পণ্যবাহী জাহাজ ও কার্গো শ্রমিকদের বেতন-ভাতাসহ ১১ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে সোমবার মধ্যরাত থেকে ডাকা বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ধর্মঘট দ্বিতীয় দিনেও অব্যাহত আছে। ফলে গতকাল বুধবারও সারা দেশে পণ্যবাহী জাহাজ ও কার্গো চলাচল বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ কার্গো জাহাজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শ্রমিকরা ধর্মঘট প্রত্যাহার না করলে তারাই নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেবে। এই অবস্থায় চলমান অচলাবস্থা নিরসনের কোনো লক্ষণই দেখা যায়নি।
ধর্মঘট শুরুর পরেই বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মো. শাহ আলম বলেন, পণ্যবাহী নৌযান শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিসহ ১১ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে গত সোমবার মধ্যরাত থেকে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ কার্গো জাহাজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইকবাল হোসেন বলেন, ‘এই সময়ে যদি নৌযান শ্রমিকরা তাদের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলনে নামে তবে আমাদের কিছুই করার নেই। তাহলে আমরা নিজেরাই নৌযান চলাচল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হব।
গতকাল ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনে দেশের বন্দর এলাকাগুলোতে নানা কর্মসূচি পালন করেন শ্রমিকরা। চট্টগ্রাম ব্যুরো, নারায়ণগঞ্জ ও বরিশাল প্রতিনিধির পাঠানো খবরে দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচির বিস্তারিতÑ
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, ধর্মঘটের কারণে দ্বিতীয় দিনের মতো বন্ধ ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আমদানি পণ্য নিয়ে অপেক্ষমাণ বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের কাজ। এ অবস্থায় অর্ধশতাধিক জাহাজ দুই দিন ধরে বহির্নোঙরে পণ্য নিয়ে অলস বসে আছে।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, বড় জাহাজে আসা আমদানি পণ্যের একটি বড় অংশ বহির্নোঙরে লাইটারেজ জাহাজে খালাসের পর তা বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে আমদানি পণ্যের একটি অংশ বহির্নোঙরে লাইটারেজের মাধ্যমে জাহাজের ড্রাফট কমানো হয়। এরপর তা বন্দর জেটিতে বার্থিং দেওয়া হয়। কিন্তু নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে গত দুই দিন ধরে কোনো লাইটারেজ জাহাজ বহির্নোঙরে যায়নি। এর ফলে সেখানে অপেক্ষমাণ জাহাজগুলো থেকে এক মুঠো পণ্যও খালাস হয়নি।
বন্দরের ট্রাফিক বিভাগের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বিভিন্ন ধরনের পণ্যবাহী ৫৭টি জাহাজ গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে নোঙর করা ছিল। এর মধ্যে সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ ১৭টি, খাদ্যশস্যবাহী ৮টি, সারবাহী ২টি, সিমেন্ট ক্লিংকারবাহী ১৯টি, চিনিবাহী ১টি, তেলবাহী ৭টি ও কন্টেইনারবাহী জাহাজ ১টি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ ধর্মঘট কর্মসূচির দ্রুত অবসান না হলে দেশের অর্থনীতি ও শিল্পায়নে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পণ্য নিয়ে অতিরিক্ত সময় অপেক্ষার জন্য জাহাজগুলোকে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বেড়ে যাবে পণ্যমূল্য, যা এসে পড়বে ভোক্তাদের কাঁধে। অন্যদিকে আমদানিকৃত পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণে শিল্প-কারখানায় কাঁচামালের সংকট দেখা দিতে পারে।
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গতকাল নারায়ণগঞ্জের ৫ নম্বর ঘাট এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে কর্মবিরতির সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন বাংলাদেশ জাহাজ শ্রমিক ফেডারেশন ও বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা।
বিক্ষোভ মিছিলে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শাহ আলম, সাধারণ সম্পাদক সবুজ শিকদার, কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা হাবিবুর রহমান মাস্টার, জাকির হোসেন, আক্তার হোসেন, কবির হোসেন, মিরাজ, হাফেজ শাহাদাতসহ জেলা কমিটির নেতাকর্মীরা।
নৌযান শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কর্মবিরতি চলবে। তিনি সব নৌযান শ্রমিককে ঐক্যবদ্ধভাবে দাবি আদায়ের আন্দোলনে রাজপথে থাকার আহ্বান জানান।
আমাদের বরিশাল প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নৌপথে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বন্ধ ও বেতন-ভাতা বাড়ানোসহ ১১ দফা দাবিতে বরিশালে পণ্যবাহী নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘট দ্বিতীয় দিনেও চলছে। দাবি আদায়ে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরিশাল নগরের কেডিসি এলাকায় কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন আন্দোলনরত শ্রমিকরা।
বরিশাল বিভাগীয় নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আবুল হাসেম বলেন, যত দিন তাদের দাবি আদায় না হবে, তত দিন তারা এই ধর্মঘট চালিয়ে যাবেন।
