ইরাক যুদ্ধের সময় দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন রবার্ট ফিস্ক। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংবাদ সংগ্রহ, ওসামা বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছিল। রবার্ট ফিস্ক প্রশংসিত ছিলেন তার বিশ্লেষণী সংবাদভাষ্যের জন্যও। গত ৩০ অক্টোবর আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে মৃত্যুবরণ করেন বর্ষীয়ান এই সাংবাদিক। তাকে নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা
রবার্ট ফিস্ক
ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে পরপর তিনবার দেখা করে সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক। সাংবাদিকতা জীবনে যেখানে সংবাদকর্মীরা মুখরোচক খবর নিয়ে কাজ করেছেন, ঠিক সেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন রবার্ট। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া সাহসী বাবা উইলিয়াম ফিস্কের একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি। ১৯৪৬ সালের ১২ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন ইংল্যান্ডের কেন্টের মেইডস্টোনে। কেন্টের ইয়ার্ডলি কোর্ট প্রিপারেটরি স্কুলসহ লেখাপড়া করেছেন সাটন ভ্যালেন্স স্কুল ও ল্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে। এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য বের হওয়া ম্যাগাজিন ‘জন ও’গন্টলেট’-এ লেখালেখি করতেন। পরে ১৯৮৩ সালে ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজ থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ডক্টরাল থিসিসের জন্য তিনি যে বিষয়টি বেছে নিয়েছিলেন তার নাম ছিল ‘সীমিত যুদ্ধের শর্ত : আয়ারল্যান্ডের নিরপেক্ষতা এবং ১৯৩৯-১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ডাবলিন, বেলফাস্ট ও লন্ডনের মধ্যকার সম্পর্ক’। লেখালেখি বিষয়ে আগ্রহ কীভাবে তৈরি হলো বা কীভাবেই বা তিনি রিপোর্টার হয়ে গেলেন সে গল্প রবার্ট নিজেও খুব ভালো বলতে পারেন না। তার নিজের চলচ্চিত্রের প্রতি ভীষণ আগ্রহ ছিল। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই রবার্ট সব সময় চলচ্চিত্র সমালোচক হতে চেয়েছেন। তার বিশ্বাস ছিল চলচ্চিত্রের এমন একটি শক্তি আছে, যা দিয়ে অন্যকে সহজেই কোনো বিষয় বোঝানো যায়। চলচ্চিত্রই হয়তো তার ক্যারিয়ার হয়ে উঠত, যদি না তিনি হিচককের যুদ্ধের ছবি ‘ফরেন করেসপন্ডেন্ট’ না দেখতেন।
সংবাদদাতার কর্মজীবন
সাংবাদিকতায় রবার্ট ফিস্কের ক্যারিয়ার শুরু হয় ‘সানডে এক্সপ্রেস’-এ। ১৯৭০ সালে বেলফাস্টে থাকার সময় নিজেকে স্বতন্ত্রভাবে গড়ে তোলেন তিনি। ১৯৭২ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের সংবাদদাতা হিসেবে যোগ দেন ‘দ্য টাইমস’-এ। এটি ছিল সেই শহর যেখানে অনেক সংবাদ সংস্থা সন্দেহজনক অনেক ঘটনা থেকে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু রবার্ট ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি প্রতিটি ঘটনা একবার নয়, কয়েকবার করে চেক করতেন। ব্রিটিশ সরকার ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে যা বলা হচ্ছে সেটা প্রথমবার শুনেই বিশ্বাস না করায় তার প্রতি অনেকেই ক্ষুব্ধ ছিলেন। পর্তুগালের পত্রিকার জন্যও রবার্ট রিপোর্টিংয়ের কাজ করেছেন। এরপর ১৯৭৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে আসেন সংবাদদাতা হিসেবে। কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় বৈরুতের একটি অ্যাপার্টমেন্টে কাটিয়েছেন। কয়েক দশক ছিলেন সেখানে। সময় পেলেই সন্ধ্যার সময়টুকু তিনি ব্যালকনিতে কাটাতেন। এখানে থাকলেও তিনি মন থেকে আয়ারল্যান্ডকে কখনো ভুলতে পারেননি। আয়ারল্যান্ড নিয়ে দুটি বই লিখেছেন, ডাবলিনের দক্ষিণে ডালকির সমুদ্রের ধারে সমুদ্রমুখী একটি বাড়ি কিনেছিলেন, যেখানে তিনি প্রায়ই যেতেন। পরে অবশ্য বৈরুতে অনেক বছর থাকার পর, বাড়িতে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ খানিকটা ছোঁয়া দিয়েছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাহীনতা ও সহিংসতা বিষয়ে রবার্টের অনেক আগ্রহ ছিল। লেবানন ও আলজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ, ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণ নিয়ে তিনি রিপোর্ট করেছিলেন। বোঝাই যাচ্ছিল এসব রিপোর্টের কারণে রবার্ট খুব জলদি অ্যাওয়ার্ড পেতে যাচ্ছেন। হলোও তাই। ১৯৭৯ সালে প্রেস অ্যাওয়ার্ডে বছরের সেরা ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্টার হিসেবে বিজয়ী হলেন। একই পুরস্কারের পুনরাবৃত্তি হয় ১৯৮০ সালে, ইরান-ইরাক দ্বন্দ্ব নিয়ে প্রতিবেদন করায়। সাবরা ও সাতিলা রিফিউজি ক্যাম্প যেখানে ১৯৮২ সালে এক হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল সেখানে গিয়ে রবার্টই প্রথম প্রতিবেদন তৈরি করেন। এটা এমন এক পরিস্থিতি ছিল যেটাই আসলে তাকে সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতে উৎসাহী করে তোলে। সে সময় লিখেছিলেন, ‘ইসরায়েলিরা হত্যা দেখছিল কিন্তু কিছু করেনি। দুজন সহকর্মীকে নিয়ে হত্যাকারীরা তাদের যুদ্ধাপরাধ শেষ করার আগেই আমি ক্যাম্পে গিয়েছিলাম। সদ্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক যুবতীর পাশে ঝুপড়ির পেছনের উঠোনে এক আমেরিকান প্রতিবেদকের সঙ্গে লুকিয়ে ছিলাম। আমাকে লাশের স্তূপের ওপর দিয়ে পার হতে হয়েছে। সে সন্ধ্যায় আমার পরনের কাপড়গুলো আমি জ্বালিয়ে দিই, কারণ সেগুলো থেকে কেমন যেন পচনের গন্ধ আসছিল।’ এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে রবার্ট পরে বলেছিলেন, ‘আমার মনে আছে আমি তখন ভাবছিলাম, এই মৃত মানুষগুলোর যদি আত্মা থাকে, তবে তারা চায় আমি এখানে থাকি। আমি থাকলে তারা হয়তো আমাকে বন্ধু ভাববে। সেজন্য আমি একদম ভয় পাইনি।’ এই বিষয় নিয়ে প্রতিবেদনের কারণে রবার্ট আবারও বছরের আন্তর্জাতিক সেরা রিপোর্টার হিসেবে পুরস্কার জেতেন। বিচারকরা তার এই কাজকে অসহনীয় বললেও তার এমন মানসিক শক্তিকে বাহবা জানান। যুদ্ধের ময়দান থেকে বাস্তবতা তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দুর্ভোগের ঘটনা সামনে আনার এমন চেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয় ছিল। পরের বছর, লেবাননের গৃহযুদ্ধ নিয়ে কাজ করায় রবার্ট সমগ্র বিভাগ মিলিয়ে সেরা সংবাদদাতার পুরস্কার জেতেন। লেবানিজদের দ্বন্দ্ব নিয়ে লেখা তার ‘পিটি দ্য ন্যাশন’ নামে প্রথম বই প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে।
কীভাবে তার রিপোর্টগুলো লেখা হয় সেটা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হলে ১৯৮৯ সালে রবার্ট দ্য টাইমস ছেড়ে চলে আসেন। পরে অবশ্য বিতর্ক সৃষ্টিকারী রুপার্ট মারডকের প্রতি ঘৃণাভরে লেখাও লিখেছিলেন তিনি। এরপর যুক্ত হন ‘দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ পত্রিকায়, যেখানে তিনি জীবনের বাকি অংশ কাটিয়েছেন। দীর্ঘ এই সময়ের মধ্যেই তিনি দু’বার বৈবাহিক জীবনে আবদ্ধ হন এবং বিশ্বজুড়ে অসংখ্য ও অগণিত স্থানে ভ্রমণ করেন।
বিপজ্জনক এলাকায় যাওয়া ও লেখালেখির জন্য রবার্ট ফিস্ক বেশি পরিচিতি পেয়েছিলেন। ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কোনো ধরনের গোপনীয়তা করেননি তিনি। আর্মেনিয়ার গণহত্যা নিয়ে লিখিত প্রতিবেদনে তার বক্তব্য বেশ সুস্পষ্ট ছিল। নিজের চোখে হত্যাকাণ্ড দেখে প্রায়ই মানুষের জীবনের করুণ অবস্থা নিয়ে লিখতেন বলে আমেরিকা ও ইসরায়েলের কাছে তিনি ছিলেন সমালোচিত এক নাম। সিরিয়াকে নিয়ে তিনি যেভাবে রিপোর্ট করতেন তাতে কখনো হয়তো তার লেখা বিতর্কিত হতো, কখনো বা নির্মম। ফিস্কের লেখার ধরনে যেমন অনেক শত্রু তৈরি হয়েছিল, ঠিক তেমনি সত্যিকারের পাঠক সংখ্যাও ছিল অনেক। দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টে আসার পর, বসনিয়া ও আলজেরিয়ার ওপর প্রতিবেদনের পর ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে রবার্ট দু’বার প্রেস অ্যাওয়ার্ড তালিকায় আন্তর্জাতিক রিপোর্টারের পুরস্কার জেতেন। ১৯৯৯ সালে পেয়েছেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ও অরওয়েল পুরস্কারও।
ইরান-ইরাক যুদ্ধে তিনি শাত-আল-আরবে ইরাকের ভারী কামানের আঘাতে কানে গুরুতর আঘাত পান। যার কারণে কানে শুনতে তার স্থায়ী সমস্যা হয়ে যায়। আমেরিকা ও তার মিত্ররা যখন আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ শুরু করে, রবার্টকে তখন সেই দ্বন্দ্ব নিয়ে নিউজ করার জন্য পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে রিপোর্ট করার সময়, মার্কিন বিমান বাহিনীর ভারী বোমা হামলা থেকে পালিয়ে আসা একদল আফগান শরণার্থী তাকে আক্রমণ ও মারধর করে। আশ্চর্যজনকভাবে এই আক্রমণ থেকে তাকে বাঁচায় একজন আফগান শরণার্থী। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময়, রবার্ট বাগদাদে ছিলেন। সরাসরি অসংখ্য রিপোর্ট তিনি করেছেন। হোটেলের রুম থেকে রিপোর্ট করায় অনেক সাংবাদিক তার কাজকে ‘হোটেল সাংবাদিকতা’ বলে সমালোচনা করেন। তিনি আরও সমালোচনা পেয়েছেন আইরিশ ‘সানডে ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-এর কলামনিস্ট ও সেনেটর ইওঘান হ্যারিস এবং ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর কলামনিস্ট সাইমন হগার্টের থেকেও।
ওসামা বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার
আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে ইন্টারভিউ সিরিজ করায় বিশ্বজুড়ে পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন রবার্ট ফিস্ক। ১৯৯৩ সালের ৬ ডিসেম্বর রবার্ট লাদেনের প্রথম সাক্ষাৎকার নেন। পরের সাক্ষাৎকারগুলো নেন ১৯৯৬ সালের ১০ জুলাই ও ১৯৯৭ সালের ২২ মার্চ। প্রথম সাক্ষাৎকারে রবার্ট লিখেছিলেন, ‘উঁচু গাল, সরু চোখ আর লম্বা বাদামি পোশাকে মুজাহিদ কিংবদন্তিদের মধ্যে লাদেনকে পর্বত যোদ্ধার মতোই দেখায়।’ সে সময় কোনো বক্তব্যে তিনি জিহাদি যোদ্ধা তৈরি করছেন এমন মন্তব্য ছিল না। প্রথম সাক্ষাৎকারের পর রবার্ট খেয়াল করলেন তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। লাদেন তাকে বলেছিলেন, ‘রবার্ট, আমাদের ভাইয়েরা স্বপ্নে দেখেছে আপনি একজন আধ্যাত্মিক মানুষ। এর মানে আপনি সত্যিকারের মুসলিম।’ রবার্ট তাকে বলেছিলেন, ‘আমি মুসলিম নই। আমি একজন সাংবাদিক যার কাজ হচ্ছে সত্যকে সামনে প্রকাশ করা।’ এর জবাবেও লাদেন বলেছিলেন, ‘আপনি যদি সত্য বলেও থাকেন, এর মানেই হচ্ছে আপনি একজন সত্যিকারের মুসলিম।’
১৯৯৬ সালে সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় লাদেন সৌদির রাজপরিবারের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৯৭ সালে যখন তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় তখন লাদেন বলেছিলেন, আমেরিকাকে নিজের ছায়ায় পরিণত করতে তিনি খোদার কাছে সাহায্য চান। সাক্ষাৎকার নেওয়ার কাজ যতদিন চলেছে, ততদিনে এফবিআইয়ের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় নাম লিখিয়েছেন লাদেন। ৯/১১ এর পেছনে যে মানুষটি দায়ী, সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে যে মানুষটি ছিলেন সব সময়, এমন একজন মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে পারার অর্থ লাদেনের প্রতি এই মানুষটি নিঃসন্দেহে ভিন্ন রকম একটি প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন।
লাদেনের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর রবার্টের ক্যারিয়ারে সফলতার নতুন মোড় আসে। সম্ভবত এর কারণ ছিল যে রবার্ট আসলে সঠিক ছিলেন। তিনি জানতেন লাদেন ছাড়াও আফগানিস্তান আর রাশিয়ার যুদ্ধ থেকে উঠে আসা আরও একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি নিজেও আমেরিকাকে পরাজিত করার কথা ভাবতেন। তবে তার নাম সেভাবে সামনে আসেনি কারণ ততদিনে লাদেনের নামই সবচেয়ে বেশি প্রচার হয়েছে আর তিনিই জীবননাশের হুমকি পেয়েছেন সবচেয়ে বেশি। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে রবার্ট যে লেখাগুলো লিখেছেন সেগুলো আমেরিকার নেতাদের পড়তে বলেছিলেন লাদেন। সাংবাদিকরা সব সময় মুখরোচক খবর চান, এর চেয়ে বড় মুখরোচক খবর আর কী হতে পারে তাদের জন্য? এক কথায়, বিশ্বজুড়ে এক্সক্লুসিভ সব তথ্যের খোঁজ ছিল রবার্টের কাছে।
ব্যক্তিত্ব
দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর সাংবাদিকরা ছাড়াও বিশ্বের যে কোনো স্থানের সাংবাদিকতার কথা বললে এক কথায় বলা যায়, রবার্ট ফিস্ক একজন নায়ক ছিলেন। কিছুটা জেদি আর একরোখা স্বভাবের ছিলেন তিনি। এসব কারণেই হোক অথবা সাংবাদিকতার সাহসের কারণেই হোক, রবার্টের বেশ কিছু শত্রুও তৈরি হয়েছিল। একজন রিপোর্টার হিসেবে তিনি যেমন ঘটনার সবটাই জানতেন, আবার একজন লেখক হিসেবে সেই ঘটনাকে মার্জিতভাবে উপস্থাপন করার ক্ষমতাও তার ছিল। কোনো বিষয়ে তার জানার আগ্রহ হলে সেটি নিয়ে যতটুকু সম্ভব জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করতেন তিনি। লিখতে গিয়ে যে বিষয়টিকে তার সঠিক মনে হয়েছে সেটি নিয়ে নিজের মন্তব্যেই অটল থেকেছেন। দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা তো বটেই, নিজেও একজন স্বাধীন সাংবাদিক ছিলেন রবার্ট ফিস্ক।
যে কোনো বিষয় নিয়ে রবার্টের দেখার নজর ছিল অন্যদের থেকে একদম আলাদা। পত্রিকায় হোক অথবা ডিনার টেবিল সবখানেই তার দেওয়া বক্তব্যে বিপুল তথ্য আর অন্তর্দৃষ্টি থাকত। অন্যের বিরোধী হলেও রবার্ট নিজের কথায় অটল থাকতেন সব সময়। ২০১১ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই নিউজ ইভেন্টকে একদম অবান্তর বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। সে সময় অন্য সব সাংবাদিকের কাছে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ খবর হলেও রবার্ট এটা মানতে পারেননি। বলেছিলেন, ‘লাদেন সেটাই করেছেন যা তিনি করতে চেয়েছেন। অন্যান্য নিউক্লিয়ার সায়েন্টিস্টদের মতো তিনিও বোমা উদ্ভাবন করেছেন।’
মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস আর সংস্কৃতির প্রতি রবার্টের ছিল অসাধারণ আগ্রহ। জীবনের অর্ধেক সময় তিনি কাটিয়েছেন লেবাননে। লিখেছেন ১৩৬৬ পৃষ্ঠার বই ‘দ্য গ্রেট ওয়ার ফর সিভিলাইজেশন’। খুব বেশি সাংবাদিক আরবি ভাষায় কথা বলতে না পারলেও তিনি বেশ ভালোভাবেই এই ভাষায় দক্ষতা এনেছিলেন।
রবার্ট সত্যিকারেই সাহসী মানুষ ছিলেন। আর এ কারণেই হয়তো বৈশ্বিক পরিচিতি তার কাছে ধরা দিয়েছিল। অনেক বড় বড় মহারথীদের সঙ্গে টেক্কা দিতেও তিনি পিছপা হননি। তিনি যখন দেখলেন ডেইলি এক্সপ্রেসের এডিটর রিপোর্টার হিসেবে তাকে সেই মর্যাদা দিচ্ছেন না যা তার প্রাপ্য, রবার্ট আর পেছনে ফিরে তাকাননি। চলে এসেছেন সেখান থেকে। একই ঘটনা ঘটেছিল দ্য টাইমসের ক্ষেত্রেও। তিনি বুঝতে পারছিলেন তার লেখা রিপোর্ট নিয়ে দ্য টাইমসের এডিটর হয়তো বিতর্ক সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন, আবার রুপার্ট মারডক যখন বিষয়টি নিয়ে লিখতে চাইলেন তখন তার সন্দেহ সত্যি হয়ে গেল। সে সময় সেই পত্রিকাও ছেড়ে চলে আসেন। এই পত্রিকার এডিটরদের তিনি সহায়ক হিসেবে পাননি। দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট তাকে কাজের সেই স্বাধীনতাটুকু দিয়েছিল যার কারণে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এতগুলো বছর তিনি রয়ে গিয়েছিলেন এখানেই। রবার্ট সব সময় নিজেকে শান্তিবাদী বলে প্রকাশ করতেন। এজন্য তিনি কখনো ভোট দিতেন না। তিনি বলতেন, ‘সাংবাদিকতায় সব সময় কর্র্তৃপক্ষ ও কর্র্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার শক্তি থাকতে হবে। বিশেষ করে যখন সরকার ও রাজনীতিবিদরা আমাদের যুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়।’
রবার্টের রিপোর্টিংয়ের ধারা অন্যদের থেকে একদম ভিন্ন ছিল। তার হাতে সব সময় একটি নোটবুক থাকত। সাংবাদিকতা জীবন নিয়ে এক কথায় রবার্ট বলে গেছেন, ‘যখন যে সূত্রই পাও না কেন তার পেছনেই তোমাকে ছুটতে হবে।’
