নাগরনো-কারাবাখ সংঘাতের সামরিক সমাধান নেই

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২০, ১০:৪৯ পিএম

১৯৯৪ সালের যুদ্ধবিরতি এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থার (ওএসসিই) মিনস্ক গ্রুপের নেতৃত্বে ২৮ বছরের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নাগরনো-কারাবাখ বিষয়ে সমঝোতা অধরাই থেকে গেছে। বিবদমান পক্ষ এবং মধ্যস্থতাকারী উভয়কেই সমান হতাশ করেছে তা। স্থগিত হয়ে যাওয়া শান্তি প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে করোনা মহামারী। তার সঙ্গে আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, বেলারুশিয়ার সংকট এবং ব্রেক্সিটের মতো বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনা মিলে আলোচনায় যুক্ত নেতৃত্বাধীন দেশগুলোর (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং ফ্রান্স) মনোযোগে থাবা বসায়। গত ২৭ সেপ্টেম্বর সংঘাতের সূত্রপাত হওয়া এরই করুণ পরিণতি ।

বর্তমান সংঘর্ষ (১৯৯৪ সালের পর থেকে এ অঞ্চলে সবচেয়ে মারাত্মক লড়াই) ইতিমধ্যেই সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে কমপক্ষে এক হাজারের মতো প্রাণহানি ঘটিয়েছে।  হাজার হাজার বেসামরিক লোক বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে। গোলা, রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার ফলে ‘যোগাযোগ রেখা’র উভয় দিকে অপরিমেয় ধ্বংসলীলা ঘটিয়েছে যার সঠিক মাত্রা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। গত ১০ অক্টোবর রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবন্দি বিনিময় এবং নিহতদের লাশ উদ্ধার করতে ‘মানবিক যুদ্ধবিরতি’ হয়েছিল। তবে এটি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে পড়ে। ১৮ অক্টোবরের দ্বিতীয় প্রচেষ্টাটিরও একই পরিণতি হতে পারে।

আজ আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজান যুদ্ধ ক্ষেত্রে নাটকীয় রকম উত্তেজনাবৃদ্ধির ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এটি আরও বেশি মানবিক দুর্ভোগ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া রয়েছে বাইরের শক্তির বড় ধরনের সামরিক সম্পৃক্ততার ঝুঁকি। রাশিয়ার আর্মেনিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি আছে। অন্যদিকে তুরস্ক আজারবাইজানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। এখানে কোনো ভুল সামরিক পদক্ষেপের অভিঘাত ককেশাস অঞ্চলের বাইরে অনেক দূরে পর্যন্ত অনুভূত হবে। রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে কোনো বড় সংঘাতের সম্ভাবনা না থাকলেও জটিলভাবে পেঁচানো পারস্পরিক আঞ্চলিক সম্পর্কগুলো এ উদ্বেগকেই বাড়িয়ে দিচ্ছে যে, সিরিয়া ধরনের একটি ছায়া যুদ্ধের সূত্রপাত হতেও পারে এখানে। ইউরোপের এই কোণে রাশিয়া এবং তুরস্কের মধ্যে একটা পাল্লাপাল্লি বাধতেও পারেযা সবার জন্য ক্ষতিকর হবে।

এ দফা সংঘাতে যা বদলেছে তা হলো তুরস্কের জোরদার সমর্থন নিয়ে আজারবাইজান বৈরিতার অবসান ঘটানো ও আলোচনার টেবিলে ফিরে যাওয়ার আহ্বানকে উপেক্ষা করে সামরিক সমাধানের পথে হেঁটেছে। দেশটির এবারের সামরিক অভিযানের ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে ১৯৯০-এর দশকে জাতিগত আর্মেনীয়দের কাছে হারানো সব ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করা। প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ সাধারণ যুদ্ধবিরতি আবার কার্যকর করার পূর্বশর্তও দিয়েছেন : নাগরর্নো কারাবাখ ও আশপাশের সমস্ত অঞ্চল থেকে আর্মেনীয় সামরিক বাহিনীকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করার একটি সময়সূচি দিতে হবে। পাশাপাশি দুঃখপ্রকাশও করতে হবে দেশটিকে।

প্রেসিডেন্ট আলিয়েভের অবশ্যই জানা উচিত যে, সামরিক পদক্ষেপ সম্ভবত স্বল্পমেয়াদ দেশে রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে আর্মেনিয়া সেনা প্রত্যাহারের সময়সূচি ঘোষণা বা ক্ষমা প্রার্থনা করবে না। শান্তি আসা তো দূরের কথা। আলোচনার শুরু থেকেই বোঝা গেছে , স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য ব্যবস্থার ব্যাপারে মতৈক্য ছাড়া নাগরনো-কারাবাখ থেকে সেনা প্রত্যাহার সম্ভব হবে না। ওই অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষের জাতিগত পরিচয় আর্মেনীয়। পাশাপাশি দরকার এর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মর্যাদা সম্পর্কে পারস্পরিক মতৈক্য।

এই সংঘাতে সব পক্ষেই আছে সাহসী সৈন্য, সহিষ্ণু ও দেশপ্রেমিক জনগোষ্ঠী আর প্রচুর ধ্বংস ও মানবিক দুর্গতি সৃষ্টি করার জন্য পর্যাপ্ত আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র। প্রকৃতপক্ষে, প্রতিটি পক্ষেই এক পর্যায়ের সামরিক শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেযা নিশ্চিত করবে, অস্ত্রসম্ভার কেবল দুর্দশাই ঘটাবে, কারও বিজয় নয়। এই অঞ্চলের শান্তির পথ কূটনীতিতেই নিহিত। লড়াই নয়, বরং আলোচনাই স্থায়ী নিষ্পত্তির একমাত্র প্রকৃত সুযোগ এনে দেবে। আমি ওএসসিইর মিনস্ক গ্রুপে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখেছি। আর্মেনীয় এবং আজারবাইজানিদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে শান্তি অর্জনের জন্য তিনটি পৃথক উপাদান প্রয়োজন : ১. সমঝোতার জন্য তাদের নেতাদের একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ, ২. এ ধরনের নিষ্পত্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন ও তার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন এবং ৩. স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এই ধরনের সমঝোতা মেনে নিতে প্রস্তুত করা। এ তিনটিকে একত্র করা যে একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ তাতে আর আশ্চর্য কী!

অতীতে আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজান কমপক্ষে দু’বার (১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি এবং ১৯৯৯-২০০১ সালে) মিনস্ক গ্রুপ মধ্যস্থতা কাঠামোর অধীনে রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করে যাতে শান্তি প্রতিষ্ঠার কিছু সম্ভাবনা ছিল। এই দৃষ্টান্তগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নেতাদের এ স্বীকৃতি যে, শান্তি অর্জনের জন্য প্রকৃত অর্থেই কিছু ছাড় দেওয়া প্রয়োজন। ওই ছাড়ের মধ্যে থাকবে এমন কিছু আপসযা রাজনৈতিকভাবে বেদনাদায়ক হবে। নেতারা স্বীকার করেন যে, এর ভিত্তিতেই আলোচনা চালানো দরকার। মিনস্ক গ্রুপের তিনটি সহ-সভাপতি দেশের সবার দৃঢ় সমর্থন পেয়ে তাদের প্রচেষ্টাটি জোরদার হয়েছিল। অন্যান্য কয়েকটি আগ্রহী দেশ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও এতে সমর্থন দেয়। তবে এসব প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে ঘাটতি ছিল। সেটি হচ্ছে, নেতারা একটি আপস মীমাংসা মেনে নিতে নিজেদের সরকার ও জনগণকে তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আর্মেনীয় এবং আজারবাইজানি নেতারা একান্তে বড় এমনকি সাহসী, পারস্পরিকভাবে লাভজনক সমঝোতার লক্ষ্যে কাজ করতে ইচ্ছুক থাকলেও প্রকাশ্য ঘোষণায় সবাই সবচেয়ে বেশি দাবি করে গেছেন। অথচ উভয় দেশের জনগণই হয়তো নেতাদের ধারণার চেয়ে বেশি ছাড় দিতে আগ্রহী ছিল।

আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য কর্মরত এনজিওগুলো শিক্ষার্থী, সাংবাদিক এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করার সময় সংঘাত নিয়ে ক্লান্তির চিহ্ন দেখতে পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো দেখেছে, সাধারণভাবে শান্তি নিয়ে কথা বলতে তাদের মন খোলা। বৃহত্তর বোঝাপড়া, যুক্ত হওয়া এবং তৃণমূল পর্যায়ে সহযোগিতার সুযোগ করে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি সংলাপের ব্যবস্থা করে দিয়ে সুশীল সমাজ এখানে অমূল্য ভূমিকা রাখতে পারে। এটি আপসের পেছনে জনসমর্থন জোগাড়ের একটি অতি প্রয়োজনীয় ভিত গড়তে সহায়তা করতে পারে। এই বিরোধে সব পক্ষই দেখিয়েছে যে, তারা ভূখ- পুনরুদ্ধার বা রক্ষার জন্য লড়াই করতে বা হতাহতের শিকার হতে পিছপা হবে না। ২০১৬ সালের চার দিনের যুদ্ধে এবং সাম্প্রতিকতম সামরিক সংঘাত উভয় ক্ষেত্রে তা দেখা গেছে। তাদের অবশ্যই এখন একটি টেকসই যুদ্ধবিরতি পুনরায় কার্যকর করতে এবং পূর্বশর্ত ছাড়াই কূটনীতির পথে ফিরে আসার পদক্ষেপ নিতে হবে। এই চলমান ট্র্যাজেডির মধ্যে অবশ্য কিছু আশার আলোও দেখা গেছে। আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান বলেছেন, ‘পারস্পরিক ছাড়ের ভিত্তিতে এ দ্বন্দ্বের সমাধান করা দরকার।’ তিনি আরও বলেছেন, আজারবাইজান যে ছাড় দিতে প্রস্তুত নাগারনো-কারাবাখ এবং আর্মেনিয়াও তার প্রতিফলন ঘটাতে তৈরি। আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট আলিয়েভের মনোভাব একই রকম হলে তা ফলপ্রসূ কূটনৈতিক সংলাপে সহায়তা করতে পারে।

নাগরনো-কারাবাখ বিরোধের নিষ্পত্তি করা সহজ কাজ হবে না। এজন্য প্রয়োজন আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজান উভয়পক্ষের নেতাদের বৈরিতা অবসানের রাজনৈতিক সৎসাহস এবং অর্থবহ ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক আলোচনার বিষয়ে অঙ্গীকার। তাদের জনগণকে এটাও মানাতে সক্ষম হতে হবে যে, এই পদ্ধতিতেই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভবযা তাদের ন্যায্য পাওনা।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত

‘আল জাজিরা’ অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত