বেকারত্বের জাঁতাকলে পাটকল শ্রমিকরা

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০৭:৩৬ এএম

খুলনার খালিশপুরে রাষ্ট্রায়ত্ত প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল। প্রধান ফটকের কয়েক হাত দূরেই রেললাইন। রেললাইন ঘেঁষে ফারুক মিয়ার চায়ের দোকান। সেখানে মাথায় হাত দিয়ে বসা কয়েকজন। এদের মধ্যে মোহাম্মদ সেলিম ১৬ বছর বদলি শ্রমিক হিসেবে মিলে কাজ করেছেন। আগেও অসংখ্যবার মিল বন্ধ হওয়ায় বেকারত্বের অভিজ্ঞতা তার পুরনো। কিন্তু এবারের বেকারত্ব সেলিমের ভাষ্যে, রীতিমতো বিপর্যয় ডেকে এনেছে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে ২৬ মার্চ থেকে মিল বন্ধ। মাঝখানে এক মাসের জন্য খুলল। তারপর পাকাপাকি বন্ধ। প্রায় একটা বছর ধইর‌্যা বেকার। ক্যামনে জীবন চলতেছে? সরকার হাত-পা বাইন্ধা আমাগোরে নদীতে ফালায় দিছে।’

ক্রমাগত লোকসানের কারণ দেখিয়ে গত ২৫ জুন খুলনা-যশোর অঞ্চলের নয়টিসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এরপর ২ জুলাই কারখানা বন্ধসহ গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় শ্রমিকদের অবসায়নের প্রজ্ঞাপন মিলগুলোর নোটিস বোর্ডে টানিয়ে দেওয়া হয়। সরকারি হিসাবে, এসব কারখানায় প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিক কর্মরত। অস্থায়ী বা বদলি মিলে এ সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি। হঠাৎ বন্ধের সিদ্ধান্তে পাটকল ঘিরে লাখো মানুষের জীবিকায় বিপর্যয় নেমে এসেছে। শ্রমিকরা টানা ১০ মাস বেকার থাকায় তাদের পরিবারে চলছে হাহাকার। অনেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন। তারা পাটকল আবার চালুর দাবি জানিয়েছেন।

পাটশিল্প রক্ষা যুবজোটের উপদেষ্টা নুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে, ‘বিজেএমসি কর্মকর্তা ও বেসরকারি পাটকল মালিকদের যোগসাজশ রয়েছে। ফলে মৌসুমে সরকার পাট কিনতে গড়িমসি করে। এ সুযোগে কম দামে পাট কিনে গুদাম ভরে বেসরকারি মালিকরা। এরপর বাজারে পাট সংকটের অজুহাতে বেশি দামে বেসরকারি মিলমালিক থেকে পচা পাট কেনে বিজেএমসি। মূলত পুরাতন মেশিন, ক্ষমতাসীন দলের নেতা, সিবিএ এবং পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের পারিবারিক সিন্ডিকেটের ষড়যন্ত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল লাভের মুখ দেখে না। সরকার এ চক্র না ভেঙে নিরীহ শ্রমিকদের জীবিকা কেড়ে নিয়েছে।’

ভুতুড়ে নগরী খালিশপুর : খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলের দুই নম্বর গেট মোড়ে অবসরপ্রাপ্ত পাটকল শ্রমিক সিদ্দিকুর রহমানের হোটেল। লোকজন নেই। তার ছেলে আজিজুর রহমান হোটেলটি চালান। তিনি বলেন, ‘দুপুরে আগে হোটেলে বসার জায়গা থাকত না। আমরা একটা মিনিটও ফুরসত পাইতাম না। চারদিকে তাকান কোনো লোক দ্যাখবেন না। কী দিন কী হইয়া গেল?’ হোটেলের সামনেই মোতালেব মিয়ার চা-পান-সিগারেটের দোকান। তিনি বলেন, ‘দিন যাইতেছে মাছি মাইর‌্যা। শ্রমিকরা সব এলাকা ছাইড়্যা পালাইছে। খালিশপুরে দিন-রাইত সমান আছিল। এখন দিনের বেলাও রাইত হইয়া গেছে। সারা দিনে দুইশ টাকাও বিক্রি নাই। অথচ আগে দুই হাজার টাকার বেশি ব্যাচতাম।’

স্থানীয়রা জানায়, পাটকল বন্ধের পর শ্রমিকরা যে যার মতো চলে গেছে। বলা চলে তারা পালিয়ে গেছে। কারণ বন্ধের দিনই পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। শ্রমিক আন্দোলন ঠেকাতে কলোনিগুলোতে নেওয়া হয় নিরাপত্তা। গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেক শ্রমিক এলাকা ছাড়ে। আবার অনেকে পরিবার গ্রামে পাঠিয়ে দেয়। এরপর থেকে খালিশপুর ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়েছে।

বদলি শ্রমিকরা অনিশ্চয়তায় : গোপালগঞ্জের নুর ইসলাম (৫০) ২৪ বছর প্লাটিনাম জুবিলি মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করলেও স্থায়ী হতে পারেননি। পাটকল বন্ধের পর দিনমজুরের কাজ করছেন। তবে নুর ইসলামের ভাষ্য, ‘খালিশপুরে এখন অগুনতি বেকার। ১৫০ টাকার মজুরিতেও কেউ কাজে নিতে চায় না। শ্রমিক নেতাদের টাকা দিলেও আমাকে স্থায়ী করেনি। এখন চোখে অন্ধকার দেখতেছি। বদলি শ্রমিকরা কিছু পাবে কি না তাও জানি না।’

শ্রমিক নেতারা জানান, শুধু খুলনা অঞ্চলেই প্রায় ২৫ হাজার বদলি শ্রমিক রয়েছেন। মিল বন্ধে তারা গভীর অনিশ্চতায় পড়েছেন। এ বিষয়ে প্লাটিনাম জুট মিল বদলি শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি আবদুর রাজ্জাক তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার বলছে স্থায়ী শ্রমিকদের পাওনা মিটিয়ে পরে বদলিরা। সর্বোচ্চ হইলে আমরা এক-দেড় লাখ টাকা পাব। এ টাকায় কয়দিন চলবে? আমরা চাই পাটকল চালু করা হোক।’

অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকরা বিপদে : ২০১৬ সালে প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিল থেকে অবসরে যান সিদ্দিকুর রহমান (৭০)। বর্তমানে হার্টের রোগী, লাঠি ছাড়া চলতে পারেন না। সপ্তাহে ৩০০-৪০০ টাকার ওষুধ লাগলেও টাকার অভাবে তা প্রায় বন্ধ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সিদ্দিকুর বলেন, ‘কার কাছে যাব। নিজের রক্ত পানি করা পরিশ্রমের টাকা তুলতে গেলেও পদে পদে ঘুষ দিতে হয়! সিবিএ নেতারা ঘুষ নেয়; বিজেএমসি কর্মকর্তারা ঘুষ চায়। দেই, তবুও কাজ হয় না। মরার আগে এ টাকা পাব বলে মনে হয় না।’

শ্রমিকরা জানান, ২০১৩ সালের জুলাই মাসের পর যেসব শ্রমিক অবসরে গেছেন, তাদের কেউই এখনো অবসরকালীন টাকা পাননি। বিজেএমসির হিসাবে, এ ধরনের শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। ২০১৪ সালে অবসর নেওয়া শ্রমিক আবদুল জলিল বলেন, ‘খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে। আজও মজুরি কমিশন আর গ্র্যাচুইটির টাকা পাইনি।’

এ বিষয়ে বিজেএমসির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রউফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো দেশে সরকার কি ব্যবসা করতে পারে? ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েও হাউকাউ কমেনি। পাটকল আবার চালুর বিষয়ে আমরা একটা কমিটি করেছি। আরেকটি কমিটিও হয়েছে। তারা বিজেএমসির কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাই বিষয়ে কাজ করছে। শ্রমিকরা না থাকলে তাদেরও তো প্রয়োজন নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত