সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

সম্পত্তি দখলের মতলবে ছিল ভন্ড নবাব দম্পতি

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২০, ০৩:২৫ এএম

দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকা নবাব স্যার সলিমুল্লাহ পরিবারের সম্পত্তি দখলের পরিকল্পনা থেকেই ভুয়া নবাব দম্পতি সেজেছিলেন কথিত নবাব আলী হাসান আসকারী ও তার স্ত্রী সাহেবা হেনা আসকারী। শুধু তাই নয়, এজন্য তারা গড়ে তুলেছিলেন ভয়ংকর একটি চক্রও। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল নবার পরিবারের উত্তরাধিকারী সেজে নবাব এস্টেটের জমি দখল। এজন্য তারা বিভিন্ন কৌশলে নিজেদের নাম-পরিচয় বদলে ফেলে নবাব পরিবারের পদবি ধারণ করেন। এমনকি নিজেদের জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে শুরু করে পাসপোর্ট ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সব সনদপত্রের তথ্যও জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবর্তন করেন এ দম্পতি। গতকাল রবিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।

সিটিটিসির তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কথিত নবাব আলী হাসান আসকারীর প্রকৃত নাম-পরিচয় এখনো উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। তবে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলছেন, তার প্রকৃত নাম আলী হাসান। নবাব সাজার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘আলী হাসান’ নামের আগে ‘নবাব’ ও শেষে ‘আসকারী’ যোগ করেন। একইভাবে তার স্ত্রীর আসল নাম ছিল মেরিনা আক্তার। নবাবের স্ত্রী হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে তিনিও তার প্রকৃত নাম-পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করেছেন। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মেরিনার এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সনদপত্রের নাম পাল্টে ফেলা হয়। নতুন সনদপত্র অনুযায়ী তার নাম পুরোপুরি বদলে হেনা আসকারী বানানো হয়েছে। আর নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিজেদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টও বদলে ফেলেন মেরিনা দম্পতি।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রতারক এ দম্পতির সহযোগী হিসেবে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মধ্যে অন্তত তিনজন আলী হাসানের আপন ভাই। যদিও আসকারী তাদের বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের নবাব এস্টেটের জমি দখলের জন্য সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে পাঁচটি মিস কেস করেছিল আসকারীর চক্রের সদস্যরা।

সিটিটিসির ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আলী হাসান আসকারী ও তার স্ত্রী মেরিনা আক্তারের বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাছাই-বাছাই ও তাদের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশন, পাসপোর্ট অফিস ও যশোর শিক্ষা বোর্ডে চিঠি পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এছাড়া এ চক্রের আরও একাধিক সদস্যের তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

গত বুধবার ডিএমপির সিটিটিসির একটি টিম রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভুয়া নবাব আলী হাসান আসকারী ও তার পাঁচ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন আদালতের মাধ্যমে তাদের তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন মো. রাশেদ ওরফে রহমত আলী ওরফে রাজা, মীর রাকিব আফসার, মো. সজীব ওরফে মীর রুবেল, মো. আহাম্মদ আলী ও মো. বরকত আলী ওরফে রানা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কামরুল হাসান হৃদয় নামে আলী হাসান আসকারীর আরেকটি নাম পাওয়া গেছে। সেটিও যাচাই করে দেখা হচ্ছে। এছাড়া তার স্ত্রীর আসল নাম মেরিনা আক্তার। বাড়ি চুয়াডাঙ্গা জেলা সদরে। তার বাবার নাম হাতেম আলী। একসময়ে পেশায় রিকশাচালক হাতেম আলী পরবর্তীকালে মুদির দোকান দেন। এই হাতেম আলীর মেয়ে মেরিনা আক্তার হাসান আলীকে বিয়ে করে তার নাম-পরিচয় বদলে ফেলেন। মেরিনা যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও এইসএসসি পাস করেন। পরে আগের সার্টিফিকেট বদল করে হেনা আসকারী নাম ধারণ করেন। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ (আলমডাঙ্গা) আসন থেকে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করেন।

তদন্ত কর্মকর্তারা আরও জানান, আলী হাসান আসকারী ঢাকার নবাব এস্টেটের সম্পত্তির মধ্যে শাহবাগের একটি অংশের মোতাওয়াল্লি হওয়ার জন্য ভূমি অফিসে দুটি মিস কেস করেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জেও নবাব এস্টেটের কিছু সম্পত্তির মোতাওয়াল্লি হওয়ার জন্য তিনটি মিস কেস করেন। বর্তমানে এসব সম্পত্তি ভূমি সংস্কার বোর্ডের অধীনে রয়েছে।

নবাব পরিবারের বংশধর না হয়েও নবাব সেজে এসব মিস কেস করার কারণ জানতে চাইলে জিজ্ঞাসাবাদে আলী হাসান তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বলেন, অনেকেই ভুয়া নবাব সেজে নবাব এস্টেটের বিভিন্ন সম্পত্তির মোতাওয়াল্লি হয়েছেন। তিনিও সেই লোভে এসব মামলা করেন। তবে কোনো ফলাফল অনুকূলে নিতে পারেননি।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা আরও জানান, আলী হাসানের বাবা ২০০৫ সালে ঢাকার উত্তরায় বসবাসরত অবস্থায় মারা যান বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। পুরান ঢাকার ইসলামবাগে তাদের কাপড়ের ব্যবসা ছিল। তবে সেসব পরিচয় গোপন করে নিউ ইয়র্কে বেড়ে ওঠা, নেদারল্যান্ডসে বসবাস কিংবা থাকা, ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের পরিচয় ও দুবাইয়ে গোল্ডের ব্যবসা করার কথা বলে মানুষের বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা চালান আলী হাসান।

তদন্তকারী আরেক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই ভুয়া নবাব দম্পতি ও তাদের চক্রের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতারণার অভিযোগ আসছে। গতকাল পর্যন্ত এ চক্রের বিরুদ্ধে অন্তত ডজনখানেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ইতিমধ্যে চারটি মামলা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, আলী হাসান আসকারী ২০১৪ সালে ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলের কাছ থেকে নিজের নামে নবাব খাজা আলী আহসান আসকারী নামে একটি জন্ম নিবন্ধন সনদ নেন। সেই জন্ম নিবন্ধনের ভিত্তিতে তিনি নবাবের বংশধর হিসেবে পরিচয় দেওয়া শুরু করেন। ২০১৫ সালে তিনি ঢাকার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে একটি পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন। তবে তার পাসপোর্টের নথিপত্র ঘেঁটে সেখানে পুলিশ ভ্যারিফিকেশনের কোনো নথি পাওয়া যায়নি। স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে সেখানে উত্তরার মাসকট প্লাজা লেখা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো অসাধু চক্রের মাধ্যমে তিনি পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই পাসপোর্ট হাতে পান। জন্ম নিবন্ধন ও পাসপোর্ট দিয়ে তিনি ২০১৭ সালে আবেদন করে নবাব খাজা আলী হাসান আসকারী নামে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন। প্রথমদিকে জাতীয় পরিচয়পত্র না নিয়ে ২০১৭ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়ার বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার জিজ্ঞাসাবাদে কোনো সদুত্তর দেননি আসকারী। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ধারণা, তার অন্য কোনো নাম আছে। অন্য কোথাও বাসা আছে। যদিও ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের ভিত্তিতে তিনি নতুন নতুন জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে আসকারী সম্প্রতি ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে হারিকেন মার্কায় সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করেন। বাংলাদেশ মুসলিম লীগ নামে একটি দলের পক্ষ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। ওই নির্বাচনে তিনি ১৫টি ভোট পেয়েছিলেন। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা ও সম্পদ বিবরণীতে বাৎসরিক আয় দেখিয়েছেন ৬ লাখ টাকা। সম্পদ বিবরণীতে নিজেকে নবাব খাজা হাসান আসকারী জুট মিলস লিমিটেড এবং আঞ্জুমান আসকারী বেওয়ারিশ লাশ দাফন নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করেন।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের আসকারী জুট মিলস নবাব এস্টেটের সম্পত্তি। সরকার এ মিল অধিগ্রহণ করেছিল। পরে তা পরিচালনার জন্য বেসরকারি খাতের শিকদার গ্রুপের কাছে দেওয়া হয়েছে। আলী হাসান আসকারী সেই জুট মিলসের চেয়ারম্যান হিসেবে দাবি করেন। আর আঞ্জুমান আসকারী নামে প্রতিষ্ঠানটি নামসর্বস্ব। হলফনামায় নিজেকে মাস্টার্স পাস উল্লেখ করলেও জিজ্ঞাসাবাদে আলী হাসান জানান, তিনি লালবাগের একটি মাদ্রাসায় কয়েক বছর হাফেজি পড়েছেন। তারপর আর কোনো প্রতিষ্ঠানে যাননি।

গ্রেপ্তার হওয়া কথিত নবাব আলী হাসান আসকারীর বিষয়ে জানতে চাইলে নবাব পরিবারবিষয়ক এক গবেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার হওয়া আসকারীর কথা আমি শুনেছি। তার সম্পর্কে আমি জানি। এককথায় বলতে গেলে সে একজন বাটপার।’

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই ভুয়া নবাব যেসব দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরা করতেন তাদের দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া নিতেন। প্রত্যেক দেহরক্ষীর জন্য প্রতিদিন আড়াই হাজার টাকা করে দিতেন। এসব দেহরক্ষী নিতেন প্রগতি সরণি এলাকা থেকে।

তারা আরও জানান, বরিশালের সংরক্ষিত আসনের এক নারী সদস্যের আত্মীয়ের সঙ্গে বস্তা সরবরাহের নাম করে ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আসকারী। এ ঘটনায় বিল্লাল হোসেন নামে একজন অভিযোগ করেন। এর আগে পুলিশের এসআই পদে চাকরি দেওয়ার নামে ও সিঙ্গাপুরে পাঠানোর কথা বলে জামালপুরের মাহমুদুল হাসান মাহমুদ নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৪৩ লাখ টাকা নেন এই প্রতারক। এছাড়া সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নার্স নিয়োগের নামে ফেনীর ৪০০ ব্যক্তির কাছ থেকে ৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় এ প্রতারকচক্র। গত বৃহস্পতিবার মানজুর রহমান নামে এক ব্যক্তি মিরপুর থানায় আসকারীর বিরুদ্ধে ৪৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে একটি মামলা করেন। গত শনিবার তাজুল ইসলাম নামে আরেক ভুক্তভোগী মতিঝিল থানায় আরও একটি প্রতারণার মামলা করেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত