রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী মো. জাকারিয়া এবং রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. এম এ বারীর দুর্নীতি-অনিয়মের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একাংশ বলছে, দুর্নীতি থামাতে ইউজিসির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা জরুরি। শিক্ষকদের অপর অংশ বলছে, কিছুসংখ্যক শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান ক্ষুণœ করতে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করছে। এ প্রতিবেদন নিয়ে বক্তব্য জানাতে আগামীকাল রবিবার সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন উপাচার্য। এদিকে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং রেজিস্ট্রারসহ দুর্নীতিতে জড়িতদের অপসারণ চেয়ে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ফেডারেশন। গতকাল শুক্রবার সংগঠনের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আলটিমেটাম দেওয়া হয়।
ইউজিসির এই তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে এখন সর্বত্রই চলছে আলোচনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সোবহানের দাবি, ইউজিসির তদন্ত কমিটিই সঠিক পদ্ধতিতে গঠন হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমি ইউজিসির প্রতিবেদনের বিষয়ে কিছু জানি না। আমাকে কেউ জানায়নি। তবে আমি আগেই ইউজিসির এ কমিটি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছি। আমি চিঠি দিয়ে বলেছি, যথাযথ প্রক্রিয়ায় এই কমিটি হয়নি।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগ ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সুলতানুল ইসলাম টিপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সংবাদমাধ্যমগুলোর মাধ্যমে তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে জেনেছি। আমাদের তো একটিই চাহিদা ছিল, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হোক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের অ্যাক্ট অনুযায়ী চলুক। যারা এসব অনিয়ম-দুর্নীতি করছে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। এখানে কোন প্রশাসক আসবে সে সিদ্ধান্ত সরকার নেবে। কিন্তু আমরা শিক্ষক হিসেবে চাইব এখানে শিক্ষার, গবেষণার এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশটা বজায় থাকুক। এখানে কারও পেশিশক্তি না থাকুক, কেউ মাস্তানি, অনিয়ম-দুর্নীতি, গায়ের জোরে কোনো কাজ না করুক।’
ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোলাইমান চৌধুরী বলেন, ‘আমরা প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন করেছিলাম। এই অনিয়মগুলো ইউজিসিতে প্রমাণিত হয়েছে। এটা বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য একটা মাইলফলক হবে। আসলে রিপোর্টে কী আছে সেটা তো আমরা জানি না। সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে জেনেছি। আমি আশা করব, বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যলয়গুলো দুর্নীতিমুক্তভাবে গড়ে ওঠার জন্য এই প্রতিবেদন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যেভাবে এই প্রতিবেদন এসেছে সেভাবে যেন বাস্তবায়ন হয় সেটিই আমরা সরকারের কাছে আশা করব।’
তবে এটিকে একটি ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করছেন চারুকলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবীর। তিনি বলেন, ‘আমি ইউজিসির প্রতিবেদন সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না। তবে পত্রপত্রিকায় যেসব প্রতিবেদন এসেছে তাতে মনে হচ্ছে কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। কিছু তথ্যবিভ্রাটও আছে। সংবাদগুলো দেখে আমার কেমন যেন মনে হচ্ছে। এগুলোর কতটা ভিত্তি আছে বা বিশ্বাসযোগ্য সে নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমার মনে হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মান-সম্মান নষ্ট করার একটা চেষ্টা হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার যে প্রসঙ্গ এসেছে এটি নিয়ে আমার কথা আছে। এ যোগ্যতা হয়েছে রাবি শিক্ষক সমিতির সভায় আলোচনা ও সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যে যোগ্যতা নির্ধারিত তাতে যেকেউ চাকরি পেতেই পারেন। এটাকে অযোগ্যতা বলার সুযোগ নেই। এ নিয়ে যদি কোনো কথা বা আপত্তি কারও থাকে তবে তা শিক্ষক সমিতিকেই বলতে হবে। তারপর আলোচনার মাধ্যমে আবারও সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিছুসংখ্যক শিক্ষক ভুল করছে। আমার মনে হয়, এটা পরিকল্পিত একটি ষড়যন্ত্র। অথচ যারা এগুলো করছে তাদের নামেই নানান অভিযোগ ও দুর্নীতির অভিযোগ আছে, তদন্তও চলছে। অনেকের তদন্ত শেষ হয়েছে। এতে কারও কারও শাস্তিও হতে পারে। এ থেকে বাঁচতেই তারা এসব ষড়যন্ত্র করছে বলে আমার মনে হয়।’
কাল উপাচার্যের সংবাদ সম্মেলনে : ইউজিসির প্রতিবেদন নিয়ে বক্তব্য তুলে ধরতে আগামীকাল রবিবার সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন রাবির উপাচার্য আবদুস সোবহান। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক ড. আজিজুর রহমান জানিয়েছেন, বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এ সংবাদ সম্মেলন হবে।
দুর্নীতিবাজদের অপসারণে ছাত্র ফেডারেশনের আলটিমেটাম : রাবির উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং রেজিস্ট্রারসহ দুর্নীতিতে জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণ চেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফেডারেশন। গতকাল বিকেলে ফেডারেশনের দপ্তর সম্পাদক অন্তু বিশ্বাসের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আলটিমেটাম দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ছাত্র ফেডারেশন রাবি শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আশরাফুল আলম সম্রাট বলেন, ‘প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা শুধু ক্যাম্পাসের ভাবমূর্তিই নষ্ট করে না বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। আমরা দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অনিয়মের তীব্র নিন্দা ও অপসারণের দাবি জানাই।’
সাধারণ সম্পাদক মহব্বত হোসেন মিলন বলেন, ‘গত বছর বর্তমান প্রশাসনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়েছি। সে সময় ছাত্র নেতাদের ওপর নানান চাপ তৈরি হলেও আমরা আন্দোলন থেকে পিছপা হইনি। একপর্যায়ে প্রশাসনকে লাল কার্ড দেখিয়ে চ্যান্সেলর বরাবর খোলা চিঠি প্রেরণ করি এবং প্রশাসনের সব কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করি। তখন ইউজিসি বা চ্যান্সেলর কেউই আমাদের কথা আমলে নেয়নি! তবে দেরিতে হলেও দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনাটি প্রমাণিত হলো। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই দুর্নীতিবাজরা স্বপদে বহাল আছে যা কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না। আমরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব দুর্নীতিবাজের অপসারণ দাবি করছি।’
