প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় যেমন নানা ধর্মমতের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে, তেমনি নানা ধর্ম-দর্শন বাংলার মাটি-জল-বাতাসে পরিপুষ্ট হয়ে স্বতন্ত্র মহিমায় ভাস্বর হয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে দেবী দুর্গার উত্থান ও জয়জয়কারের ইতিহাসও বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। সংস্কৃত ভাষায় মহাকবি বাল্মীকি রচিত রামায়ণে দুর্গাপূজার উল্লেখ ছিল না। কিন্তু মধ্যযুগের বাঙালি কবি কৃত্তিবাস ওঝা রচিত বাংলা রামায়ণে দেখা যায়, রাবণকে বধ করে সীতাকে উদ্ধার করার জন্য শ্রীরামচন্দ্র দেবী দুর্গার অকালবোধন ও পূজা করেন এবং তার বর নিয়ে যুদ্ধজয় করেন। ইতিহাসবিদরা বলেন, ভারতবর্ষে আরও আগে থেকেই দুর্গার আরাধনা থাকলেও বাংলা রামায়ণে দুর্গার আখ্যান যুক্ত হওয়ার পরই তা এ অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তী দুই শতকে দুর্গাপূজার প্রসার ঘটতে থাকে। কালক্রমে বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে দুর্গাপূজা। এখন দুনিয়ার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের কল্যাণে দুর্গাপূজা সারা বিশ্বে প্রসারিত হয়েছে।
বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দেবী দুর্গার স্থান পরম ভক্তিময়। তার এক রূপ অসুরবিনাশী, আরেক রূপ মমতাময়ী মাতার। তিনি অসুরদের দলপতি মহিষাসুরকে বধ করে দেবকুলকে রক্ষা করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে অন্যায়-অশুভর বিপরীতে ন্যায় ও শুভশক্তির জয় হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। তিনি কেবল সৌন্দর্য-মমতা-সৃজনের আধারই নন, অসহায় ও নিপীড়িতের আশ্রয় বলেও গণ্য হন। মানবকুলের জন্য তিনি বয়ে আনেন মঙ্গলবার্তা।
সব ধর্মের মূল লক্ষ্য সমগ্র জীবের কল্যাণ সাধন; কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের কল্যাণ সাধন নয়। দুর্গাপূজার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা হিন্দুদের, কিন্তু মূলবাণী সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে নিবেদিত। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা। এই চেতনাকে ধারণ করে সবার সুখ-শান্তি কামনায় এবং সর্বজীবের মঙ্গলার্থে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে নানা উপাচার ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করে দুর্গাপূজা। সর্বপ্রকার হীনতা, সংকীর্ণতা ও ধর্মান্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী-নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণ শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন করে এবং অংশগ্রহণ করে আনন্দ-উৎসবে। সবাই মিলিত হয় অভিন্ন মোহনায়, অভিন্ন চেতনায়। সবার অংশগ্রহণ ও উপস্থিতিতে শারদীয় দুর্গাপূজা রূপ লাভ করে সর্বজনীন উৎসবের, পরিণত হয় অন্যতম জাতীয় উৎসবে। শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা, জনসমাগম ও শোভাযাত্রা হয়ে থাকে। মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তিমূলক গান, চণ্ডীপাঠ, অর্চনা, আরতি, ভক্তদের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন এবং সেই সঙ্গে কোলাকুলি, প্রণাম, আশীর্বাদ ইত্যাদি দুর্গাপূজাকে ধর্মীয় আবেশে আনন্দঘন করে তোলে; কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন ছিল। বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯ এর কারণে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব আজ বিপর্যস্ত এবং মানুষের জীবন হুমকির সম্মুখীন। তাই করোনার কারণে এবার পূজার অনুষ্ঠানমালা শুধু ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে পূজা-অর্চনার মাধ্যমে মন্দির বা মণ্ডপ প্রাঙ্গণে সীমাবদ্ধ রাখতে হয়েছে। তারপরও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবার উৎসাহ ও উদ্দীপনার মাধ্যমে সম্প্রীতির পরিবেশে দুর্গোৎসব উদযাপিত হওয়ার খবর মিলেছে।
বিশ্বের নানা দেশের মতোই দক্ষিণ এশিয়াতেও এখন সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ছে। তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাংলা এবং বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার ইতিহাস ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে আসা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে এর চর্চাকে উৎসাহিত করা জরুরি। বাংলাদেশে সব জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহাবস্থানের ধারাকে সমুন্নত রাখতে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সবার ধর্মচর্চা এবং ধর্মীয় উৎসব উদযাপনকে নির্বিঘ্নে রাখতে হবে। দুর্গাপূজাকে ঘিরে বাংলায় ধর্মীয় সম্প্রীতির যে ইতিহাস তৈরি হয়েছে তা সবার জন্যই অনুসরণীয়। পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমী। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক ছেড়ে আবার কৈলাসে ফিরে যাবেন স্বামীর ঘরে। দুর্গার বিদায়লগ্নের আনন্দ-বেদনা মেশানো অনুভূতি আজ ভক্তদের মনকে সিক্ত করে আছে। দুর্গাপূজা সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের যে ঐতিহ্য তৈরি করেছে সে ধারাবাহিকতা অটুট থাকুক। শারদীয় দুর্গোৎসবে সত্য, ন্যায় ও শুভশক্তির বিজয় হোক।
