পশ্চিম বাংলায় আদিবাসী জনজাতির অসুর পূজা

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২০, ০৫:০৫ এএম

ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যাই হোক এটা নিঃসন্দেহে এক সাংস্কৃতিক বিপ্লব। কয়েক বছর আগেও যা কখনো সেভাবে চর্চায় আসেনি। এদেশে মনুবাদী, ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজনীতি সাংস্কৃতিক আধিপত্য যতই বিস্তৃত হচ্ছে ততই অন্য ধারার প্রতিরোধও সামনে আসছে। গানে কবিতায়, কথকতা, পথনাটক ও লোকসংস্কৃতির নানা মাধ্যমে বিকল্প এক পরিসর সারা ভারতে নতুন এক আখ্যানের জন্ম দিচ্ছে। কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে, ঝাড়খন্ড, এমনকি দিল্লির অভিজাত জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেও অসুর আরাধনা এক নতুন সাব-অলটার্ন পাঠের মধ্য দিয়ে ভারতের বহুজনসমাজ ব্রাহ্মণ্যবাদী সাবেক ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। ২০০৯ সালে এ রাজ্যের পুরুলিয়ার এক অজ গাঁয়ে এই অসুর বন্দনার শুরু। তারপর একবছরে ক্রমেই তা বাড়তে বাড়তে এক আন্দোলনের চেহারা নিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও আছড়ে পড়ছে মহারাজা অসুরের হত্যার প্রতিবাদে জনরোষ।

বেশ কয়েক বছর আগে এই পূজার সময় বাঁকুড়া পুরুলিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। এমনিতেই লালমাটির এই রাঢ় অঞ্চল আমার ভারি পছন্দের। পোশাকি নাম জঙ্গল মহল। আকাশ ঘন নীল। জঙ্গল আগের চেয়ে অনেক হাল্কা হয়ে গেলেও এখনো কোথাও কোথাও চোখে পড়ে গভীর শালমহুয়ার প্রাচীন বন। সন্ধ্যে নামতে না নামতেই দূর থেকে ভেসে আসে মাদলের বোল। শীত নামলেই ছো আর ঝুমুর শিল্পীদের কদর কিছুটা বাড়ে কলকাতা ও অন্যান্য শহরের বাবুদের কাছে। দিনমানে চাষ করা কৃষক রাত নামলেই শিল্পের টানে হয়ে যায় অন্য মানুষ। কত কত নদী এখানে।

রিনরিনে আদুরে মেয়ের মতো খলখল করে বয়ে যায় আপন মেজাজে। পুরুলিয়ার টটকো নদীতে সকাল থেকে ভিড়। এখানে নাকি জলে সোনা পাওয়া যায়। সেই আশায় লোকে জলে নামে ভোর রাতেই। চড়িদা গ্রামে কিংবদন্তি হয়ে বেঁচে থাকেন ছো নাচের মহাশিল্পী গম্ভীর সিং মুড়া। এই বিপুল বিস্তীর্ণ এক বর্ণময় এলাকায় মূলনিবাসী জনতার আদি ধাত্রীভূমি।

একদা দশমীর সকালে ঘুরতে ঘুরতেই ঝাড়গ্রামের রাস্তায় দূর, অনেক দূর থেকে ভেসে এলো কোনো এক অজ্ঞাত বাজনার আওয়াজ। তখন সকাল। সোনা রোদে চারপাশ ঝলমল করছে। শীতকালে এই মিঠে রোদ্দুর ভারি চমৎকার। লং, এক্সট্র্রিম লংশট থেকে ভেসে আসা বাজনদারেরা ক্রমশ দৃশ্যমান হন। বিগ ক্লোজ শটে তাদের ঘামে বিষাদে মাখা মুখগুলো কেমন অসহায় দুঃখী লাগে। যেতে যেতে ছোট ছোট আরও অনেক এরকম দল দেখি। পরনে শাড়ি মাথায় ময়ূরের পালক সাজ। ঝাড়গ্রামে তখন রাবণ বধের ঘোষণা শুনছি। রাবণ বধ বা রাবণপোড়া অবশ্য এদেশে নতুন নয়। দিল্লি, কলকাতা, পাটনা, ওড়িশার ছোট্ট শহর নবরংপুরে বহু বছর ধরেই দশমীর দিন এই রাবণ বধ দেখে আসছি। সনাতন মতের ধর্ম বিশ্বাসীরা খড়-মাটি দিয়ে তৈরি রাবণকে প্রবল আনন্দে আগুনে জ্বালিয়ে দেয়। মা দুর্গার হাতে অসুর বধের দিনেই রাম রাবণের জয়-পরাজয় উঠে আসে এই অনুষ্ঠানে। এসব তো প্রতীকী। বলা হয় শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব। রাবণের, অসুরের বধ মানেই অশুভ শক্তির বিনাশ। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই বিশ্বাস এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।

বলা ভালো এই রাবণ বধ কুড়ি বাইশ বছর আগে আদিবাসী এলাকায় সেভাবে ছিল না। এদেশে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি যত বেড়েছে ততই আর্যাবর্তের সংস্কৃতিও আদিবাসী জনজাতির মধ্যে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

একদিকে মহাআড়ম্বরে রাবণ বধের ঘোষণা শুনছি আর গাড়ির কাচ নামিয়ে অদ্ভুত পোশাক পরা আদিবাসী তরুণদের বিমর্ষ মুখ দেখছি। যন্ত্র বাজছে বড় করুণ এক মন খারাপ করা সুর। পাশে বসা বিশিষ্ট নৃতাত্ত্বিক পশুপতি মাহাতো থমথমে গলায় জানাতে লাগলেন এই তরুণ আদিবাসীদের বিষাদ কাহিনী। হড় মিতান সমাজের বিশ্বাস এই দশমীর দিন অত্যন্ত অন্যায়ভাবে তাদের মহারাজা হুদুর দুর্গাকে খুন করা হয়েছিল। দুর্গা আসলে পুরুষ। তার গলার আওয়াজ ছিল বজ্রপাতের চেয়েও গম্ভীর। ঝড় যেমন শব্দ করে তেমনি আওয়াজ বের হতো রাজা ঘোড়াসুর কথা বলার সময়। সাঁওতালিতে হুদুর মানে ঝড়। তাই ঘোড়াসুরের আর এক নাম হুদুর দুর্গা। অসুর কিন্তু আজও এদেশের এক গোষ্ঠী পদবি। বলা হয় যে দেবরাজ ইন্দ্র এক আধবার নয় ন’বার আদিবাসী রাজার গড় আক্রমণ করেও কিস্যু করা দূরে থাক, প্রত্যেকবার শোচনীয় পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এই হার কি আর কোনো দেবতা মানতে পারে! সে তখন ছলাকলায় কী করে অসুর বধ করা যায় সে মতলব খুঁজতে লাগল। খবর নিয়ে জানল আদিবাসীরা কখনো মহিলা বা শিশুর গায়ে হাত দেয় না। হত্যা করার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাববে না। ইন্দ্র তখন এক মহিলাকে পাঠিয়ে অসুরকে বশ করতে চেষ্টা করলেন। তাতে কিছু লাভ হলো না। মহাশক্তিধর ঘোড়াসুর টললেন না। তখন প্রেমের অভিনয় করে বিয়ে করার প্রস্তাব দিলেন ওই ছলনাময়ী নারী। এক সময় ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল অসুর রাজের। বিয়ের আট দিন বাদে নবমী তিথির রাতে মদ খাইয়ে অজ্ঞান অবস্থায় হত্যা করা হলো ঘোড়াসুরকে। দশমীর সকালে খবর পাওয়ামাত্র বিষাদ নামল আদিবাসী জনজাতি মহল্লায়। এইভাবেই ষড়যন্ত্র করে বর্ণময় এক ঐতিহ্যশালী সভ্যতাকে হারিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলো ব্রাহ্মণ্যবাদী ধারা। তাই যা কিছু সনাতনী তা-ই ঐতিহ্য নয়।

কেউ কেউ মনে করেন এই নারী স্বয়ং ইন্দ্রের আপন বোন- দেবী। হুদুর দুর্গাকে হারিয়ে তিনি তার নামটিও আত্মস্যাৎ করে দেবী দুর্গা হলেন। ভীল সম্প্রদায়ের বিশ্বাস তাদের মেয়ে চ-ীকে জোর করে দেবতারা নিয়ে গিয়ে অস্ত্র শিক্ষা দিয়ে তাদেরই রাজাকে হত্যা করতে বাধ্য করেছিল। হাঁড়ি সম্প্রদায়ের বিশ্বাস চন্ডী তাদের ঘরের মেয়ে।

ইন্দ্র দেবীকে পাঠিয়ে নিশ্চিত খবর নিয়েছিলেন যে অসুর রাজ রাতে সঙ্গে অস্ত্র রাখেন না। রাখলেও মহিলা হত্যা আদিবাসী সমাজে নিষিদ্ধ। ইন্দ্র এও জেনেছিলেন রাতে মহারাজের বিশ্বস্ত সাতজন দেহরক্ষীও পাহারায় থাকেন না।

কী আশ্চর্য ছোট ছোট দল যারা প্রায় কাঁদতে কাঁদতে চলেছেন তাদের সংখ্যাও সাত। বংশপরম্পরায় শতাব্দীর পর শতাব্দী সাতজন আদিবাসী তরুণ এই দাঁশাই নাচ নাচতে নাচতে নারীর ছদ্মবেশে তাদের রাজাকে খুঁজতে থাকেন। ভুয়াং বাদ্যযন্ত্র আসলে যুদ্ধাস্ত্র। জঙ্গল মাঠ ঘাট টিলা পাহাড় পশুপাখি সবাইকে জিজ্ঞেস করে আদিবাসী যোদ্ধার দল। কেউ তাদের প্রিয় বীরশ্রেষ্ঠ মহীষাসুরকে দেখেছেন কি-না! অনার্য ভারত আশায় বেঁচে থাকে কোনোদিন ঠিক তারা ফিরে পাবেন তাদের মহানুভব মহারাজকে। এভাবেই দুর্গা বন্দনার পাশাপাশি অন্য এক ভিন্ন আখ্যান, অন্য ন্যারেটিভ জন্ম নিচ্ছে সারা ভারতে। নেতৃত্বে সেই বাংলা। দাঁশাই নাচের হাহাকার বিষাদ ক্রমেই বদলে যাচ্ছে গনগনে ক্রোধে। আদিবাসী মহল্লায় কান পাতলে নতুন এক উলগুলান বা বিদ্রোহের ঘোষণা আপনি শুনতে পাবেন। পাবেনই।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত