সিলেট নগরের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে যুবক রায়হান আহমদের মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়া এখনো অধরা। তাকে ধরতে কাজ করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তিনি যাতে কোনোভাবেই দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন, সে জন্যদেশের সব ইমিগ্রেশনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। আকবরের খোঁজ পেতে এখন চেষ্টা চালাচ্ছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশও (এসএমপি)। যে আকবরকে ধরতে এখন এত আয়োজন আর প্রচেষ্টা, সেই আকবর কিন্তু পুলিশের হাতের নাগালেই ছিলেন। তাই প্রশ্ন উঠেছে, তিনি পালালেন কীভাবে, সেই সুযোগই বা পেলেন কী করে। এদিকে এসআই আকবর গা ঢাকা দেওয়ার আগে ফাঁড়িতে রায়হানকে নির্যাতনের কিছু আলামত মুছে ফেলেন বলে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে।
বন্দরবাজার ফাঁড়িটি এসএমপির উত্তর জোনের আওতায়। ফাঁড়িতে নির্যাতনে যুবক রায়হানের মৃত্যুর পর ফাঁড়ির ইনচার্জ আকবরই ছিলেন আলোচনার মূল কেন্দ্রে। ঘটনার পরপরই এসএমপির প্রাথমিক তদন্তের আলোকে ইনচার্জ আকবর ও তিন কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত এবং দুই এএসআই ও এক কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করা হয়। বরখাস্ত ও প্রত্যাহারকৃত পুলিশ সদস্যদের পুলিশ লাইনসে যুক্ত করা হয়। এরপরই গা ঢাকা দেন এসআই আকবর। অভিযোগ উঠেছে, এসএমপির উত্তর জোনের কর্মকর্তাদের ঢিলেমির কারণেই আকবর পালানোর সুযোগ পেয়েছেন। এমনকি কেউ কেউ বলছেন, তারাই তাকে পালানোর সুযোগ করে দিয়েছেন। অবশ্য আকবর লাপাত্তা হয়ে গেলেও ফাঁড়িতে তার অধীনে কাজ করা অন্য ছয়জন ঠিকই পুলিশের কবজায় রয়েছেন। এসএমপির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বন্দরবাজার ফাঁড়ির তৎকালীন দুজন এএসআই ও চারজন কনস্টেবল পুলিশের কড়া পাহারায় রয়েছেন। মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই চাইলেই তাদের কাছে এদের হস্তান্তর করা হবে।
রায়হানের মৃত্যুর পরদিনই এসআই আকবরসহ ফাঁড়ির চার পুলিশকে সাময়িক বরখাস্ত ও তিনজনকে প্রত্যাহার করে এসএমপি। নিয়ম অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্তকৃতদের প্রতিদিন পুলিশ লাইনসে হাজিরা দেওয়ার কথা। কিন্তু বরখাস্ত হওয়ার পরদিন আর পুলিশ লাইনসে হাজিরা দেননি আকবর। তার মোবাইল ফোনও বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই খবর রটতে থাকে আকবর লাপাত্তা হয়েছেন। কিন্তু এসএমপির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বিষয়টি স্বীকার করতে রাজি হননি।
ওই সময় এসএমপির গণমাধ্যমসংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখভালের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত উপকমিশনার জ্যোতির্ময় সরকার বলেছিলেন, ‘আকবর লাপাত্তা কি না, সেটা আমার জানা নেই। আকবর লাপাত্তা এ কথাও আমি কোনো মিডিয়াকে বলিনি। আকবরের তো পুলিশ লাইনসেই থাকার কথা।’ এমন বক্তব্যের পরদিন গত বুধবার এসএমপির গণমাধ্যমসংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখভালের দায়িত্ব থেকে জ্যোতির্ময় সরকারকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার জায়গায় এখন দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত উপকমিশনার বি এম আশরাফ উল্লাহ তাহের।
ফাঁড়িতে রায়হানকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগের পরও ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর পালানোর ঘটনায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশে এখন চাপা ক্ষোভ-অসন্তোষ ও হুলস্থূল চলছে। পুলিশ সদর দপ্তরের চাপে পড়েছেন এসএমপির শীর্ষ কর্তারা। দিতে হচ্ছে নানা প্রশ্নের জবাব। তাদের দায়িত্বশীলতাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসএমপির একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আকবর আমাদের ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়েছেন। ঘটনার পর এসআই আকবর পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, আমি কেন পালাব, আমি তো কোনো কিছু করিনি। তাকে (নিহত রায়হান) মারিনি। তাহলে পালিয়ে কেন অযথা ঝামেলা বাড়াব।’
এসআই আকবরের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এসএমপি কমিশনার গোলাম কিবরিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসআই আকবরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পিবিআইও তাকে খুঁজছে। ইতিমধ্যে একাধিক অভিযান হয়েছে। তবে তাকে পাওয়া যায়নি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আকবরকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এসব কথা অবান্তর, অযৌক্তিক।’
লাপাত্তার আগে কিছু আলামত মুছে ফেলেন আকবর : এসআই আকবর গা ঢাকা দেওয়ার আগে ফাঁড়িতে রায়হানকে নির্যাতনের আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করেন বলে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে। এমনকি তিনি কিছু আলামত মুছেও ফেলেন। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, প্রযুক্তিতে পারদর্শী এক বন্ধুর সহায়তায় এসআই আকবর ফাঁড়ির ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার হার্ডডিস্ক খুলে সেখানে নতুন ডিস্ক লাগিয়েছেন। অবশ্য এ বিষয়টি এখনো স্বীকার করেননি এসএমপির কর্মকর্তারা।
এদিকে রায়হানের মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সিলেটের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতারা রায়হানের বাসায় গিয়ে তার পরিবারকে সান্ত¡না জানালেও তাৎক্ষণিক যাননি এসএমপি কমিশনার। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে ঘটনার পাঁচ দিন পর গত বৃহস্পতিবার তিনি রায়হানের বাসায় গিয়ে রায়হান হত্যায় জড়িতদের বিচারে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ^াস দেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের বেড়তলা বগইর গ্রামের জাফর আলী ভূঁইয়ার ছেলে আকবর হোসেন ভূঁইয়া পুলিশে যোগ দেন ২০১৪ সালে। বছরখানেক আগে তিনি সিলেটের বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পান। নগরীর ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র বন্দর ফাঁড়ির দায়িত্ব পেয়ে টাকার নেশায় বুঁদ হয়েছিলেন আকবর। রাতারাতি টাকার পাহাড়ও গড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার বাড়িতে উঠেছে আলিশান দালান। বন্দরবাজার ফাঁড়িতে দায়িত্ব নেওয়ার পর এসআই আকবর হকারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারী সিন্ডিকেটের কাছ থেকে টাকা নেওয়া এবং বন্দরের কয়েকটি আবাসিক হোটেলে যৌন ব্যবসার সুযোগ দিয়ে মাসোহারা আদায় করতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১০ অক্টোবর রাতে নগরীর আখালিয়ার নেহারিপাড়ার মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে রায়হান আহমদকে ধরে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নিয়ে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় পুলিশের মোবাইল ফোন থেকে বাসায় ফোন করে রায়হান বলেছিলেন, তাড়াতাড়ি ১০ হাজার টাকা নিয়ে ফাঁড়িতে গিয়ে তাকে বাঁচাতে। পরে তার চাচা ফাঁড়িতে ছুটে গেলেও পুলিশ জানায়, রায়হান অসুস্থ হওয়ায় তাকে ওসমানী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সেখানে গিয়ে মর্গে রায়হানের লাশ পান পরিবারের সদস্যরা।
