বিশ্ববিদ্যালয় কেন মনগড়া নিয়মে চলবে

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২০, ১০:৪৭ পিএম

দেশে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এর ফলে যে দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা আর মানসম্মত উচ্চশিক্ষার পথ সুগম হচ্ছে এমন ভাববার সুযোগ কম। কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণা নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত অবশ্যই উচ্চমানের শিক্ষক নিয়োগ এবং শ্রেণিকক্ষসহ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষা ও গবেষণার যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করা। শিক্ষাবিদরা বলছেন নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যেসব আইন করা হয়েছে সেসব আইনের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একচেটিয়া ক্ষমতার চর্চা আর স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এতে একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের আধিপত্য তৈরি হচ্ছে অন্যদিকে জনগণের করের টাকায় পরিচালিত পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হচ্ছে। তথাপি উপাচার্যসহ প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে আসীনদের প্রায় সবাই রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাধর হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতেও দেখা যাচ্ছে না। সংবাদ মাধ্যমে প্রায়ই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদাধিকারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এই বাস্তবতারই সাক্ষ্য দেয়।

২০০৭ সালে দেশের ২৫তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়। প্রথম ব্যাচে ৭টি বিভাগে ৩০০ শিক্ষার্থী ও ১৫ জন শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির। প্রতিষ্ঠার এক যুগ পেরিয়ে এখন সেখানে ৬টি অনুষদে ১৯টি বিভাগে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এবং প্রায় আড়াইশ শিক্ষক এবং একশ কর্মকর্তা ও পৌনে দুইশ কর্মচারী রয়েছেন। নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি রয়েছে সান্ধ্যকালীন এমবিএ, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল (সিএসই) এবং ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর প্রোগ্রাম। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরেই শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

এসব নিয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আন্দোলনেও নেমেছেন। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। এর মধ্যে উপাচার্যের বদল ঘটলেও নতুন উপাচার্যও যেন পুরনোর পথ ধরেই হাঁটছেন। রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা!’ শিরোনামের প্রতিবেদনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মচারী নিয়োগে অনিয়মের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে কর্মচারী হিসেবে কাজে যোগ দেওয়ার পর অদ্ভুত এক নীতিমালায় পদোন্নতি পেয়ে কর্মকর্তা হওয়ারও সুযোগ রয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই সুযোগ ব্যবহার করে ইতিমধ্যে কর্মকর্তা হয়েছেন ২ ডজনেরও বেশি কর্মচারী। এমনকি ওই নীতিমালা অবলম্বন করে কর্মচারী থেকে সহকারী রেজিস্ট্রার হওয়ারও সুযোগ রয়েছে। এছাড়া একই সুযোগে কর্মকর্তা হতে পারবেন মাধ্যমিক পাস করে চাকরি নেওয়া চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরাও। বিগত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলী আশরাফ তার মেয়াদকালে ৫২তম সিন্ডিকেট সভায় নীতিমালা সংশোধনের নাম করে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী কর্মচারীকে সুবিধা দিতেই এমন অস্বাভাবিক নীতিমালা তৈরি করেছিলেন। অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চাকরি বিধিমালায় প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণির পদে আবেদনের জন্য চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষেত্রভেদে ন্যূনতম স্নাতক বা স্নাতকোত্তর যোগ্যতা থাকতে হয়। এদিকে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অস্বাভাবিক এমন বিধিমালা পরিবর্তন না করে উল্টো প্রথম শ্রেণির সেকশন অফিসার পদে আবেদনকারীদের দ্বিতীয় শ্রেণির প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে তাদের আবেদনকৃত পদে নিয়োগ না দিয়ে সেসব পদে ডিগ্রি পাসের সার্টিফিকেট জমা দেওয়া অনেক কর্মচারীকে পদোন্নতি দিয়ে সেকশন অফিসার বানানো হয়। ফলে অধিকতর যোগ্যতাসম্পন্নরা বঞ্চিত হন। এসব কারণে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের সক্ষমতা হ্রাস পাওয়াসহ শিক্ষা-গবেষণার সার্বিক পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।

বর্তমানে দেশে স্বায়ত্তশাসিত ও পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৪৬টি। আর অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১০৭টি। কিন্তু শিক্ষা ও গবেষণা তো বটেই বিশ^বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনের যে কী দশা সেটাও সংবাদ মাধ্যমের নানা প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায়। গত মাসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তিনটিতে এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ২৭টিতে এখন উপাচার্যের পদই শূন্য। আর ২৩টি পাবলিক ও ৮৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহ-উপাচার্য নেই। উল্লেখ্য, ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও  চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের আইন ও অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া বাকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় পরবর্তী নানা আইন ও অধ্যাদেশ দ্বারা। স্বায়ত্তশাসিত বলে পরিচিত চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকিগুলোতে সংবিধি বা প্রবিধান তৈরি করার যে সব কাঠামো আছে, তাতে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বা একেবারেই সীমিত। এসব কারণে এসব বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যসহ প্রশাসনের শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তিদের দুর্নীতি-অনিয়ম- স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। সরকারের উচিত দেশে মানসম্মত উচ্চশিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত