বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির মধ্যে ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে আদালত। বরগুনার জেলা শিশু আদালতের বিচারক মো. হাফিজুর রহমান গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে বিচারক অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির মধ্যে হত্যাকান্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া ছয়জনকে সর্বোচ্চ ১০ বছর করে বিনাশ্রম কারাদন্ড দেন। বাকিদের মধ্যে চারজনকে পাঁচ বছর করে এবং একজনকে তিন বছর বিনাশ্রম কারাদন্ড দেয় আদালত। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় অন্য তিন আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক সব আসামি আদালতে উপস্থিত ছিল।
যে ছয়জনকে ১০ বছর করে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে তারা হলো মো. রাশিদুল হাসান রিশান ওরফে রিশান ফরাজী, মো. রাকিবুল হাসান রিফাত হাওলাদার, মো. আবদুল্লাহ ওরফে রায়হান, মো. অলিউল্লাহ ওরফে অলি, মো. নাঈম ও মো. তানভীর হোসেন। দেশের বিদ্যমান শিশু অপরাধ আইনে এটিই সর্বোচ্চ শাস্তি বলে জানা গেছে।
পাঁচ বছরের সাজা পাওয়া চার আসামি হলো জয় চন্দ্র সরকার ওরফে চন্দন, মো. নাজমুল হাসান, মো. রাকিবুল হাসান নিয়ামত ও মো. সাইয়েদ মারুফ বিল্লাহ ওরফে মহিবুল্লাহ। আর তিন বছরের সাজা পেয়েছে আসামি প্রিন্স মোল্লা। এছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় রায়ে অভিযোগপত্রের ১১, ১৩ ও ১৪ নম্বর আসামি বেকসুর খালাস পেয়েছে।
এর আগে গতকাল দুপুর ১টা ১০ মিনিটে জেলা শিশু আদালতে এ রায় পড়া শুরু করেন বিচারক মো. হাফিজুর রহমান। রায় ঘোষণা উপলক্ষে আদালত প্রাঙ্গণসহ গোটা শহরজুড়ে নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সকালে কড়া নিরাপত্তায় বরগুনা জেলা কারাগার থেকে প্রিজনভ্যানে বরগুনার শিশু আদালতে হাজির করা হয় ছয় আসামিকে। এছাড়া জামিনে থাকা আট আসামিও স্বজনদের সঙ্গে এসে আদালতে হাজির হয়।
এদিন আদালতে মামলার রায় শুনতে হাজির হন নিহত রিফাতের পরিবারের সদস্য, মামলার আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী ও আসামিদের স্বজনরা। আদালত চত্বরে ভিড় দেখা যায় উৎসুক মানুষেরও। তবে রায় প্রদান উপলক্ষে মামলাসংশ্লিষ্টরা ছাড়া অন্যদের আদালতে প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করে এর প্রাঙ্গণে সীমানা চিহ্নিত করে দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার পর আদালত থেকে বাইরে এসে আইনজীবীরা সাংবাদিকদের রায়ের বিষয়টি জানান।
রায়ে দন্ডপ্রাপ্তদের বরগুনা জেলা কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালত নির্দেশ দিয়েছে বলে জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মোস্তফা কাদের। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আসামিরা যেহেতু হত্যা মামলার আসামি, অন্য শিশুরা ভয় পেতে পারে কিংবা আতঙ্কিত হয়ে পড়তে পারে সেই বিবেচনায় তাদের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে না পাঠিয়ে বরগুনা জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে আদালত।’
রায়ে সন্তুষ্ট রিফাতের পরিবার : রিফাত হত্যা মামলার অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির মধ্যে ১১ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হওয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন নিহত রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ ও মা ডেইজি বেগম।
রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের কাছে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বলেন, ‘মামলার প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের রায় হয়েছে গত ৩০ সেপ্টেম্বর। আজ (গতকাল) অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামিদেরও আদালত সাজা দিল। এতে আমার পরিবার সন্তুষ্ট। এ রায়ে আমার ছেলের আত্মা একটু হলেও শান্তি পাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বরগুনার শিশু আদালতের বিচারক যে রায় দিয়েছেন তাতে আমি এবং আমার পরিবার খুশি। শুধু আমি নই, আমার মনে হয় বরগুনাবাসী এ রায়ে খুশি হয়েছে। ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না, আমার ছেলেকে যারা নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে তাদের বিচার নিশ্চিত হোক এটাই এখন চাওয়া। এ কাজে সাংবাদিক, পুলিশ ও আইনজীবীসহ যারা আমাকে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমরা সঠিক বিচার পেয়েছি। এটাই হচ্ছে সব থেকে বড় কথা।’
অন্যদিকে রায় ঘোষণার পর দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় নিহত রিফাতের মা ডেইজি বেগম বলেন, ‘ছেলেকে হারানোর শোক যে কত কঠিন তা যে মা ছেলে হারিয়েছে সেই বোঝে। আমার ছেলেকে হারানোর ক্ষতিপূরণ কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়। তবু এটুকুই শান্তি যে, আমার ছেলের হত্যাকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে পেরেছি। আদালত তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছে, তাতে আমরা সন্তুষ্ট।’
রায়ে সন্তুষ্ট রাষ্ট্রপক্ষ, উচ্চ আদালতে যাবে আসামিপক্ষ : রিফাত হত্যা মামলার অপ্রাপ্তবয়স্ক ১১ আসামির বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হওয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে মামলাটির রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরাও। বরগুনা শিশু আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, ‘মাত্র ৬৩ কার্যদিবসে চাঞ্চল্যকর রিফাত হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ করে রায় প্রদান করায় আমরা সন্তুষ্ট। এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। আসামি যেই হোক, কেউই যে অপরাধ করে পার পাবে না সেটা আবারও এ রায়ের মাধ্যমে প্রমাণ হলো।’
আসামিদের যে সাজা দেওয়া হয়েছে তা আগামী দিনে কিশোর অপরাধ নির্মূলে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী আরও বলেন, ‘মূলত সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ন্যায়বিচারের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে এবং তা হয়েছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে। এজন্য গণমাধ্যমকর্মী, পুলিশ প্রশাসন ও বিচার বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।’
রায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা তাদের সন্তুষ্টির কথা জানালেও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। তারা বলছেন, শিশু আইনের অনেক বিষয়ই রায়ের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়নি। তাই সুবিচার পেতে তারা উচ্চ আদালতে যাবেন।
দণ্ড পাওয়া রাকিবুল হাসান রিফাত হাওলাদার ও আবু আবদুল্লাহ রায়হানের আইনজীবী মো. শাহজাহান বলেন, ‘রাকিবুল হাসান রিফাত হাওলাদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে সে লাঠি নিয়ে আঘাত করেছে। কিন্তু ভিডিও ফুটেজে আমরা সেটা দেখতে পাইনি। তবু তাকে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছে আদালত। আমি মনে করি রাকিবুল হাসান রিফাত হাওলাদার ও আবু আবদুল্লাহ রায়হানের রায়ের ক্ষেত্রে শিশু আইনে যেসব বিষয় বিবেচনা করার কথা, এখানে সেগুলো বিবেচনা করা হয়নি। তাই আমরা আসামিপক্ষ এ রায়ে সংক্ষুব্ধ, এ রায়ের বিষয়ে আমরা উচ্চ আদালতে যাব।’
আরেক দন্ডপ্রাপ্ত চন্দনের আইনজীবী নারগিস সুলতানা সুরমা বলেন, ‘চন্দনকে যে পাঁচ বছরের সাজা দিয়েছে, সেটা আসলে হয় না। কারণ চন্দন সেখানে দাঁড়িয়ে শুধু দেখেছিল। অন্য যারা দাঁড়িয়ে দেখেছিল তারা সাক্ষী হয়েছিল। কিন্তু চন্দনকে এখানে আসামি করা হয়েছে। তার পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে। এতে আমরা ক্ষুব্ধ। আমরা উচ্চ আদালতে যাব।’
গত বছর ২৬ জুন সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনের সড়কে কিশোর গ্যাং বন্ড বাহিনী প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন বিকেলে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। ওই হত্যাকাণ্ড সারা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ঘটনার পরদিন ২৭ জুন নিহত রিফাতের বাবা মো. আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও পাঁচ-ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এরপর পুলিশ একে একে গ্রেপ্তার করে এজাহারভুক্ত আসামিদের। রিফাতের ওপর হামলার ছয় দিন পর ২ জুলাই ভোরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় মামলার প্রধান আসামি সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড।
রিফাত হত্যার দুই মাস ছয় দিন পর গত বছর ১ সেপ্টেম্বর বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২৪ জনকে অভিযুক্ত করে প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই ভাগে বিভক্ত দুটি তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) দাখিল করে পুলিশ। এদের মধ্যে ১০ জন প্রাপ্তবয়স্ক ও ১৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামি। একই সঙ্গে রিফাত হত্যা মামলার এক নম্বর আসামি নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে ৮ জানুয়ারি রিফাত হত্যা মামলার অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে বরগুনার শিশু আদালত। ৭৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর মোট ৬৩ কার্যদিবসে বিচারিক কার্যক্রম শেষে গত ১৪ অক্টোবর বরগুনার শিশু আদালত এ মামলার রায়ের দিন ধার্য করে। মামলার অপ্রাপ্তবয়স্ক ১৪ আসামির মধ্যে ৭ আসামি ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে।
আলোচিত এ মামলায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর নিহত রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয় প্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে মৃত্যুদন্ড ও চার আসামিকে মুক্তি দেয় বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান।
