সরকারি অনুদান নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ সংক্রান্ত জটিলতায় রাজধানীতে একজন কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় সম্প্রতি দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে তোলপাড় হয়ে গেল। গ্রেপ্তারের পরদিন ওই নির্মাতা জামিনে মুক্তি পেলেও এই ঘটনা চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান সংক্রান্ত নতুন-পুরনো বহু বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। সংবাদ মাধ্যমে এ বিষয়ে নানা প্রতিবেদনে আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রতিক্রিয়ায় উঠে এসেছে অনেক প্রশ্ন। বলা বাহুল্য, চলচ্চিত্র নির্মাণে পরিচালকদের সহায়তা করতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এই অনুদানের নানা দিক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনামুখর চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী ও নবীন-প্রবীণ চলচ্চিত্রকাররা। অন্যদিকে, বিগত কয়েক দশকে যে নির্মাতাদের এই অনুদান দেওয়া হয়েছিল তাদের একটা বড় অংশই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কিংবা সময় পেরুনোর বহু পরেও অনুদানপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রটির নির্মাণ শেষ করতে পারেননি। আর অল্পসংখ্যক যারা সরকারি অনুদান নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রের কাজ শেষ পর্যন্ত শেষ করতে পেরেছিলেন, সেসব চলচ্চিত্রের বেশিরভাগই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি।
মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘মুক্তি পায়নি সরকারি অনুদানের অর্ধেকের বেশি চলচ্চিত্র’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয় তথ্য মন্ত্রণালয় ২০০৭ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট ৪১টি চলচ্চিত্রের জন্য অনুদান দিলেও নির্মাণ শেষে মুক্তি পেয়েছে মাত্র ১৫টি চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়মতো সিনেমা নির্মাণ করার বিষয়ে কঠোর জবাবদিহি থাকতে পারে কিন্তু যথাসময়ে সিনেমা শেষ করতে না পারার কারণে নির্মাতাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি সমর্থনযোগ্য নয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, প্রয়াত কথাসাহিত্যিক শহীদুল জহির রচিত ‘কাঁটা’ গল্পটির অবলম্বনে একই নামে একটি চলচ্চিত নির্মাণের জন্য ২০১২-১৩ অর্থবছরে অনুদান পেয়েছিলেন নির্মাতা টোকন ঠাকুর। সেই সিনেমার কাজ সাত বছরেও শেষ করতে পারেননি তিনি। উল্লেখ্য, সরকারের চলচ্চিত্র অনুদান নীতিমালা অনুযায়ী, অনুদান পাওয়ার ৯ মাসের মধ্যে সিনেমা মুক্তি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অবশ্য নির্মাতাদের দাবি চলচ্চিত্র এমন একটি শিল্পমাধ্যম যেখানে নানা অনিশ্চয়তা থাকায় অনাকাক্সিক্ষত বহু কারণেই নির্মাণ প্রক্রিয়ার গতি ধীর হয়ে যেতে পারে। একইসঙ্গে নির্মাতারা বলছেন একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ৯ মাস সময় যেমন মোটেই পর্যাপ্ত নয় তেমনি এতদিন অনুদান হিসেবে যে পরিমাণ টাকা দেওয়া হতো সেটিও পর্যাপ্ত নয়।
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যাবে, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে দেশের পুরোধা চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন কর্মীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি অনুদানের বিষয়টি চালু হয়েছিল। ১৯৭৬-৭৭ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকার চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অনুদানের এই প্রথা চালু করে। মাঝখানে বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে নিয়মিত চলচ্চিত্রে অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীরা বলছেন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য নির্মাতাদের সরকারি অনুদান দেওয়া, চলচ্চিত্রের বিকাশে দেশে একটি চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি চলচ্চিত্র আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করার জন্য সত্তরের দশকে যে দাবিনামা উত্থাপিত হয়েছিল তাতে সামগ্রিকভাবে চলচ্চিত্র বিকাশের একটি রূপরেখা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকার আলাদা আলাদাভাবে আর্কাইভ ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করলে এবং অনুদান দেওয়া শুরু করলেও চলচ্চিত্রশিল্প বিকাশের লক্ষ্য অধরাই রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে তাদের অন্যতম একটি অভিযোগ হলো বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় চলচ্চিত্রের অনুদান দেওয়া হচ্ছে তা অনেক ক্ষেত্রেই মেধাবী ও সৃজনশীল সম্ভাবনাময় নির্মাতারা পাচ্ছেন না কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সুযোগসন্ধানী ও বাণিজ্যিক ধারার নির্মাতারা এর ফলভোগ করছেন।
একজন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় দেশে যে বিতর্কের সূচনা হলো তার পরিণতিতে কি চলচ্চিত্রে সরকারি অনুদানের বিতর্কিত বিষয়গুলোর অবসান ঘটবে? এতদিন অভিযোগ ছিল অনুদানের ২৫-৩৫ লাখ টাকায় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব না। এখন পূর্ণদৈর্ঘ্যরে জন্য ৭৫ লাখ এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য ২০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ চিত্রনাট্য বাছাই কমিটিতে সত্যিকার অর্থে যোগ্যতাসম্পন্ন কয়েকজনকে রাখা হলেও ওই কমিটি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট নন এমন কর্তাব্যক্তিরা প্রভাব বিস্তার করেন। ফলে অনুদানের জন্য নির্বাচিতরা পূর্ব অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতাসম্পন্ন না হয়েও অনুদান পান। এছাড়া যে প্রক্রিয়ায় অনুদানের অর্থ ছাড় করা হয় সেটিও চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া এই প্রশ্নও রয়েছে যে, সরকার যেহেতু চলচ্চিত্রটি নির্মাণের জন্য পুরো অর্থ না দিয়ে কেবল একটা অংশেরই জোগান দিচ্ছে, তাই চলচ্চিত্রটির নির্মাণ শেষ হলে নির্মাতা তা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে দিতে পারেন। কিন্তু পুরো অর্থের জোগান না দিয়ে সরকারই বা কীভাবে তা ঠেকাবে। বর্তমান বাস্তবতায় এসব প্রশ্নের মোকাবিলা না করে অনুদানের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা না গেলে চলচ্চিত্রের অনুদান কাজে লাগবে কীভাবে?
