ফেনীতে ধর্ষণবিরোধী লংমার্চে হামলা আহত ৩৩

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২০, ০২:৫৮ এএম

ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে ঢাকা থেকে নোয়াখালী অভিমুখী লংমার্চ ফেনীতে হামলার শিকার হয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে ফেনী শহরের মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স মোড় এলাকায় লাঠিসোটা ও ইট নিয়ে এই হামলা চালায় একদল যুবক। হামলাকারীরা স্থানীয় যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বলে লংমার্চকারীদের অভিযোগ। এর আগে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলায় লংমার্চকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষমাণ নেতাকর্মীদের ওপরও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা হামলা করেছে বলে অভিযোগ করেছে বাম  ফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ। তবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করা হয়েছে। হামলার সময় পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় ছিল বলেও অভিযোগ করেছে লংমার্চকারীরা।

হামলাকারীরা লংমার্চকারীদের বহনকারী ছয়টি বাস ভাঙচুর করে। হামলায় ছাত্র ইউনিয়নসহ বাম ছাত্রজোটের অন্তত ৩০ নেতাকর্মী এবং ফেনীর তিন সাংবাদিকের আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

হামলার পর লংমার্চকারীরা নোয়াখালীর পথে রওনা হয়। সেখানে বিকেলে সমাবেশের মধ্য দিয়ে তাদের পূর্বঘোষিত দুদিনের কর্মসূচি শেষ হয়। নোয়াখালীতে সমাবেশে ফেনীর হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। সমাবেশ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ১৯ অক্টোবর সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ এবং ২১ অক্টোবর সারাদেশে রাজপথ অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়।

ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গণজাগরণ তৈরির লক্ষ্যে গত শুক্রবার শাহবাগ থেকে ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ ব্যানারে নোয়াখালীর পথে লংমার্চ শুরু হয়। বাম ছাত্র সংগঠনগুলো ছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও নারী সংগঠন এতে যোগ দেয়। ঢাকা থেকে রওনা হয়ে বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করে শুক্রবার কুমিল্লাতে অবস্থান নিয়েছিল পাঁচশ’র বেশি লংমার্চকারী। সেখানে থেকে গতকাল সকালে তারা আসে ফেনীতে। সকাল পৌনে ১০টায় লংমার্চ বহরটি ফেনীর শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক হয়ে শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশে মিলিত হয়। এসময় শহীদ বেদিতে তারা গণসংগীত ও পথনাটক উপস্থাপন করে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সমাবেশ চলাকালে লংমার্চকারীরা ট্রাংক রোডের দোয়েল চত্বরে জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর ছবি সংবলিত ফেস্টুনে ধর্ষণের প্রতীকী চিহ্ন ও ধর্ষণবিরোধী সেøাগান লিখেন। এছাড়া সমাবেশে সরকারবিরোধী ও পুলিশকে উদ্দেশ করে মুহুর্মুহু সেøাগান দেওয়া হলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সমাবেশ শেষে লংমার্চকারীরা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একলাশপুরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলে পথে শহরের মিশন হাসপাতালের সামনে দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। এরপর লংমার্চ আদালতপাড়া সংলগ্ন নির্মাণ সুপার মার্কেটের সামনে পৌঁছলে দ্বিতীয় দফা হামলা চালানো হয়।

ছাত্র ইউনিয়ন ও বাম জোটের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করে বলেন, গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফেনীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ শেষে লংমার্চ করে পুরাতন ট্রাংক রোড হয়ে নোয়াখালী অভিমুখে যাত্রাকালে শহরের নির্মাণ সুপার মার্কেটের সামনে পৌঁছালে হামলার ঘটনা ঘটে। এসময় ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীরা এলোপাতাড়ি লাঠিপেটা শুরু করে। হামলায় ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অনিক রায়, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মেহেদী নোবেল, আসমা আক্তার, আসমানি আশা, শাহাদাত হোসেন, আনিকা, জাওয়ায়েদ, ইমা, রাপিদা, দিপা ও ফাহমিদাসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। এছাড়াও একাত্তর টেলিভিশনের ফেনী জেলা প্রতিনিধি জহিরুল হক মিলু, ক্যামেরাপারসন এসবি সাজু ও স্থানীয় হকার্স পত্রিকার নিজস্ব প্রতিনিধি ইয়াছিন আরাফাত রুবেল আহত হয়েছেন।

 বাম ফ্রন্টের সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ আল কাফি রতন বলেন, ‘সকালে ফেনীর সমাবেশ শেষ করে আমরা বেগমগঞ্জের উদ্দেশে গাড়িতে ওঠার সময় ছাত্রলীগের নেতারা আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। ওইসময় পুলিশ কোনো ভূমিকা না রাখায় আমাদের অন্তত ২০ জন আহত হয়। একই সময় তারা আমাদের লংমার্চের ৬টি গাড়িও ভাঙচুর করেছে।’

এদিকে বাম ফ্রন্টের দাগনভূঞা উপজেলা সমন্বয়ক ডা. হারাধন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, লংমার্চকে স্বাগত জানাতে দলীয় নেতাকর্মীরা দাগনভূঞা উপজেলার প্রবেশদ্বারে অপেক্ষা করার সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা করলে অন্তত ১০ জন আহত হয়।

জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে ছাত্রলীগের সংবাদ সম্মেলন : গতকাল বিকেলে স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন করে লংমার্চে হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে ছাত্রলীগ। সংবাদ সম্মেলনে ফেনী জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি এসএম সালাউদ্দিন ফিরোজ বলেন, ‘লংমার্চ কর্মসূচি আমরাও সমর্থন করি। কিন্তু লংমার্চের নামে বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম হাজারীর ছবি সংবলিত ফেস্টুনে বিভিন্ন অশালীন ও আপত্তিকর মন্তব্য লেখায় জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে ছাত্রলীগ শুধু বিক্ষোভ মিছিল করেছে। আমাদের কেউ হামলায় জড়িত নয়।’

লংমার্চে হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী মডেল থানার ওসি আলমগীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হামলার সময় পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। পুলিশি প্রচেষ্টায় বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়েছে।’

লংমার্চে হামলার ঘটনার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ফেনী সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্রশীল সাংবাদিকদের বলেন, ‘হামলার সঙ্গে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কোনো নেতাকর্মী জড়িত ছিলেন না। লংমার্চে অংশ নেওয়া লোকজনের হাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্থানীয় সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারীর ছবিসংবলিত বেশকিছু ফেস্টুনে আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ লেখা (চিকা) থাকায় স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হন।’

সারা দেশে ২১ অক্টোবর রাজপথ অবরোধ : ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে ঢাকা থেকে নোয়াখালী অভিমুখী লংমার্চকারীরা নোয়াখালীতে সমাপনী সমাবেশ করে। ওই সমাবেশ থেকে ফেনীর হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। সমাবেশ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ১৯ অক্টোবর সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশ এবং ২১ অক্টোবর সারা দেশে রাজপথ অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়।

সমাপনী সমাবেশের বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, বর্তমান সরকার ধর্ষকদের লালন করে যাচ্ছে। গতকাল বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে এই সমাবেশ চলে। সমাপনী সমাবেশের নোয়াখালীর সমন্বয়ক ও উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি অ্যাডভোকেট মোল্লা হাবিবুর রসুল মামুন এতে সভাপতিত্ব করেন। চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নোয়াখালীর সাধারণ সম্পাদক রবিউল পলাশের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য লক্ষ্মী চক্রবর্তী, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার তপন, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ইনচার্জ নিখিল দাস, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সহকারী সাধারণ সম্পাদক হাবীব ইমন, বাংলাদেশ নারী মুক্তির সংগঠক সীমা দত্ত, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেহেদী হাসান নোবেল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট একাংশের সভাপতি মাসুদ রানা, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট একাংশের সভাপতি আল কাদরী জয় এবং বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের সংগঠক গোলাম মোস্তফা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত