৪২ বছর আগের ঘটনা। দিনটা ছিল ১৯৭৮ সালের ৩ নভেম্বর। ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে ম্যাচ ছেড়ে দেওয়ার প্রথম ঘটনা ঘটেছিল এদিন।
বিষেন বেদির নেতৃত্বে পাকিস্তান সফরে গিয়েছিল ভারত। কোয়েটাতে প্রথম ওয়ানডে জিতেছিল তারা। অসাধারণ খেলেছিলেন মহিন্দর অমরনাথ। এরপর চার পেসার খেলিয়ে শিয়ালকোট ম্যাচে জয় তুলে নেয় মুশতাক মোহাম্মদের পাকিস্তান। সেই ম্যাচে যদিও ইমরান খান খেলেননি। এরপর দুই টেস্ট খেলে দুদল। ফয়সালাবাদেরটা ড্র হওয়ার পর লাহোরে জিতে এগিয়ে থাকে পাকিস্তান। তৃতীয় টেস্টের আগে শাহিওয়ালের জাফর আলি স্টেডিয়ামে ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি হয় তৃতীয় ওয়ানডেতে।
অধিনায়ক মুশতাক মোহাম্মদ টস জিতে আগে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ফ্ল্যাট উইকেটে স্বাগতিকদের শুরুটাও ভালোই হয়েছিল। মাজিদ খান আর আজমত রানা ধীরেসুস্থে ৩৮ রান তোলার পর বিচ্ছিন্ন হন। এরপর আসিফ ইকবাল ৭২ বলে ৬২ করলেও ৪০ ওভারে পাকিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৭ উইকেটে ২০৫। শেষ দিকে কারসন ঘাউরি, শ্রীনিবাস ভেঙ্কটরাঘবান এবং মহিন্দর অমরনাথ দারুণ বোলিং করেছিলেন। বেদি ৮ ওভারে ৪৪ রান দিলেও উইকেট পাননি। ওই সফরেই অভিষিক্ত কপিল দেব ৪৯ রানের বিনিময়ে ২ উইকেট নিয়েছিলেন।
তিন টেস্টের সিরিজে ৮৯.৪০ গড়ে ৪৪৭ রান করা সুনিল গাভাস্কার শেষ ওয়ানডেতে খেলেননি। তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিতে পারেনি পাকিস্তান। জবাব দিতে নেমে চেতন চৌহান আর অংশুমান গায়কোয়াড ৪৪ রানের জুটি গড়েন। ২৩ রানে চৌহান প্যাভিলিয়নে ফেরার পর এক প্রান্ত আগলে রেখেছিলেন গায়কোয়াড। দ্বিতীয় উইকেটে সুরিন্দর অমরনাথকে নিয়ে ১১৯ রানের জুটি গড়েন তিনি। ১ উইকেটে ভারত পৌঁছে যায় ১৬৩ রানে। সুরিন্দরকে আউট করে আসিফ ইকবাল ব্রেক থ্রু দিলেও ম্যাচে ফিরতে পরেনি স্বাগতিকরা। গায়কোয়াড আর গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ সফরকারীদের সহজ জয়ের খুব কাছে নিয়ে যান। ২ উইকেটে ১৮৩-তে পৌঁছে যায় ভারত। ৩ ওভারে দরকার ২৩ রান। গায়কোয়াড আর বিশ্বনাথের জন্য এই রান কঠিন কোনো বিষয় ছিল না। তাছাড়া প্যাভিলিয়নে অপেক্ষায় ছিলেন মহিন্দর অমরনাথ, কপিল দেব এবং যশপাল শর্মার মতো অলরাউন্ডার। পরিস্থিতি অনুকূলে নয় বুঝেই রিভার্স সুইংয়ের আবিষ্কারক সরফরাজ নেওয়াজের হাতে বল তুলে দেন মুশতাক মোহাম্মদ। তার ২ ওভার তখনো বাকি। অন্য ওভারটি করবেন ইমরান।
নিজের সপ্তম ওভারের (ম্যাচের আটত্রিশতম ওভার) প্রথম বলটি বাউন্সার দিয়েছিলেন সরফরাজ। যা ব্যাটসম্যানের মাথার ওপর দিয়ে সোজা উইকেটরক্ষক ওয়াসিম বারির হাতে আশ্রয় নেয়। গায়কোয়াড ভেবেছিলেন ওয়াইড। আম্পায়ার খিজির হায়াত এবং জাভেদ আকতার যদিও নির্বিকার ছিলেন। ড্রেসিং রুমে বসে বেদিরা ভেবেছিলেন জাজমেন্টের ভুল। কিন্তু সরফরাজ পরের বলও বাউন্সার দেন। যথারীতি ওয়াইড ডাকেননি আম্পায়ার। তৃতীয় বলেও একই কা-! আর চতুর্থ বল গায়কোয়াডের মাথার ৬ ফিট ওপর দিয়ে ওয়াসিম বারির গ্লাভসে। তখনো আম্পায়াররা নির্বিকার। অধিনায়ক বেদি ততক্ষণে বুঝে গেছেন মাঠে কী হতে চলেছে। আম্পায়ার এবং পাকিস্তান দলের বোঝাপড়া স্পষ্ট হয়ে যায়। ড্রেসিং রুম থেকে গায়কোয়াড আর বিশ্বনাথকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ পাঠান বেদি। ম্যাচ ছেড়ে বেরিয়ে যায় ভারত। ওটা ছিল একদিনের ক্রিকেটে ম্যাচ ছাড়ার প্রথম ঘটনা। যার ফলে পাকিস্তান ২-১ এ সিরিজ জিতে নেয়।
১৯৭৫-৭৬ মৌসুমে বেদি ক্যারিবিয়ান পেসারদের বাউন্সে অতিষ্ঠ হয়ে আরও একবার দল তুলে নিয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে ভয়ও কাজ করেছিল। শাহিওয়ালে দল তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে বেদির মনে ভয় কাজ করেনি। মজার ব্যাপার সেই ওয়ানডের পর শাহিওয়ালে আর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়নি।
সেই ঘটনা নিয়ে পরে উইকেটকিপার ওয়াসিম বারী দুঃখপ্রকাশ করে বলেছেন, ‘ভারতের সঙ্গে অবিচার হয়েছে। আমাদের এমন করা উচিত হয়নি। আমরা অনুতপ্ত, কারণ ভারত ম্যাচটা জেতার মতো অবস্থায় ছিল।’
ওয়ানডেতে মাঠ ছাড়ার দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে ২২ বছর পর ন্যাটওয়েস্ট ট্রফিতে। সেই ম্যাচে অ্যালেক স্টুয়ার্টের ইংল্যান্ড পরাজয় মেনে নিয়েছিল। হেডিংলিতে দর্শক ঢুকে ম্যাচ পন্ড করার সময় পাকিস্তানের ৬১ বলে ৪ রান দরকার ছিল। ম্যাচটা তারাই জিতত। দর্শক হাঙ্গামাটা ছিল উপলক্ষ মাত্র।
