দেবী বিসর্জনের সবচেয়ে বর্ণিল আয়োজনটি সম্ভবত অনুষ্ঠিত হয় দেবহাটার টাউন শ্রীপুরের ইছামতীতে। বিজয়ার এমন বড় মিলনমেলা অন্য কোথাও আর দেখিনি। দশমীতে এ যেন এক ভেদবুদ্ধিহীন মানুষের মেলা। সীমানা টেনে দিয়ে আমরা বলতেই পারি ‘আর এসো না আমার ভূমিতে’। কিন্তু মন তো ব্যারিকেড মানে না। মানে না কাঁটাতার। এপারে বাংলাদেশের টাউন শ্রীপুর। ওপারে ভারতের টাকিগ্রাম। দু-তল্লাট ছুঁয়ে বয়ে চলেছে নরম নদী ইছামতী। শুধু ইছামতী বললে ভুল হবে। আরও একটা ফিতে নদী ওপারের বসিরহাট মহকুমা থেকে বেরিয়ে পুরো কয়েক পাক খেয়ে তরতরিয়ে ইছামতীতে পড়েছে। ত্রিবেণীটিও এখানে। গতিমতি বুঝে খানিক এদিক-ওদিক সরানো গেলেও মূলত ত্রিধারার সঙ্গমস্থলকে কেন্দ্র করেই বিসর্জনপীঠ নিরূপণ করেছিলেন বনেদিরা।
গতবারে গিয়ে মেলার আদি ইতিহাস জানতে চেয়েছিলাম। কেউ তেমন খোলাসা করতে পারলেন না। পরে অবশ্য টাউন শ্রীপুরে ঢোকার মুখে সনাতনী কজন বয়োজ্যেষ্ঠের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। তারা জানালেন, আগেকার দিনে দুই পাড়ে অর্থাৎ দেবহাটা এবং চব্বিশ পরগনার জমিদাররা নাকি পাল্লাপাল্লি করে ত্রিবেণীতে পূজা ডোবাতেন। সেই থেকে ধারা মেনে হরবছর এই আয়োজন চলে আসছে। বিস্তারিত জানব বলে জনসমুদ্রে ঢুকে পড়তে হলো। মেলার যুবকরা ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না। কিছু জিজ্ঞাসা করলে তারা উল্টো বিরক্ত হন এবং প্রশ্নকারীকে নিপাট বেরসিক ভাবেন। অগত্যা আবারও পাড়ে বসে পড়া বৃদ্ধদের শরণাপন্ন হলাম। মচ্ছবটা শুরু হয়েছে দেশবিভাগের অনেক আগ থেকেই... এরপর আর জানা গেল না। যখন ভিড় ঠেলে কোনোমতে বাঁধের ওপর দাঁড়ালাম, তখন চোখের সামনে শুধুই রঙ্গিলা ইছামতী। নদী নয়, নৌকো নদী। যত দূর দেখা যায়, শুধুই নৌকা আর নৌকা। জাত নেই। হরেক কিসিমের বাহারি নৌকার মিছিল এখানে। ডিঙি, বজরা, পানসি,পঙ্খিরাজ, সওদাগরি, পাতারি, লঞ্চ, স্টিমার, খেয়া, বাইচের... আরও আরও নৌকা। লাল-নীল কাগজ, কাপড়, ফেস্টুন, ব্যানার বাঁধা একেক নৌকার একেক ধরনের সাজ। বেশ কয়েক নৌকায় দেশ বুঝে পতাকাও ঝোলানো আছে। খোলা হাওয়ায় পত্ পত্ করে উড়ছে বাংলাদেশ আর ভারতের পতাকা। হাতে গুনলে হাজার পেরিয়ে যাবে। সবগুলোতেই ঠাসা মানুষ।
নরম ইছামতীর প্রসারিত বুকের মধ্যে দুপুর থেকেই হাজারো নৌকা টহল দিতে শুরু করেছে। টহল মানে ইচ্ছেমতো ঘোরাঘুরি। জানা গেল, প্রতিমার সহযাত্রীরা বিসর্জনতক এভাবেই ঘুরে ঘুরে আনন্দ করবেন। উথালপাতাল ঢেউয়ের মধ্যে সীমান্তবর্তী দুই জেলার কর্তাব্যক্তিদেরও দেখা মিলল। বসিরহাটের মহকুমা শাসক কয়েকজন খাকি উর্দি পরা পুলিশ সঙ্গে করে লঞ্চ ভাসিয়েছেন ইছামতীর জলে। প্রশাসনের এতসব কর্তাব্যক্তি দীর্ঘসময় ধরে হাত নেড়ে নেড়ে অগণিত মানুষের সহজভাবে শুভেচ্ছা জানালেন। পাড়ে থাকা আপামর মানুষরাও হাসিমুখে শুভেচ্ছার জবাব দিলেন। বিনিময়ের এ দৃশ্যটি বিরল আর বেশ আরামদায়ক বটে। এ রকম দৃশ্যের জন্য যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। সহজ মানুষের কাতারে গিয়ে সবাই তো আর সহজ হয়ে দাঁড়াতে পারে না! সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনও পিছিয়ে নেই, তারাও শামিল হয়েছে আনন্দযজ্ঞে। আন্তরিক দৃশ্যাবলির মধ্যে দু-দেশের সীমান্তরক্ষীরা অকস্মাৎ স্পিডবোটে করে ইগলের মতো উড়ে এসে আবার ফিরে যাচ্ছেন। দ্রুত চলতে গিয়ে তারা বোধ হয় চকিতে দেখে নেয় চারপাশ সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো! ফালতু কারণে অবারিত আনন্দ মাটি হয়ে যাক, তা হয়তো তারা কেউ-ই চান না।
চ্যাপ্টা দুই পাড় ধরে জমাটবাঁধা জনমানুষ। ভালোমতো জায়গা না পেয়ে নারীদের অনেকেই ধসেপড়া বাঁধ বেয়ে নিচে জলের ধারে বসে গেছে। বাঁধ ধরে উত্তরদিকে এগোতে গিয়ে সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হলো। ওদিকে ভিড় আরও বেশি। বাঁধের গোড়া থেকে উত্তরদিকের সমতলে থাকা অনাবাদি জমি, স্কুলমাঠ, তহশিল অফিসের পতিত জমি অর্থাৎ যে যেখানে যেভাবে পেরেছে টেম্পরারি দোকান দিয়ে ফেলেছে। কী নেই? মিঠাই-মণ্ডা, আইসক্রিম, খেলনাপাতি থেকে শুরু করে বাচ্চাদের কাপড়চোপড় পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে সেখানে। সহজাত আনন্দ জাগলে মানুষের পরম্পরাগত প্রথাও বুঝি মøান হয়ে আসে। দেবী বিসর্জনটা তখন হয়ে যায় উপলক্ষ মাত্র। মুসলিম হিন্দু নির্বিশেষে সবারই মিলনমেলা।
সূর্যের তাপ কমে এলে ভিড় আরও বাড়তে থাকে। ভিড় তো হবেই। অঞ্চলের মানুষজন তক্কে তক্কেই থাকে। শহুরেরা মাথায় লাল ফিতে বেঁধে সকাল সকাল ট্রাক ছেড়ে দেয়। কামাইয়ের আশায় বাস, টেম্পো, কিংবা শ্যালোমেশিন বাঁধানো ভটভটিগুলো গেঁথে গেঁথে বেশি লোক তুলে তবে ছাড়ে। খোদ ভ্যানওয়ালাদেরও পোয়াবারো হয়ে যায়। ওরাও গতরের উশুল তোলে যাত্রীদের ভাড়া গুনে। ক্রমেই টাউন শ্রীপুরকে শূন্য করে চলে আসে গ্রামবাসী। আশপাশের দু’দশ গ্রাম থেকেও দেদার মানুষ আসছে। পাড়মুখো মানুষের অভাব নেই। শর্টকাটে পৌঁছাতে কেউ কেউ মূলপথ ছেড়ে কোনাকুনি পথ ধরেছে। পূর্বদিকের খোলা পাথার ডিঙিয়ে পিঁপড়ের সারি দিয়ে লোক আসছে পাড়ে। টাটকা বিকেলেই ভেদবুদ্ধির বাইরে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল ইছামতী। মর্ত্যলোকে শুরু হলো পূর্ণ আনন্দ-মচ্ছব।
ঐতিহ্যের মিলনমেলায় সীমারেখা কোনো বাধা নয় আজ। হরদম পারাপার হচ্ছে দুপাড়ের মানুষ। পারাপারের দৃশ্যগুলো রোমাঞ্চকর, অনেকটা গোপনভাবেরও বটে। সীমানা সহজ হয়ে এলেও চোখে ভয় কাটে না। যারা ওপারে যেতে চায়, তাদের মনোযোগ প্রতিমার দিকে থাকে না। তাদের চোখ ঘুরতে থাকে সীমান্তরক্ষীদের গতিবিধির ওপর। ভিড়ভাট্টা আর গোলযোগের সুযোগ বুঝে এরা চুপে ডিঙি নৌকায় উঠে পড়ে। ওপারে যায়। এপারে আসে। পারাপারের এসব যাত্রী একসময় মূল জনারণ্যের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়। তখন তাদের আর আলাদা করা যায় না। একই তো মানুষ। কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করে বেলায় বেলায় ফিরে যায়। কারও দেশ এ বাংলায়। এ সুযোগে কেউ আবার নিজের জন্মভূমিটাও দেখে নেন সুবিধামতো। কেউ আবার থেকে যান, হয়তো আর সহসা ফেরেন না তারা।
সূর্যের আলো নিভে যাচ্ছে ক্রমেই। আধো আলো আধো অন্ধকারের মধ্যে টুপটাপ করে জলে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে মাটির দুর্গাদের। অন্ধকারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিসর্জনের দৃশ্যগুলো একসময় অন্ধকারেই যেন হারিয়ে গেল। তারপর কখন যেন গুম গুম আওয়াজের ভেতর রমরমাভাবে সন্ধ্যা নামল। মুহূর্তে তরতর করে ছিটকে পড়ল ভোজবাজির ঝলকানো আলো। সমানে আতশবাজি ফুটতে লাগল আকাশে। অন্ধকারকে তছনছ করে খানিক পরপর আলোয় আলোয় ভরে যাচ্ছিল চারপাশ। ঘণ্টাখানেক ভালোই আলোর খেলা চলল। তারপর যেন নীরবেই আলগা হতে শুরু করল সবকিছু। আর আমি আলোর ফানুস নিয়ে একসময় আকাশের দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। হাজার হাজার তারার খই ফুটে আছে আকাশে। কতক্ষণ একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকা যায়! আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে নিরর্থক হাঁটতে লাগলাম। নদীকে পেছনে ফেলে দর্শনার্থীরাও ফিরে ফিরে আসতে থাকল। কেবল সীমানা গুটিয়ে নিয়ে মাঝখানে পড়ে থাকল সম্প্রীতির নদী ইছামতী।
লেখক : কবি ও গবেষক
