মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে ৫ হাজার পৃষ্ঠার প্রমাণ জমা গাম্বিয়ার

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২০, ০২:৩৩ এএম

রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করা গাম্বিয়া এবার আদালতে ৫০০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ আবেদন জমা দিয়েছে। এ আবেদনের পক্ষে ৫ হাজার পৃষ্ঠার প্রমাণও উপস্থাপন করেছে দেশটি। গত শুক্রবার জমা দেওয়া এ নথিপত্রে রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করতে গণহত্যা চালানোর জন্য মিয়ানমার সরকারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ফরটিফাই রাইটসের ওয়েবসাইট থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

নিয়ম অনুযায়ী, গাম্বিয়ার এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইসিজেতে পাল্টা আবেদন জমা দিতে পারবে মিয়ানমার। তবে অবশ্যই তা তিন মাসের মধ্যে দিতে হবে দেশটিকে।

ফরটিফাই রাইটস জানিয়েছে, মামলাটি বিচারাধীন থাকায় আবেদন ও পাল্টা আবেদনের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হবে না। তবে গাম্বিয়ার আবেদনের কারণে রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি আরও এক ধাপ এগিয়েছে বলে মনে করেন সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যাথিউ স্মিথ।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ অন্যদের প্রতি ব্যাপক নৃশংসতা এখনো অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে ফরটিফাই রাইটস দাবি করেছে, চলমান রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে দেশটিকে এখনই আইসিজের আদেশ বাস্তবায়ন করতে হবে।

এর আগে গত ২২ জানুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে মিয়ানমারের প্রতি সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা দিয়েছিল আইসিজে। নির্দেশনায় বলা হয়, রাখাইনে বসবাসরত সাড়ে ছয় লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর লাগাম টেনে ধরতে হবে। সেনাবাহিনী কিংবা অন্য যেকোনো ধরনের নিরাপত্তা বাহিনী যাতে গণহত্যা না চালায় কিংবা উসকানি না দেয় সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আইসিজের নির্দেশনায় আরও বলা হয়, রোহিঙ্গা গণহত্যা সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ এসেছে সেসব তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য মিয়ানমার কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে সে সংক্রান্ত প্রতিবেদন আগামী চার মাসের মধ্যে আইসিজেতে জমা দিতে হবে। এরপর প্রতি ছয় মাসে একটি করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এসব প্রতিবেদন গাম্বিয়ার কাছে তুলে ধরা হবে।

গত ডিসেম্বরে মামলার শুনানিতে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির কার্যত সরকার প্রধান অং সান সু চি। সেখানে তিনি তার দেশের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। শুনানির সময় সু চি এই মামলাকে ‘অসম্পূর্ণ ও ভুল’ আখ্যা দিয়ে আইসিজের কাছে এটি বাতিল করে দেওয়ার আহ্বান জানান। সু চি বলেন, ‘মানবাধিকার সংগঠনগুলো অপরাধমূলক তদন্তের যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই মিয়ানমারের নিন্দা করে এসব অপ্রমাণিত বিবৃতি দিচ্ছে। রাখাইনে স্থিতিশীলতা এবং অগ্রগতি আনতে মিয়ানমারের প্রচেষ্টায় এই আন্তর্জাতিক নিন্দা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’ রাখাইনে চলা সহিংসতাকে ‘অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত’ অ্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি নিরাপত্তা চৌকিতে রোহিঙ্গাদের হামলার কারণেই এই সংঘাত শুরু হয়।’

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে এই শুনানিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। ওই দলে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তিনজন প্রতিনিধিও ছিলেন।

এদিকে গত  জুলাইয়ে ফরটিফাই রাইটসের প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা গেছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী থেকে পালানো দুই সৈনিক মায়ো উইন তুন এবং জাও নাইং তুন রোহিঙ্গাদের হত্যা ও অন্যান্য অপরাধে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছে। এমনকি তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের ব্যাপক হারে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন এ কথাও এই দুই সৈনিক বলেন।

গত শুক্রবার সংস্থাটি দাবি করেছে, আদালত আদেশ জারি করার পরও মিয়ানমারের কর্র্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘন চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশটির সরকার দেড় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে ২০টিরও বেশি শিবিরে বন্দি করে রেখেছে। মিয়ানমার কর্র্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের মৌলিক স্বাধীনতার অধিকারকে পরিকল্পিতভাবে অস্বীকার করছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সরকারি বাহিনীর দ্বারা রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ এনে আইসিজের জেনোসাইড ট্রাইব্যুনালে গত বছরের নভেম্বরে মামলাটি করেছিল গাম্বিয়া। গত ১০ ডিসেম্বর থেকে মামলাটির কার্যক্রম শুরু হলে প্রাথমিক শুনানির পর গণহত্যা রোধে অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দিয়ে একটি রুল জারি করা হয়।

সেই প্রাথমিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগের সমর্থনে বেশ কিছু প্রমাণ পাওয়ার পর মামলাটি এগিয়ে নিতে সম্মত হয় আইসিজে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ণাঙ্গ এ আবেদন জমা দিল গাম্বিয়া। এ মামলায় বাংলাদেশ সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত ও প্রমাণাদি দিয়ে বিচারিক কাজে গাম্বিয়াকে সহায়তা করছে একটি প্রতিনিধিদল। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাদের দমন-পীড়নের মুখে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসে কক্সবাজারে আশ্রয় নিয়েছে সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে এ সংখ্যাটি এখন ১১ লাখ ছাড়িয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত