মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কোয়ারেন্টাইনে যেতে হবে বিদেশফেরতদের

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২০, ০৩:২০ এএম

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। প্রথম দফায় ইতালিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বাংলাদেশি এবং অন্যান্য ব্যক্তির করোনা পরীক্ষা ও কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতের ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সরকার। এছাড়া দেশের সব জায়গায় মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। লকডাউন এড়াতেই করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার প্রথম ঢেউ অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ ভালোভাবেই মোকাবিলা করেছে। এটা সম্পূর্ণ সরকারের বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কৃতিত্ব নয়। অনেক ভুল সিদ্ধান্তের পরও ইতিবাচক হলো দেশে করোনায় মৃত্যুহার কম। তবে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে অনেক বেশি মানুষ। পরীক্ষা কম হওয়াতে আক্রান্তের সংখ্যা কম হয়েছে। মানুষের মধ্যে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে। আবার সরকারের পক্ষ থেকে লকডাউন ঘোষণা না এলেও ১৭ মার্চ থেকে এক ধরনের লকডাউনেই ছিল দেশ।

জনপ্রশাসন, স্বাস্থ্য, পররাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত টিম করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় গত এপ্রিলে সরকারের দেওয়া ২১ দফা নির্দেশনা পালনে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে। এসব মন্ত্রণালয়ের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে শীতে করোনা বাড়ার আশঙ্কা করে অক্সিজেন সিলিন্ডার ও করোনা চিকিৎসায় সব ধরনের প্রস্তুতি রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লকডাউন শুরু হয়েছে। শীতে করোনা বাড়তে পারে এ আশঙ্কায় আমরা আগাম প্রস্তুতি নিয়েছি। বিশেষ করে বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইন ও করোনা পরীক্ষা করা হবে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. বে-নজির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় খুব সতর্ক থাকতে হবে। এখনই লকডাউনের বিষয়ে বলার সময় আসেনি। তবে করোনা মোকাবিলায় জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটি লকডাউনের বিকল্প হিসেবে জোনভিত্তিক লকডাউনের কথা বলেছে। আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। কারণ দ্বিতীয় ঢেউ সামাল দেওয়া কঠিন হবে। তিনি পরীক্ষা বাড়ানোরও পরামর্শ দেন।

এদিকে গতবারের ইতালি ও অন্যান্য দেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের মাধ্যমে করোনা ছড়ানোর বিষয় থেকে অভিজ্ঞতা নিয়েছে সরকার। এবার যেন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না হয় সে ব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিদেশ থেকে আসা কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে যাতে দেশে কভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস ছড়াতে না পারে সেটি পর্যবেক্ষণের জন্য পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শাহরিয়ার আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল এ বিষয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে গঠিত সচিব কমিটি গোটা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ এবং এ সম্পর্কিত করণীয় কী সে বিষয়ে কমিটি সুপারিশ করবে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

যুক্তরাজ্যে দ্রুতগতিতে কভিড ছড়িয়ে পড়ছে কিন্তু ঢাকা-লন্ডন ফ্লাইট চালু এ বিষয়ে শাহরিয়ার আলম বলেন, পৃথিবীর কয়েকটি দেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ওই দেশগুলোর বিষয়ে বিশেষভাবে খেয়াল রাখবে এ কমিটি। এ বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ইতালি থেকে আসা বাংলাদেশিদের বিক্ষোভের কারণে সরকার তাদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেনি এবং এবারও সেই ধরনের পরিস্থিতি হবে কি না এ প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এবার শক্তভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।

বিদেশফেরতদের বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, বিমানবন্দরে স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। যারা বিদেশ থেকে আসেন তাদের অনেকের নেগেটিভ সার্টিফিকেট থাকলেও কিছু লক্ষণ ধরা পড়ে। এসব ব্যক্তির বিমানবন্দরে শনাক্ত করার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। তিনি বলেন, এ নিয়মটি আগে থেকে ছিল কিন্তু এবার সংখ্যা বাড়ানো হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, করোনার কারণে এ বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না রাখার কথা বলেছে জাতীয় কমিটি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আগে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পক্ষে নয়। ফলে অটোপাসের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। তবে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন খোলা রাখতে চায় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে। শুরুতেই সরকার লকডাউনে যাবে না। যদি করোনা পরিস্থিতি বেড়ে যায় তবে এলাকাভিত্তিক লকডাউনে যাবে। ব্যবসায়ীরাও লকডাউনে যেতে চান না। এরই মধ্যে করোনা নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।

গতকাল দোকান মালিক সমিতির পক্ষ থেকে বৈঠক করে বলা হয়েছে, মাস্ক না পরলে সেই ক্রেতার কাছে পণ্য যেন বিক্রি করা না হয়।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে শুরু করলে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় পর্যায়ক্রমে পাঁচ ধাপে এ ছুটি বাড়িয়েছে সরকার। সর্বশেষ গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ছুটিও বাড়িয়ে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। গত আট মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও সরকার টিভি, রেডিও এবং অনলাইনের মাধ্যমে ক্লাস কার্যক্রম চালু রেখেছে। যদিও এ সময়ের মধ্যে কোনো পরীক্ষাই হয়নি। গত ২৫ আগস্ট পিইসি পরীক্ষা বাতিল করে সরকার। পরবর্তীকালে ২৭ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষাও বাতিল ঘোষণা করে। এরপর সর্বশেষ গত ৭ অক্টোবর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা বাতিল করে ওই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের জেএসসি ও এসএসসি এবং সমমানের ফলাফলের ভিত্তিতে ওই পরীক্ষার ফল ঘোষণা করা হবে বলে সিদ্ধান্ত জানানো হয়। এছাড়া প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ছাড়াই মূল্যায়নের মাধ্যমে পরিবর্তিত ক্লাসে উত্তীর্ণ করার ঘোষণা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

গত এপ্রিলে করোনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা নির্দেশনা পালনের বিষয়ে জোর দেওয়া হয়। এছাড়া করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে বিভিন্ন এলাকাকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন এই তিন ভাগে ভাগ করে জোনভিত্তিক লকডাউন করার পরিকল্পনার বিষয়টিও সরকারের আলোচনার মধ্যে রয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রস্তাব ও কর্মপরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটি এবং স্বাস্থ্যবিদদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকের পর জোনভিত্তিক লকডাউনের প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করা হয়। ঢাকার রাজাবাজারসহ কয়েকটি স্থানে জোনভিত্তিক লকডাউনের ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। ফলে এটিও সরকারের প্রস্তুতির মধ্যে রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত