ধর্ষণ প্রতিরোধে সামাজিক সংস্কার

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২০, ০৫:০৮ এএম

ধর্ষণের বিরুদ্ধে অনেক দিন পর একটি সংস্কারমূলক আন্দোলন হলো। শুরুটা হয়েছিল নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একটি ভিডিও ফাঁস হওয়ার মধ্য দিয়ে। আন্দোলন শুরু হওয়ার পরও ধর্ষণকাণ্ড বন্ধ হয়নি। বরং প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কান্ডজ্ঞানহীন নৃশংস ঘটনার খবর ছাপা হচ্ছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ধর্ষণ সর্বত্র মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। কে ধর্ষণকারী না? বিভিন্ন খবরে দেখা যাচ্ছে প্রায় সব শ্রেণির ও বয়সের পুরুষরাই ধর্ষণ করছে। ঘটছে একের পর এক দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো ঘটনা। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও উঠছে সর্বত্রই। ধর্ষণকান্ডের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কেউ আছে ধর্ষণকারী আবার কেউ কেউ ধর্ষণকারীর সহযোগী বা সমর্থনকারী। দুটোই সমানভাবে ঘৃণ্য। নিকট অতীতে আমরা যতগুলো আন্দোলন প্রত্যক্ষ করেছি তার মধ্যে ধর্ষণের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনটি সবেচয়ে বেশি প্রগতিশীল। তাই এই আন্দোলন বেশি বেশি সাধুবাদ ও সমর্থন পাওয়ার যোগ্য। আরও ইতিবাচক হচ্ছে এই আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে রাজনীতিবিদসহ পেশাজীবী ও সামাজিক অনেক গোষ্ঠী। সাধারণত আমাদের দেশের আন্দোলনের মধ্যে এমন সামগ্রিকতা দেখা যায় না।

পুরুষতান্ত্রিক ও পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় প্রায় সবক্ষেত্রেই পুরুষরাই ক্ষমতা কাঠামোর কেন্দ্রে অবস্থান করে। পরিবার থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই পুরুষতন্ত্র শেখানো হয়। শুধু শেখানো হয় বললে ভুল হবে যথারীতি চর্চা করা হয়। অধিকন্তু চর্চা করতে উৎসাহিত করা হয়। সম্প্রতি ইউনিসেফ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষতন্ত্রের বলি আমাদের দেশের মেয়েরা। আর এ কারণে বাল্যবিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সেরা। আমাদের দেশে এখনো ৫১ শতাংশ মেয়ের ১৮ বছরের আগেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। আর এর পেছনে সমাজ ও পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি যেমন দায়ী তেমন দায়ী পুরুষের অল্পবয়সের মেয়েদের বিয়ে করার দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচারণা।

প্রাণিসমাজে যৌনতা একটি স্বাভাবিক বিষয়, মানুষও প্রাণিসমাজের অন্তর্ভুক্ত। যৌনতা যেমন বংশবৃদ্ধির উপায়, একইসঙ্গে যৌনতা নতুন সৃষ্টির জন্য ভালোবাসারও বহিঃপ্রকাশ। অন্য অনেক সমাজের মতো আমাদের দেশেও যৌনতাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয় এবং একে নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সামাজিক ও পোশাকি আবরণ যুক্ত করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই রীতিনীতি হিতে বিপরীত হয়ে হিংস্রতা ও বিকৃতির প্রকাশ ঘটায়।

মানুষের মানবিক মূল্যবোধ বলে মানুষ জন্মগতভাবে ধর্ষণকারী না কিন্তু তাকে বিভিন্নভাবে ধর্ষণকারী বানানো হচ্ছে। এই বানানোর ক্ষেত্রে গোষ্ঠীগত স্বার্থই প্রধান। মানবসমাজের পুরুষ প্রজাতির কতিপয় ব্যক্তি নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য এমন সব সামাজিক নীতি, নৈতিকতা ও সামাজিক মিথ তৈরি করেছে যাতে নিজেকে ক্ষমতাবান হিসেবে হাজির করার জন্য নিজের মধ্যেই এক ধরনের বিকৃত মানসিকতার জন্ম দিচ্ছে ও লালন করছে এবং এক সময় দানব হিসেবে সমাজের সামনে আবির্ভূত হচ্ছে। এই কাঠামোর মধ্য দিয়ে সবাই ধর্ষণকারী দানব হচ্ছে না বটে কিন্তু ধর্ষণকান্ডকে প্রকাশ্য ও মৌন সমর্থনকারী বা ধর্ষণকান্ডের পক্ষে নারীর ওপর দোষারোপকারীর সংখ্যা অজস্র। যার মধ্যে নারী-পুরুষসহ সব লিঙ্গের জনগোষ্ঠী আছে। যে কেউ সামাজিক মাধ্যমের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর কর্মকান্ড পর্যালোচনা করলে এই ধারণাই পাবে।

অন্যদিকে আমাদের সমাজব্যবস্থায় যৌনতার ওপর যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় তা অনেকটাই কপটতায় পরিপূর্ণ। সংযম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীদের জন্য প্রযোজ্য পুরুষদের জন্য নয় অধিকন্তু পুরুষের পৌরুষ নিয়ে নানা চটকদার ও অশ্লীল আলোচনাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। আবার এই আমরাই নারীকে নির্বিচারে ভোগের পণ্য হিসেবে বিবেচনা করি। কোথায় নারীকে ভোগের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না? বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এই উপস্থাপনা প্রায় সর্বত্র দৃশ্যমান। এমন নয় যে, বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নারীকে পণ্য হিসেবে আমাদের সামনে জোর করে উপস্থাপন করছে। মোটেও তা নয়। মূল কথা হচ্ছে পুঁজিবাদ পুরুষতন্ত্রের এই গোপন লালসার কথা জানে আর আদি থেকে সেটাকেই ব্যবহার করছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এই সব কর্মকান্ডের পেছনে সমাজের প্রচ্ছন্ন সমর্থন যে আছে তা অনস্বীকার্য। সমাজ এভাবে ছোট ছোট পৌরুষ প্রকাশ করা শেখাতে শেখাতে কাউকে কাউকে এক সময় বড় দানবে পরিণত করে।

এই দানবদের বর্বরতার শিকার শুধুমাত্র মেয়ে শিশু, কিশোরী ও নারীরা নয় বরঞ্চ লিঙ্গ নির্বিশেষে সব শিশু। আমরা জানি আমাদের পরিবার ও সমাজে যেকোনো লিঙ্গের শিশু অনেকেই বয়স্ক, নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীদের দ্বারা বিকৃত যৌন লালসার শিকার হয়। অনেক সময় আমরা তা দেখেও দেখি না বা অগ্রাহ্য করে থাকি সামাজিক সম্মান ও লোকলজ্জার ভয়ে। যৌনতা সম্পর্কিত আলোচনা আমাদের সমাজে নিষিদ্ধ। তার মানে এই নয় যে, আমাদের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যৌনতা সম্পর্কিত আলোচনা হয় না। আলোচনা তো হয়ই কিন্তু সর্বনাশ যেটা হয় যৌনতা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় শিক্ষার অভাবে বিকৃত বিষয়গুলোই বেশি নজর কাড়ে। যা ক্রমে ক্রমেই লালসার জন্ম দেয়। 

এখন পৃথিবী অনেক উন্মুক্ত। সবকিছু ঢাকঢাক গুড়গুড় করে রাখা সম্ভব না। প্রযুক্তি ইতিবাচক ও নেতিবাচক সব ধরনের কনটেন্ট আমাদের সবার সামনে অবারিত করে রেখেছে। চাইলেই সবকিছু বন্ধ করে রাখা সম্ভব নয় বরঞ্চ চেষ্টা করা উচিত নেতিবাচক বিষয়গুলো যাতে মানসপট দখল করে নেওয়ার আগে ইতিবাচক ও যৌক্তিক বিষয়গুলো দ্বারা মানসজগৎ পল্লবিত হয়।

সারা পৃথিবীই পুরুষতন্ত্রের এই রোগে আক্রান্ত কিন্তু দেশভেদে এর মাত্রার তারতম্য আছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আমাদের পুরুষতন্ত্র ও গোঁড়ামি একে অপরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। যাকে আমরা প্রায় সবাই ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় সমর্থন করি। এই পুরুষতন্ত্র ও গোঁড়ামিকেই এখন প্রতিরোধ করার পালা। সাম্প্রতিক ধর্ষণ ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বিরুদ্ধে আন্দোলন তাই নিজেদের পুরুষতান্ত্রিকতা ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে আন্দোলন। আগেও এই ধরনের নির্যাতন ও সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখেছি যেগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও উন্নয়ন সংস্থার আয়োজনে কিন্তু এবারের আন্দোলনে সমাজ সংস্কারের বৈশিষ্ট্যগুলো কিছুটা হলেও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। আর এখানে চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে নিজের সঙ্গে নিজের। প্রথাগত মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে নতুন কিছু গ্রহণ করার। প্রত্যাশা এই আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হোক। আমরা আরও বেশি বেশি নিজেরা নিজেদের চ্যালেঞ্জ করি, আমাদের পরিবার ও সমাজ আরও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করুক।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত