মহামারীর মধ্যেও আকর্ষণীয় মুনাফা লাফার্জহোলসিমের

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ০৩:১২ এএম

করোনাভাইরাসের সৃষ্ট মহামারী ও সিমেন্টের বাজারে তৈরি কঠিন প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেড আকর্ষণীয় মুনাফা করেছে। চলতি হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সিমেন্টের বিক্রিও বেড়েছে। একই সময়ে উৎপাদন ও আয়কর বাবদ কম ব্যয় হওয়ায় কোম্পানিটির নিট মুনাফায় উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। আগের বছরের তুলনায় চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে লাফার্জহোলসিমের নিট মুনাফা বেড়েছে ৭১ শতাংশ। তৃতীয় প্রান্তিকের সাফল্যের প্রভাব চলতি হিসাব বছরের নয় মাসেও পড়েছে। এর ফলে মহামারীর মধ্যেও কোম্পানিটি নিট মুনাফায় ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে।

বিশ^ব্যাপী করোনা সংক্রমণের প্রভাব চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে দেশে পড়তে শুরু করে। এই মহামারীর প্রভাব রুখতে গত ২৫ মার্চ থেকে টানা ৬৬ দিনের সরকারি লকডাউনে অচল হয়ে পড়ে দেশের অর্থনীতি। এ সময় উৎপাদনসহ প্রায় সব খাতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অন্যান্য শিল্পের পাশাপাশি নির্মাণসংশ্লিষ্ট সিমেন্ট খাতও ক্ষতির মুখে পড়ে। পরে ৩১ মে থেকে দেশ স্বাভাবিক কার্যক্রমে ধীরে ধীরে ফিরে আসতে শুরু করলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি আসে। এতে সিমেন্টসহ নির্মাণসংশ্লিষ্ট খাতগুলোও সচল হতে থাকে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে জীবনযাত্রাও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। যদিও এখনো মহামারীর প্রভাব রয়ে গেছে। বাংলাদেশসহ পুরো বিশ^ এখনো উচ্চ সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে করোনায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম চালাচ্ছে শিল্প। 

পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি ২০২০ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে লাফার্জহোলসিমের সিমেন্ট ও ক্লিংকার বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ৩৬৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৫৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এই প্রান্তিকে বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ শতাংশ। চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে উৎপাদন ব্যয় শেষে মোট আয় হয়েছে ১২৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। গত বছর মোট বিক্রির ৭০ দশমিক ৭৫ শতাংশ ব্যয় হয় উৎপাদনে, যা চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ৬৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

লাফার্জহোলসিমের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কোম্পানিটির ব্যয় সংকোচন ও পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। এই প্রান্তিকে সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, চুক্তি পর্যালোচনা ও উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধিতে কোম্পানিটি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে, যা তুলনামূলক কম বিক্রি প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কোম্পানির সামগ্রিক আর্থিক ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির স্থায়ী খরচ ও অন্যান্য ব্যয় গত বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে লাফার্জহোলসিমের পরিচালন মুনাফা হয় ৮৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬৪ কোটি ১৮ লাখ টাকা। চলতি বছর কোম্পানির সুদবাবদ ব্যয়ও কমেছে। ফলে কর-পূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৮০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এ সময়ে কোম্পানিটির আয়কর বাবদ ব্যয়ও কম হয়েছ। লাফার্জ জানিয়েছে, গত বছর হোলসিমকে ৩৫ শতাংশ কর দিতে হয়। তবে চলতি বছর হোলসিমকে তালিকাভুক্ত কোম্পানি লাফার্জ অধিগ্রহণ করায় কোম্পানির আয়করের পরিমাণ ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। নিট মুনাফা বৃদ্ধির এটি প্রধান কারণ।

চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে লাফার্জহোলসিমকে আয়কর বাবদ ব্যয় করতে হয় ১৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে বিক্রি কিছুটা কম থাকলেও আয়কর বাবদ ব্যয় ছিল ২০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে নিট মুনাফা হয় ৬৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে আয়কর বাবদ ব্যয়ের পরিবর্তে বিলম্বিত কর সুবিধা পেয়েছে লাফার্জহোলসিম। যেখানে ২০১৯ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আয়কর বাবদ ব্যয় ছিল ২৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা, সেখানে চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে উল্টো বিলম্বিত কর থেকে আয় হয়েছে ৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।  ফলে করোনার মধ্যে বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার পরও বিলম্বিত করসুবিধার কারণে চলতি দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটি নিট মুনাফায় রয়েছে। এ সময় নিট মুনাফা হয়েছে ৩২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা।

নিট মুনাফায় সাফল্য সম্পর্কে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী ও কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ রাজেশ সুরানা বলেন, ‘কর্মী ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য আমরা গর্বিত এবং গ্রাহকদের আস্থার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। সময়োপযোগী স্বাস্থ্য, ব্যয় ও তারল্য নিয়ে আমাদের পদক্ষেপগুলো দ্রুততার সঙ্গে ডিজিটাল উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে করোনাকালীন সংকটেও বাজারে আমাদের অবস্থান দৃঢ় হয়েছে।’

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, করোনা মহামারীর মধ্যে পরিচালন দক্ষতার কারণে লাফার্জহোলসিম মুনাফার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। চলতি অর্ধবার্ষিকীতে কোম্পানির পণ্য বিক্রি থেকে আয় ২০ শতাংশ কমে গেলেও বিলম্বিত করসুবিধার কারণে কোম্পানিটি নিট মুনাফা ধরে রাখতে পেরেছে। চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) কোম্পানির বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ কমলেও নিট মুনাফা ২৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। মূলত উৎপাদন, বিক্রি, বিপণন, সুদ ও আয়কর বাবদ ব্যয় কমে আসায় নিট মুনাফায় ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে কোম্পানিটি। চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে লাফার্জহোলসিমের নিট মুনাফা হয়েছে ১৪৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত