ব্যর্থ হস্তক্ষেপে বাজার নিয়ন্ত্রণহীন

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২০, ০৩:৪৭ এএম

বছরজুড়ে চলছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজার নিয়ন্ত্রণে আশ^াস দেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনাও করা হচ্ছে। কিন্তু সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি, পর্যাপ্ত জনবল না থাকা, বাজার তদারকিতে সমন্বয়হীনতা ও আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাবে কোনোভাবেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সময়ে সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

গত বছর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারির পর দেশের বাজারে পণ্যটির দাম ২৬০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। ভবিষ্যতে যাতে এ অবস্থায় না পড়তে হয় সে জন্য বাজার বিশ্লেষকরা বারবার সরকারকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও গত মার্চে জানিয়েছিলেন পেঁয়াজ নিয়ে যাতে কোনো সংকট না হয় সে জন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে ৩ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করা হবে। আগস্টে ভারতে যখন পেঁয়াজ সংকট দেখা দেয় তখনো বাজারসংশ্লিষ্টরা সরকারকে সতর্ক করেন। তখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, পেঁয়াজ নিয়ে এবার কোনো সংকট হবে না। কিন্তু ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে পণ্যটির দামে সেঞ্চুরি করে। এরপর তড়িঘড়ি করে আমদানিতে যায় সরকার।

দেশে প্রতি বছর ৮০ লাখ টন আলুর চাহিদা রয়েছে। আর গত মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ৯২ লাখ টন। কৃষক তার সংরক্ষিত আলু বিক্রি করতে পারছেন না। অথচ বাজারে পণ্যটির দাম দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিগুণ বেড়ে ৫৫-৬০ টাকায় বিক্রি হয়। এ নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হইচই পড়লে প্রশাসন মাঠে নামে। প্রশাসন জানিয়েছে, কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা কারসাজি করে এর দাম বাড়িয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কোল্ড স্টোরেজ মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। কয়েক দিন আগে বাজারে চালের দাম পাইকারিতে নির্ধারণ করে দেয় সরকার। আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার করে দেয়। কিন্তু বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। আগের মতোই বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, আলু ৫০-৬০, পেঁপে ৪০-৫০, ঢেঁড়স ৬০, বেগুন ও বরবটি ৮০-১০০, উচ্ছে ১০০, চিচিঙা, ঝিঙা, পটোল ৭০-৮০, রসুন ১২০, শিম ১২০-১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৫৮-৬০ ও মাঝারি মানের চাল ৫২-৫৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। ছোট আকারের রুই-কাতলা ২০০-২২০ ও বড় আকারের ৩৫০-৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। প্রতি কেজি পাঙাশ ১৪০, তেলাপিয়া ১৪০-১৭০, পাবদা ৩৫০-৪৫০ ও হাইব্রিড কই মাছ ২০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। ব্রয়লার মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৩০-১৩৫ টাকা এবং ফার্মের ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১১৫ টাকা দরে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপপরিচালক দেওয়ান আশরাফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দিলেও আমরা অভিযান পরিচালনা করি না। জেলা পর্যায়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং রাজধানীতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ভোক্তা অধিকার ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন অভিযান পরিচালনা করে। রাজধানীতে এখনো তেমন জোরালো তদারকি শুরু না হলেও রাজধানীর বাইরে প্রশাসন এখন সক্রিয়। আশা করছি রাজধানীতেও কঠোর অবস্থানে যাবে প্রশাসন।’

আলুর দামের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আলুর দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার পর জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি দিয়েছিলাম। এ ছাড়া আলুর দাম বাড়ার কারণ ক্ষতিয়ে দেখেছি আমরা। সেখানে দেখতে পাচ্ছি কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা দাম কারসাজিতে দায়ী। এ জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কোল্ড স্টোরেজগুলোতে তদারকি বাড়াতে।’

দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কোনো ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশে মুক্তবাণিজ্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু থাকলেও বেশ কিছু নিত্যপণ্যে সরকার সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করে দিতে পারে। আইনের ক্ষমতাবলে কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। ধানের দাম নির্ধারণ করে কৃষি মন্ত্রণালয়। আমদানিকৃত পণ্যের দাম ট্যারিফ কমিশনের প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চাইলে অন্যান্য পণ্যের দামও নির্ধরাণ করে দিতে পারে। তবে এসব পণ্যের তদারকিতে রয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠান। বাণিজ্য আইন ও ভোক্তা অধিকার আইনের ওপর ভিত্তি করে মাঝেমধ্যে তারা অভিযানে নামে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এই তদারকি খুবই কম বলে স্বীকার করছেন খোদ ওই সব প্রতিষ্ঠানের কর্তারা। আর এ জন্য কেউবা দায়ী করছেন বিধিমালা না থাকাকে আবার কেউ দায়ী করছেন জনবল সংকটকে। আর এই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠের অসাধু ব্যবসায়ীরা। তাদের ইচ্ছেমতো চলে বাজারব্যবস্থা।

আইনে কৃষিপণ্যের বাজার তদারকির ক্ষমতা রয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের। ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর কৃষি বিপণন আইন-২০১৮ সালে পাস হলেও এখনো তারা বিধিমালা করতে পারেনি। তাই প্রতিষ্ঠানটি কেবল পণ্যের দাম নির্ধারণ ও বাজারদরের হালনাগাদে কার্যক্রম গুটিয়ে রেখেছে। সেখানেও রয়েছে জনবল সংকট।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ইউসুফ মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিধিমালা প্রস্তুতের কাজ করছি। এটি সম্পন্ন হলে লোকবল নিয়োগ দিয়ে বাজারে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে।’

বাজার তদারকির আরেক প্রতিষ্ঠান ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি জন্ম নিলেও ২০১৪ সালে এর কার্যক্রম শুরু হয়। জনবল সংকটে ধুঁকতে থাকা প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত দেশের সব জেলায় সহকারী পরিচালক নিয়োগ দিতে পারেনি। তাই সারা দেশে জোরালোভাবে অভিযান চালাতে পারছে না তারা। রাজধানীতে মাঝেমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি কিছু ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। কয়েক দিন ধরে তারা বাজার তদারকি করছে। তবে এটিকে প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রতুল বলে দাবি করছেন খোদ প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

ভোক্তা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল ৩৯টি দলে ভাগ হয়ে ৭৯টি বাজারে অভিযান চালায় প্রতিষ্ঠানটি। এ সময় বিভিন্ন অভিযোগে ৯৬টি প্রতিষ্ঠানকে ৬ লাখ ৫১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে রাজধানীতে ৫টি বাজারে অভিযান চালানো হয়। রাজধানীর যেসব বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে, সেসব বাজার ঘুরে গতকাল সন্ধ্যায় দেখা যায়, সব পণ্যের দামই চড়া।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোক্তা অধিকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ঠিকমতো বাজার তদারকি না করতে পারার মূল কারণ জনবল সংকট। এ ছাড়া ব্যবসায়ীরা এতটাই অসৎ যে তারা কোনো কিছুই মানতে চান না। আইনে শাস্তির বিধান কম হওয়ায় বড় ব্যবসায়ীরা বারবার একই কাজ করছেন। তাই দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় শুধু আমাদের ঘাড়ে দিলে হবে না।’

রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজারে ঘুরে নিয়মিত বাজার করেন এমন কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে আলাপ করে দেশ রূপান্তর। তারা অভিযোগ করেন, এক মাসেও বাজারে প্রশাসনের কোনো তদারকি চোখে পড়েনি। তবে কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, মাঝেমধ্যে ভোক্তা অধিকারের লোকজন এসে ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে চলে যায়। অনেককে জরিমানাও করে। এরপর আর তাদের চোখে পড়ে না।

আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, নগরীর সর্বত্রই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি চলছে। পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দামের মধ্যেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। সরকার নির্ধারিত দামে কেউ আলু বিক্রি করছে না। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো তৎপরতা নেই। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আলুর দাম নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিলেও তা কোথাও কার্যকর হয়নি। মাঝেমধ্যে নগরীতে ভোক্তা অধিকার ও জেলা প্রশাসক অভিযান পরিচালনা করলেও প্রশাসনের লোকজন চলে আসার পরে আবারও সেই আগের দামেই পণ্য বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা। গতকালও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগরীর কয়েকটি বাজার তদারকি করে প্রশাসন। তারা পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়।

বাজার তদারকির পর ভোক্তা অধিকারের চট্টগ্রাম জেলার সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আলুর দাম নিয়ে আজ (বৃহস্পতিবার) ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। তারা কথা দিয়েছেন পাইকারিতে আলু ২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করবেন। তবে খুচরায় দাম কমতে একটু সময় লাগবে। শুক্রবারও বাজার তদারকি করব। কেউ কারসাজি করলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ তবে তিনি স্থান ত্যাগ করার পর আবারও আগের মতো অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি শুরু করেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সহসভাপতি ও  আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজারকে নষ্ট করছেন। এর দায় আমরা নেব না। প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিক। আইনের পরিবর্তন করার প্রয়োজন হলে করবে। দুই সপ্তাহের মধ্যে যদি ধর্ষণ আইন পরিবর্তন করা যায় তাহলে ভোক্তা আইনের কোনো পরিবর্তনে এত দেরি?’

বর্তমানে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। দেশে থাকা অবস্থায় তিনি জানিয়েছিলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে তারা সর্বত্র চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দীনের সঙ্গে দুই দিন ধরে তার মোবাইল ফোনে কল ও এসএমএস দিলেও তিনি কল ধরেননি বা কোনো উত্তর দেননি।

ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘ভোক্তার স্বার্থে একটি আইন আছে। ভোক্তা অধিকার নিরলসভাবে কাজ করছে। আমার মনে হয় আইনে জরিমানার পাশাপাশি যে জেলের বিধান আছে সেটিরও প্রয়োগ করতে হবে। সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বাজারে পণ্যের ঘাটতি থাকলে সরকারের তা পূরণ করতে হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কেবল দাম নির্ধারণ করে দিলেই বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত