ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের মহামারী

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২০, ১২:২২ এএম

করোনা মহামারীর কালেও দেশে ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা কমেনি। এমনকি গত মাসে আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদন্ডের বিধান যুক্ত করা হলেও এখনো তার কোনো প্রভাব পড়তে দেখা যাচ্ছে না। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি আগের আইনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বদলে এখন ‘মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড’ করা হয়। সর্বশেষ এক পরিসংখ্যান বলছে সদ্য শেষ হওয়া অক্টোবর মাসেই সারা দেশে অন্ততপক্ষে ২১৬ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ৪৪টি। অর্থাৎ গত মাসে মোট ধর্ষণের প্রায় পাঁচভাগের একভাগই দলবদ্ধ ধর্ষণ। যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ বন্ধ করতে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন কঠোর থেকে কঠোরতর করা, বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করার পরও কেন এমন বর্বর অপরাধ রোধ করা যাচ্ছে না সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন খুবই জরুরি।    

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপপরিষদ তাদের কাছে সংরক্ষিত ১৩টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার অক্টোবর মাসে সারা দেশে ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও নানারকম যৌন নির্যাতনের পরিসংখ্যানভিত্তিক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, অক্টোবর মাসে শিশু নির্যাতন উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ১০১ কন্যাশিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। আর নারী ও কন্যাশিশু মিলিয়ে মোট ৪৩৬ জন এমন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২১৬ জন নারী ও কন্যাশিশু। এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৪ জন। দেশে যে শিশু ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটিও স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এই প্রতিবেদনে। কেননা দেখা যাচ্ছে অক্টোবর মাসে মোট ২১৬টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১০১টি শিশু! আবার ওই মাসে মোট ২১৬টি ধর্ষণের মধ্যে প্রায় পাঁচভাগের একভাগ বা ৪৪টি ঘটনাই দলবদ্ধ ধর্ষণের। এখানেও দেখা যাচ্ছে মোট ৪৪টি দলবদ্ধ ধর্ষণের মধ্যে ২৫টি ঘটনারই শিকার হয়েছে শিশুরা। প্রতিবেদনটিতে একইসঙ্গে দেখা যাচ্ছে ১২টি অপহরণের ঘটনার মধ্যে ৮ জন শিকারই শিশু। এছাড়া যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৮ জন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১৫ শিশুসহ ২১ জন। বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে ৫ শিশুসহ আত্মহত্যা করেছে ৬ জন।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। আগের বছর ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে দেশে ধর্ষণের ঘটনা দ্বিগুণ বেড়েছে। এই পরিসংখ্যান সমাজে যৌননিপীড়ন ও ধর্ষণসহ নারীর প্রতি নানারকম সহিংসতা বাড়তে থাকার মারাত্মক হার নির্দেশ করছে। লক্ষ করা দরকার, বিশ বছর আগে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে কঠোরতম শাস্তির বিধান রেখে ২০০০ সালে প্রণীত হয়েছিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন। এ আইনে দ্রুত সুবিচারের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু গত ২০ বছরে নারীর প্রতি সহিংসতা তো কমেইনি, বরং বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন বলছে, নানারকম নির্যাতনের ভয়াবহতা দিন দিন প্রকটতর হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন এর অন্যতম কারণ আইন প্রয়োগকারী কর্র্তৃপক্ষের গাফিলতি ও মামলার দীর্ঘসূত্রতা। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, এখনো দেশে ধর্ষণের মতো মারাত্মক অপরাধের মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির হার মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ।

মানবাধিকারকর্মী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন সমাজে ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দৃশ্যমান না থাকার বদলে একপ্রকার বিচারহীনতার সংস্কৃতিই দৃশ্যমান। তাই কেবল আইন ও কঠোর শাস্তির বিধান করলেই হবে না, বরং বিচারিক প্রক্রিয়া ও মামলার দীর্ঘসূত্রতা কীভাবে সহজ ও গতিশীল করা যায় সেই পথ খুঁজতে হবে। আর সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধ না কমার পেছনে অন্যতম কারণ নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির বদল না হওয়া। যে কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নারীর অগ্রগতি হলেও সমাজে নারীর সত্যিকার ক্ষমতায়ন ঘটেনি। পরিসংখ্যান বলছে, প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫০ দশমিক ৫৪ শতাংশই এখন নারী। অন্যদিকে বাংলাদেশে নারীর কর্মসংস্থান বিষয়ে ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০০৩ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানে নারীর অংশগ্রহণ ২৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু পুরুষের তুলনায় কর্মসংস্থানে নারীর অবস্থান এখনো অর্ধেক। এমতাবস্থায় দেশে ধর্ষণের মহামারী ঠেকাতে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নটিতে জোর দেওয়া জরুরি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত