, জীবন ও সমাজে ঘটনাচক্রে রক্ষকের ঘরে ভক্ষকের ছায়া দেখলেই মনে পড়ে গুণীজনের রেখে যাওয়া এমন অমর উক্তি। গত ১০ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ‘মা মাটি রক্ষা চাই, বালু তোলা বন্ধ চাই’ ধ্বনিসহ হাজির হয়েছিলেন কয়েকশ নারী-পুরুষ। তারা অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনে অনুমতি দেওয়ার কারণে কুমিল্লার জেলা প্রশাসকেরও অপসারণ দাবি করেন। এর কারণ জানতে হলে যেতে হবে কয়েক দশক আগে। এভাবে বালু উত্তোলন শুরুর কারণে যখন সোনারগাঁও এবং মেঘনা উপজেলার নদীকূলবর্তী গ্রামগুলো ভাঙতে শুরু করে সেই সময় থেকেই মরিয়া হয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন এলাকার জনগণ। এমন কোনো দপ্তর নেই যেখানে বাস্তুভিটা রক্ষার জন্য আবেদন করা হয়নি। কিন্তু বালুমহাল বন্ধ করার পরিবর্তে তাদের হতে হয়েছে মিথ্যা ও জটিল মামলার আসামি, করতে হয়েছে হাজতবাস। মেঘনার উত্তর-পশ্চিমকূল থেকে কমলাপুর, কাউয়াটেঙি, ডেঙুরকান্দি এবং দক্ষিণকূল থেকে নলচর (পুরান গ্রাম) ষোল আনা রামপ্রসাদেরচরের ১০৮টির মতো বাড়ি নদীগর্ভে হারিয়ে যাওয়ার পর একপলকে ১৫টি বাড়ি, প্রাচীন একটি মসজিদ ও প্রায় ৫০ একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে সচিত্র সংবাদ প্রকাশের পর ঘুম ভাঙে প্রশাসনের।
প্রশাসন বাস্তুহারাদের পাশে এসে দাঁড়ায়, বিলায় কিছু সাহায্যও। সাহায্য-সহায়তাসহ প্রক্রিয়া শুরু হয় ভাঙনের জন্য দায়ী বালুমহালগুলো বন্ধ করে দেওয়ার। বন্ধ করার প্রক্রিয়ায়, সেদিন প্রশাসন থেকে যারা সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তা মেঘনা, বিভাগীয় প্রকৌশলী কুমিল্লা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেঘনা। তারা বিগত ২০০৮ সালের ২২ মার্চ বালুমহালগুলো সরেজমিন পরিদর্শন এবং ঘটনা তদন্ত করেন। সরেজমিন তদন্তের পর তারা প্রতিবেদনে লেখেন ‘মেঘনা উপজেলাধীন রামপ্রসাদেরচর গ্রামের আবাসনজনিত নিরাপত্তা বিবেচনা করে আলোচ্য বালুমহাল দুটি ১৪১৫ বঙ্গাব্দের জন্য ইজারা প্রদান না করা সমীচীন বলে আমরা মনে করি।’ এইমর্মে গত ২৩ মার্চ ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে জেলা প্রশাসক কুমিল্লা বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করেন তারা। বালু উত্তোলন বন্ধ হয়, বন্ধ হয় ভাঙনের তাণ্ডবও। মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেন। এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগসহ নতুন নতুন রাস্তা-কালভার্ট হয়। ধুমধাম করে পাকা-সেমিপাকা বাড়িঘর নির্মাণ শুরু হয়। নদীর উত্তর দিকে নুনেরটেক এলাকায় ভেসে ওঠা চরের নতুন নাম হয় ‘মিনি কক্সবাজার’। শহর ছেড়ে হাউজিং কোম্পানি ও শিল্প মালিকরা জমি কিনতে শুরু করেন। মানুষের নিরাপত্তা ও আনন্দের জন্য শুরু হয় বালুমহাল দুটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার প্রক্রিয়া। এ উদ্দেশে, বালুমহাল ইজারা প্রদান সংক্রান্ত অন্তঃসংস্থা কমিটির গত ৫/৯/২০১০ ইং তারিখের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে যে সিদ্ধান্ত হয় তাতে লেখা হয় ‘মেঘনা নদী বালুমহাল: নলচর মেঘনা নদী ভাষানিয়া বালুমহাল এবং ৬ নম্বর সেনেরচর ও ১ নম্বর সাপমারা চরেরগাঁও বালুমহালের বিষয়ে ইউএনও মেঘনা জানান, স্থানীয় জনগণের প্রবল আপত্তি এবং নদীভাঙনের সমূহ সম্ভাবনা থাকায় উক্ত বালুমহালগুলো ইজারা দেওয়া সম্ভব হবে না। তা ছাড়া মামলা চলমান থাকায় উক্ত বালুমহালগুলো বিলুপ্ত করাও সমীচীন হবে না। মামলা নিষ্পত্তির পর উক্ত বালুমহালগুলো বিলুপ্তির প্রস্তাব প্রেরণ করা হবে।’
অন্তঃসংস্থা কমিটির এই সিদ্ধান্তের স্মারক ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, পানি উন্নয়ন বোর্ড কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেঘনা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক বরাবর প্রেরণও করা হয়। একই সঙ্গে অবৈধভাবে বালু চুরির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। ১৪১৫ বঙ্গাব্দ থেকে ১৫২৫ বঙ্গাব্দ এগারো বছর, লিজ প্রক্রিয়া শুরু হলেই কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মতামত চান সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের কাছে। উপজেলা প্রশাসন প্রতিবারই গত ২৩ মার্চ ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের মতো জেলা প্রশাসক কুমিল্লা বরাবর রিপোর্ট দাখিল করেন। উপজেলা প্রশাসনের রিপোর্টের ভিত্তিতে মহালগুলো বন্ধ রেখে তৎকালীন জেলা প্রশাসক, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যানরা দায়িত্বশীল অভিভাবকের মতোই এলাকার জনগণের পাশে থেকেছেন। বাস্তুহীন মানুষ ভুলতে শুরু করেছিলেন বাস্তু হারানোর পুরনো ক্ষত। শুধু তাই নয়, অন্তঃসংস্থা কমিটির গত ৫/৯/২০১০ ইং তারিখের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তনুসারে বালুমহাল নিয়ে বিরাজমান মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তির পর উক্ত বালুমহালগুলো বিলুপ্তির প্রস্তাব প্রেরণ করা হবে বলে আশ^স্ত করা হয় সবাইকে। এমন সময় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো জানতে পারেন, গত ১৯/২/২০১৯ ইং তারিখের এক পরিপত্রে ১৪২৬ বঙ্গাব্দের জন্য (বন্ধ থাকা) ৬ নম্বর সেনেরচর ও ১ নম্বরর সাপমারা চরেরগাঁও বালুমহাল লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘৬ নম্বর সেনেরচর ও ১ নম্বর সাপমারা চরেরগাঁও বালুমহাল (পরিমাণ ৭৪.১০ একর) নিয়ে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নম্বর ২৯২৫/২০১২ মামলা চলমান থাকলেও কোনো স্থগিতাদেশ না থাকায় উক্ত বালুমহালগুলো ২৪২৬ বাংলা সনের জন্য ইজারা প্রদানের লক্ষ্যেৃ অনুমোদন দেওয়া হলো।’ (স্বাক্ষর : জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক) তারিখ ৭/২/২০১৯, জেলা প্রশাসক কুমিল্লা, সভাপতি জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটি, কুমিল্লা।)
জেলা প্রশাসক একবারও ভাবেননি, ‘মামলা চলমান থাকলেও কোনো স্থগিতাদেশ না থাকা’ এর সঙ্গে ‘গ্রামের আবাসনজনিত নিরাপত্তা’ ও ‘নিরাপত্তাহীনতার’ সম্পর্ক কী! এরপর ওই এলাকার আতঙ্কিত জনগণ শুরু করেন দিগি¦দিক দৌড়াদৌড়ি। নির্বাচনের আগে ইউপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানরা জনগণের কাছে অঙ্গীকার করেছিলেন, ‘নির্বাচনে বিজয়ী হলে অত্র এলাকা থেকে চিরতরে বালু উত্তোলন বন্ধ করব।’ জনগণ হাজির হয় উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে। উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ সাইফুল্লাহ মিয়া রতন শিকদার তার ‘উপজেলা পরিষদ মেঘনা, কুমিল্লা’ প্যাডে স্মারক নং উপকা/মেঘনা/২০১৯-১৭ মূলে গত ১৩/৬/২০১৯ জেলা প্রশাসক বরাবর ইজারা বাতিলের জন্য আবেদন করে দরখাস্তের একাংশে বলেন ‘৬ নম্বর সেনেরচর মৌজায় ৪৩৫ থেকে ৪৪০, ৪৬০ থেকে ৪৬৫, ৪৬৯, ৪৭০, ৪৭২, ৪৭৩ নম্বর দাগের আবাদি জমি ৪০/৫০টি ড্রেজার দ্বারা নদীগর্ভে বিলুপ্ত করে। এলাকাবাসীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমি সরেজমিন গত ২/৬/২০১৯ ইং তারিখে স্থানীয় চালিভাঙ্গা ইউনিয়ন চেয়ারম্যানসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বিষয়টি তদন্ত করি। এলাকাবাসী থেকে জানা যায় যে, ইজারাদার মেসার্স ফরহাদ ট্রেডার্স দিনেরাতে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে গত ২০/৫/২০১৯ ইং একদিনেই প্রায় ১২০ বিঘা আবাদি জমি ও সরকারি খাসজমি ভূমিহীনদের নামে বন্দোবস্ত দেওয়া জমি নদীগর্ভে বিলুপ্ত হয়েছে। যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১০৮ কোটি টাকা। অনুরূপ অবৈধ বালু উত্তোলন চলতে থাকলে রামপ্রসাদেরচর, নলচর, ফরাজীকান্দী ও মৈশারচর গ্রামগুলো ও সেখানে বসবাসকারীদের সহায়-সম্পত্তি মেঘনার মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।’
পত্র-পত্রিকাসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবকিছু অবগত হওয়ার পরেও জেলা প্রশাসক কারও কথায় কর্ণপাত না করে বঙ্গাব্দের জন্য পুনরায় লিজ দিয়েছেন যথাক্রমে মেসার্স ভূইয়া এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স নার্গিস ট্রেডার্স বরাবর (স্মারক নম্বর ০৫.৪২. ১৯৭৫.০০. ১৮.০০১. ২০. ৩৩৯ ও ৩৪১ মূলে ১৪২৭)। আর মেসার্স ভূইয়া এন্টারপ্রাইজের ড্রেজারগুলো তাদের মহাল (২ নম্বর ভাষানিয়া দড়িচর মৌজাস্থ বিএস ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ১ দাগে ১৪.৮০ একর) ছেড়ে জোরপূর্বক কয়েকশ গজ পূর্ব/দক্ষিণে সেনেরচর মৌজার গ্রামঘেঁষে বালু উত্তোলন শুরু করে। ড্রেজারগুলো ফজরের আজান থেকে শুরু করে এশার আজান পর্যন্ত বালু উত্তোলন করে বলে গ্রামবাসীর অভিযোগ। এদিকে এক কিলোমিটার লম্বা সমাজবদ্ধ গ্রামটি তলিয়ে যাওয়ার ফলে বিলসহ সারা মাঠে ছড়িয়ে পড়েছে বসতি। নতুন বসতির কাছেও চলে গেছে ভাঙন। বালুখোরদের রোধ করা না গেলে নতুন বসতিও ভাঙনের কবলে পড়বে। শিশু সন্তান, হাঁড়িপাতিল ও কাঁথা-বালিশ নিয়ে আবার কোথায় যাবে বাস্তুহীন মানুষ! জানা যায়, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি এতদিন যারা বালুখোরদের হাত থেকে বাস্তুহীনদের আগলে রাখতেন তাদের চোখেও আজ অবিশ্বাসের ছায়া। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে তাদের অনেকেও কিনা জড়িয়ে পড়েছেন বালুমহালের সঙ্গে। তাই গরিব অসহায় মানুষের কান্না কোনোভাবেই সরকারের কানে পৌঁছে না।
লেখক আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক
