শিক্ষায় হ-য-ব-র-ল

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২০, ১০:৫৪ পিএম

অন্য সব খাতের মতোই নিয়ন্ত্রণহীন বিশৃঙ্খলা চলছে শিক্ষা খাতেও। হেফাজতি প্রেসক্রিপশনে পাঠ্যসূচি প্রণয়ন নিয়ে কয়েক বছর আগে ব্যাপক সমালোচনা তোলেন সরকারপন্থি হিসেবে পরিচিতরাও। গত এক যুগে পরীক্ষায় নকল ও প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি দেখা দেয় মহামারী আকারে। পাসের হার বেশি দেখানোর সরকারি মনোভাবের কারণে অতিমূল্যায়নও শিক্ষার মান কমাতে ভূমিকা রেখেছে বলে অনেকেই মনে করেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি এমনপর্যায়ে গিয়েছিল যে, স্কুলের রেজাল্ট ভালো দেখাতে শিক্ষকরা পর্যন্ত নিজ উদ্যোগে প্রশ্নফাঁস করে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দিতেন বলেও অভিযোগ আছে। এমনকি বিশ^বিদ্যালয় ও এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন পর্যন্ত ফাঁস হওয়ার প্রমাণ মিলেছে। কিন্তু সে প্রমাণ মিলতে মিলতে অনেকে ফাঁস হওয়া প্রশ্নে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেয়ে ভর্তি হয়ে ডাক্তার হয়ে বিএমডিসির রেজিস্ট্রেশন নিয়ে রোগী দেখা শুরু করে দিয়েছেন!

এমনই অনিয়ন্ত্রিত অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলা শিক্ষাব্যবস্থায় বাড়তি আঘাত হেনেছে করোনা। করোনার কারণে ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। আপাতত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ থাকার সরকারি নির্দেশ আছে। এরপর কী হবে, সেটা এখনো অজানা।

ইতিমধ্যে বার্ষিক পরীক্ষা ছাড়াই প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সব শিক্ষার্থীর পরের ক্লাসে উত্তীর্ণ করা হবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। কিন্তু বড় সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা এইচএসসি নিয়ে।

গত এপ্রিল মাসে হওয়ার কথা ছিল এইচএসসি পরীক্ষা। করোনার কারণে পেছাতে থাকে সে পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত। অনিশ্চয়তা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। এর আগে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল করেছিল সরকার। এইচএসসি পরীক্ষা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। অবশেষে ৭ অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি জানিয়ে দেন, হচ্ছে না এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাটি। তুলনামূলক অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী হওয়ার পরও মানুষ ৭২ সালের অটোপাসের কথা মনে করিয়ে দিয়ে নানা রকম আলোচনা-সমালোচনা করতে থাকেন। অনেকই প্রশ্ন তোলেন, এভাবে পরীক্ষা বাতিল করে সবাইকে অটোপাস করানোর দিকে যাওয়া ছাড়া আর কী কোনো উপায়ই হাতে ছিল না?

এই অক্টোবরে এসে হয়তো আসলেই আর কিছু করার ছিল না সরকারের। কারণ এ অবস্থায় পরীক্ষা নিতে গিয়ে যদি করোনা আক্রান্ত হয়ে কোনো শিক্ষার্থীর মৃত্যু বা ক্ষতি হতো, তার দায় হয়তো সরকারপক্ষ সরাসরি নিতে নারাজ। কিন্তু আরেকটু পেছনে গেলেই দেখা যাবে সরকারের করার ছিল অনেক কিছুই, যা তারা করেনি বা করতে পারেনি অযোগ্যতার কারণে।

প্রথমত, বাংলাদেশে যে প্রকৃতির করোনার আঘাত এসেছে, তাতে মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম। আমরা আগেভাগে ভালো ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সতর্ক হলে হয়তো আরও আগেই করোনাকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যেত। যদি করোনাকে আরেকটু নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যেত, তবে এইচএসসি পরীক্ষা নিতে এত ভয় পাওয়ার কিছু থাকত না। কিন্তু সরকারের একটার পর একটা ভুল সিদ্ধান্ত, অযোগ্যতা ও অব্যবস্থাপনার জন্য করোনা নিয়ন্ত্রণে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। তাই অন্য অনেক কিছুর মতো এইচএসসি পরীক্ষা নিয়েও বিপাকে পড়ে যাই আমরা।

দ্বিতীয়ত, যখন দেখা গেল যে করোনাকে আমরা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছি, তখন এই পরীক্ষাটির বিষয়ে করণীয় নিয়ে আরও আগেই সিরিয়াসলি ভাবা দরকার ছিল। দলমত-নির্বিশেষে দেশের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদদের নিয়ে কমিটি করে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারত। এটা ঠিক যে, মুখে যতটা ডিজিটালের গল্প ছড়িয়েছে, তা বাস্তবে অনুপস্থিত। কিতাবের গরু আর গোয়ালের গরুর মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, তা সবাই জানেন। তাই এত বড় পরীক্ষা অনলাইনে নেওয়া অসম্ভব।

কিন্তু একটু দীর্ঘমেয়াদি সময় নিয়ে সায়েন্স, আর্টস ও কমার্স ভাগ করে নিয়ে কয়েক ধাপে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কি এ পরীক্ষা নেওয়া যেত না? এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা তো আর একেবারে বাচ্চা না। তারা যথেষ্ট বোঝে। খেয়াল করে দেখবেন, এ বয়সী ছেলেমেয়েরা একেবারেই ঘরে বসে নেই। তাদের অনেকেই আড্ডা, বেড়ানো, বাইরে যাওয়া সবই অব্যাহত রেখেছে। তাদের যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষা হলে আনা হতো, তাহলে কি তারা তা মেনে চলত না? করোনার কারণে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনিতেই বন্ধ। ফলে অন্যান্য বছরের তুলনায় কেন্দ্রসংখ্যা অনেক বাড়ানো সম্ভব ছিল। যদি শিক্ষার্থীদের সায়েন্স, আর্টস ও কমার্স এই তিন ভাগে ভাগ করে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পরীক্ষা নেওয়া হতো আর অন্যদিকে পরীক্ষার কেন্দ্রসংখ্যা বাড়ানো হতো, তবে কি স্বাস্থ্যবিধি মেনে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া অসম্ভব ছিল?

অনেকেই হয়তো বলবেন, এখন তো সব সারা। চোর পালানোর পর বুদ্ধি দিয়ে কী হবে? এক চোর পালালেও আবার চোর আসার আগে বুদ্ধি করে রাখলে এই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হয়তো হবে না। আসছে শীতে যদি করোনার প্রকোপ বাড়ে, কিংবা এমনই থাকে, তবে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষার কী হবে? সে বিষয়ে ভাবতে হবে এখনই। এবার এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল করায় ইতিমধ্যে অনেকগুলো সমস্যা সৃষ্টি হয়ে গেছে। সবাইকে পাস করানোর যে মূল্যায়ন পদ্ধতি, সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের গড় মূল্যায়ন করে ফলাফল তৈরির যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও সমস্যা আছে। জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ের মিল না থাকায় বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়ন কীভাবে হবে, সে প্রশ্নটিও তুলেছেন কেউ কেউ। বিদেশে লেখাপড়া করতে যাওয়া শিক্ষার্থীরা এ রেজাল্ট নিয়ে সমস্যায় পড়তে পারেন বলেও অনেকে আশঙ্কা করেন।

আরেকটি বড় সমস্যা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি নিয়ে। এবার অটোপাস করানোতে ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৯ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করবে। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় এদের সবাইকে ভর্তি করার মতো আসন আপাতত নেই। তাদের সবার ভর্তি কীভাবে নিশ্চিত হবে? পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ^দ্যিালয়, মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ, উন্মুক্ত বিশ^বিদ্যালয়, জাতীয় বিশ^বিদ্যালয় ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজসহ সব মিলিয়ে আসন আছে প্রায় বারো লাখ। বাকি দেড় লাখের কী হবে? এখানেও বিভিন্ন কলেজে আসনসংখ্যা বাড়াতে হবে। সে সিদ্ধান্তও যাতে এখনই নেওয়া হয়, সেটা খেয়াল রাখা দরকার।

এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা না নিয়ে তার মূল্যায়নে যেতে হচ্ছে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার কাছে। তাতে বিষয়ের অমিল যেমন একটা সমস্যা, তেমনি এই রেজাল্ট যে সবার প্রতি সুবিচার করবে না, সেটাও সত্য। কারণ অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক জেএসসির সময় তেমন একটা সিরিয়াস থাকে না। তারা এসএসসিতে অধিকতর সিরিয়াস হওয়ার চেষ্টা করে। আবার এসএসসির রেজাল্ট দেখে এইচএসসিতে তারা আরও বেশি সিরিয়াস হতে চেষ্টা করে। কারণ উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হতে এইচএসসি পর্যায়ের লেখাপড়া ও রেজাল্ট অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।

এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তিপদ্ধতি নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থীরা। ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমেই ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত জানা গেছে। যদিও তারা ২০০ নম্বরের জায়গায় ১০০ নম্বরে মূল্যায়ন করবে বলে চিন্তা করছে। তার ২০ নম্বর নেওয়া হবে এসএসসি ও এইচএসসি থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারাবাহিকতায় অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও ভর্তি পরীক্ষার দিকেই যাবে বলে ধারণা করা যায়। ফলে এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল করার পর এই ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের কিছুটা বিপদেই ফেলবে। যারা অনেক দিন ধরে পড়ালেখা থেকে খানিকটা দূরে, তাদের হঠাৎ পরীক্ষা চাপিয়ে দিলে তা ফেইস করা একটু কঠিনই। তাই ভর্তি পরীক্ষার বিষয়েও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত দ্রুত জানিয়ে দেওয়া উচিত। যাতে তারা প্রস্তুতি নিতে পারে।

গত বছর জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে এবার এইচএসসি পরীক্ষা না নিয়ে আগের ওই দুই পরীক্ষার রেজাল্টের গড় ধরে মূল্যায়নের চিন্তা করা হচ্ছে। কিন্তু আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা ও তার পরের এইচএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন করা না গেলে কী অবস্থা হবে ভাবা যায়? তাই সেসব বিষয়েও ভাবতে হবে এখন থেকেই।

লেখক চিকিৎসক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত