বিনিয়োগ কোটায় বিদেশে নাগরিকত্ব নেওয়া বাংলাদেশিদের বিষয়ে তথ্য চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বিদেশে নাগরিকত্ব নেওয়া এসব ব্যক্তিরা হুন্ডি, মিস ইনভয়েসিং ও ব্যাংক ক্যাশ ট্রান্সফারসহ নানা উপায়ে দেশের বাইরে অর্থ পাচার করেছেন। অর্থ পাচার আইন অনুযায়ী বিষয়টি অপরাধ হওয়ায় দুদকের মানিলন্ডারিং অনুবিভাগ থেকে তাদের বিষয়ে যাবতীয় তথ্য চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
গত ২২ অক্টোবর দুদকের মানি লন্ডারিং অনুবিভাগের মহাপরিচালক আ.ন.ম আল ফিরোজ স্বাক্ষরিত ওই ‘অতীব জরুরি চিঠি’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে। আ.ন.ম আল ফিরোজ নিজেই দেশ রূপান্তরকে চিঠি পাঠানোর বিষয়টি জানিয়েছেন।
দুদকের পরিচালক পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, তারা বিভিন্ন সূত্র জানতে পেরেছেন যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ কোটায় নাগরিকত্ব নিয়েছেন। ক্যাসিনো কাণ্ড ও স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অনুসন্ধানের সময় কমিশন বিদেশে সম্পদ পাচারের তথ্য মিলেছে। এমনকি অনেকের বিনিয়োগ কোটায় বিভিন্ন দেশে নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে। ওভার ইনভয়েসিং ও হুন্ডিসহ নানা অবৈধ উপায়ে দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বিষয়ে দুদক অন্তত ৫০টি দেশে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) বা পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি পাঠিয়েছে। ২২টি দেশ থেকে কিছু এমএলএআরের জবাবও পাওয়া গেছে। এই অবস্থায় বিদেশে বিনিয়োগ কোটায় নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের তথ্য ও তালিকা পাওয়া গেলে বিদেশে অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ও অর্থ ফেরত আনা সম্ভব বলে কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দূতাবাসের মাধ্যমে যাবতীয় তথ্য পেতে চায় দুদক।
দুদকের পাঠানো চিঠির বিষয়বস্তু হিসেবে বলা হয়েছে, ‘বিভিন্ন দেশে পাচারকৃত অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব গ্রহণকারী বাংলাদেশিদের তালিকা সংগ্রহ প্রসঙ্গে।’
ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও পত্রিকায় প্রকাশিত আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মিস-ইনভয়েসিং, হুন্ডি, ব্যাংক ক্যাশ ইত্যাদি মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার হয়ে থাকে। এর ফলে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার মূলধন হারানোয় কাক্সিক্ষত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার জন্য যে পরিমাণ দেশীয় বিনিয়োগ করা প্রয়োজন তা নিশ্চিত করতে হলে অর্থ পাচাররোধ করা একান্ত দরকার।’
চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশের নাগরিকদের একাংশ পাচার করে বিদেশে বিনিয়োগের (ইনভেস্টমেন্ট কোটা) মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। বহুল আলোচিত পানামা পেপার্স, প্যারাডাইস পেপার্স ইত্যাদি কেলেঙ্কারিতে বিভিন্ন বাংলাদেশি নাগরিকের নামও উঠে এসেছে। এই ধারা রোধ করা সম্ভব না হলে আমাদের অর্থনৈতিক গতিশীলতা ভবিষ্যতে থমকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে অর্থপাচারের মাধ্যমে নাগরিকত্ব গ্রহণ রোধের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই। এটি একদিকে অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে দেশীয় সম্পদ ফেরত আনার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট অন্যদের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। যা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবেও কাজ করবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই দুরূহ কাজ সম্পন্ন করা ও কাক্সিক্ষত ফল লাভ করা সম্ভব নয়।’
দুর্নীতি দমন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে দুদকের চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশে পাচারকৃত সম্পদ বিনিয়োগের মাধ্যমে নাগরিকত্ব গ্রহণকারী বাংলাদেশিদের তথ্য কূটনৈতিক চ্যানেল সংগ্রহ করে দুদককে সরবরাহ করলে কমিশন দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হতে পারবে। এই অবস্থায় বিনিয়োগকারী কোটায় যেসব বাংলাদেশি নাগরিক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নাগরিকত্ব নিয়েছেন তাদের সম্পর্কে তথ্য ও তালিকা পাঠাতে অনুরোধ করা হচ্ছে।’
চিঠির বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক আ.ন.ম. আল ফিরোজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চিঠি দিয়েছি। জবাবের অপেক্ষা করছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছেও এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে।’
