করোনা সনদ পেয়েও ফ্লাইট মিস যাত্রীদের

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২০, ০১:৪৭ এএম

করোনা নেগেটিভ সনদ থাকার পরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায়ই বিদেশগামী যাত্রীরা তাদের পূর্বনির্ধারিত ফ্লাইট ধরতে ব্যর্থ হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিমানবন্দরটিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত কভিড হেলথ স্ক্রিনিং ডেস্ক এবং অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতির খেসারত ফ্লাইট মিসের মাধ্যমে দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। কভিড নেগেটিভ সনদ, টিকিট ও ভিসাসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও যথাসময়ে চেক-ইন করতে না পারায় বিমানে উঠতে পারছেন না অনেকেই। ফ্লাইট মিস করে এমন বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী যাত্রীর জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার তথ্য পেয়েছে দেশ রূপান্তর। তারা বিমানবন্দরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হাতে-পায়ে ধরে আহাজারি করেও কোনো প্রতিকার পাননি।

গত বৃহস্পতিবার সিলেট থেকে চিকিৎসার জন্য ভারতগামী একটি পরিবার সঠিক সময়ে পাসপোর্ট, ভিসা ও করোনা নেগেটিভ সনদসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র নিয়ে বিমানবন্দরে হাজিরের পরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ভুলে ইন্ডিগোর ফ্লাইট মিস করেন। এরপর দিনভর তারা হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রোগী নিয়ে দেনদরবার ও কান্নাকাটি করলেও সংশ্লিষ্ট কোনো মহল থেকেই ন্যূনতম সাড়া পাননি। এমনকি ইন্ডিগো কর্মীদের হাতে-পায়ে ধরেও মন গলাতে পারেনি এই পরিবার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত কভিড হেলথ স্ক্রিনিংয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও উদাসীনতার দরুন এই পরিবারকে চরম খেসারত দিতে হয়েছে। জরুরি চিকিৎসা বাদ রেখে বাধ্য হয়ে তাদের ফিরে যেতে হয়েছে বাড়িতে। এই দুর্ভোগের দায় কার সে প্রশ্ন তাদের।

জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সিলেট থেকে হুমায়ুন আহমেদ নামে ১৩ বছরের এক ব্রেইন টিউমারের রোগীকে নিয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন তার অভিভাবক মাকসুদ আহমেদ ও মনজুর আহমেদ। তারা তিনজনই সিলেটের সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে গত ২ নভেম্বর কভিড টেস্ট করান। নেগেটিভ সনদ নিয়েই তারা ইন্ডিগোর ফ্লাইটে দিল্লি যাওয়ার জন্য নির্ধারিত সময় দুপুর সোয়া ১২টায় বিমানবন্দরে হাজির হন। ফ্লাইট ছিল দুপুর আড়াইটায়। যথারীতি তারা ১নং রোতে চেক-ইন কাউন্টারে হাজির হন। পাসপোর্ট, ভিসা ও করোনা সনদ জমা দেন। কিন্তু তাদের জানানো হয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্ক্রিনিং টেস্টের ইনফরমেশন সিস্টেমে তাদের কভিড সনদের তারিখ লেখা ২ অক্টোবর। এ সনদ নিয়ে ফ্লাইটে ওঠা যাবে না। তারা তখন কর্মকর্তাদের বলেন, অক্টোবর নয়, নভেম্বরের ২ তারিখেই পরীক্ষা করানো হয়েছে। এ নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে চলে বাকবিতণ্ডা। এক পর্যায়ে তাদের পাঠানো হয় পাশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত কভিড হেলথ স্ক্রিনিং ডেস্কে। সেখানে গিয়েও তারা জোর দিয়েই নভেম্বরে পরীক্ষা করিয়েছেন বলে চ্যালেঞ্জ করেন। সত্যতা জানার জন্য সেখান থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা যোগাযোগ করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে। ভুক্তভোগী রোগীর অভিভাবক মাকসুদ আহমেদ বারবার চ্যালেঞ্জ করার পর স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সেটা ক্রস চেক করে দেখা যায়, কভিড সনদে উল্লেখ করা তারিখই সঠিক। কিন্তু তা ভুলবশত সার্ভারে ২ নভেম্বরের পরিবর্তে ২ অক্টোবর আপলোড দেওয়া হয়েছে। এটা যে তাদের ভুল সেটা বুঝতে পেরে তাৎক্ষণিক সংশোধন করে ২ নভেম্বর হিসেবে সিস্টেমে আপলোড করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মীরা। আর এই সংশোধনীর কাজেই কেটে যায় এক ঘণ্টার বেশি সময়। এরপর মাকসুদ আহমেদ কভিড সনদের সংশোধিত তথ্য নিয়ে ফের ইন্ডিগোর কাউন্টারে যান। কিন্তু তখন তাকে জানিয়ে দেওয়া হয় চেক-ইন করার সময় শেষ হয়ে গেছে । ইন্ডিগোর এমন আচরণে ১৩ বছর বয়সী রোগী নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন মাকসুদ। তিনি বিমানবন্দরেই চিৎকার-কান্নাকাটি করতে থাকেন। তখনো ফ্লাইট ছাড়ার এক ঘণ্টা সময় বাকি ছিল। এত সময় থাকার পরও কেন তাদের যেতে দেওয়া হবে না তার যৌক্তিক কারণ জানতে চান মাকসুদ। বার বার মিনতি করেও যখন ব্যর্থ, তখন ইন্ডিগোর এক কর্মীর হাতে-পায়ে ধরে রোগীর কথা বিবেচনার অনুরোধ জানান তিনি। এ সময় সেখানে ভিসতারা এয়ারলাইনসের উদ্বোধনী ফ্লাইটের অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহ করতে আসা সাংবাদিকদের সামনেই মাকসুদ কান্নাকাটি করতে থাকেন। কিন্তু এতকিছু পরও ইন্ডিগোর কর্মীদের বিন্দুমাত্র সহানুভূতি পায়নি অসহায় এই পরিবারটি। শেষ পর্যন্ত রোগী নিয়ে তাদের দিল্লির পরিবর্তে সিলেট ফিরে যেতে হয়েছে। যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাকসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভুল সব স্বাস্থ্য বিভাগের। কভিডসহ সব কাগজপত্র আমাদের ঠিক ছিল। বিমানবন্দরে ঢোকার সময় প্রথমে একটি গেট থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। পরে ১নং গেট দিয়ে ঢুকে চেক-ইন কাউন্টারে গিয়ে এই সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এর দায় নেবে কে? একদিকে আমার রোগী চিকিৎসাবঞ্চিত, অন্যদিকে ফের কভিড টেস্ট করে নতুন করে টিকিট কাটার যে জটিলতা, সেটার দায় নেবে কে? এগুলো দেখার কি কেউ নেই! স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এত অবহেলা উদাসীনতার খেসারত কেন আমাকে দিতে হবে?’

জানা গেছে, প্রায়ই মাকসুদের মতো এভাবে আরও অনেক যাত্রী শাহজালাল বিমানবন্দরে ভোগান্তির শিকার হয়ে ফ্লাইট মিস করছেন। এর আগে গত ২৮ অক্টোবর ঢাকা-দিল্লি রুটের ইউএস বাংলার ফ্লাইটে একই ধরনের জটিলতার কারণে ২২ যাত্রীকে কাউন্টার থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তারা কভিড টেস্ট করিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অনুমোদিত ১০টি বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে থেকে। কিন্তু এই ১০টি হাসপাতালের অনুমোদনসংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য বিমানবন্দরের হেল্থ ডেস্কে না থাকায় তাদের চেক-ইন করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে তারা বিমানবন্দরে হইচই শুরু করলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমানের বিষয়টি নজরে আসে। তিনি তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্য সচিবের সঙ্গে কথা বলে এই ভুলের দায় তাদের বলে উল্লেখ করেন। এরপর ওই যাত্রীদের কাউন্টারে রেখেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কভিডসংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করা হয়। পরে শেষ মুহূর্তে ওই যাত্রীদের চেক-ইন্ করার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীদের গাফিলতিতে যাত্রীদের ফ্লাইট মিসের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দায়িত্বরত স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে বহির্গমন যাত্রীদের জন্য ৬টি কভিড সনদ টেস্টের ডেস্ক রয়েছে। যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত সার্ভারের মাধ্যমে তারা এসব ক্রস চেক করি। কিন্তু প্রায়ই সিস্টেমের হালনাগাদ তথ্য না থাকায় এ ধরনের ফ্লাইট মিসের মতো ঘটনা ঘটছে। এর দায় সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে কর্মরত ব্যক্তিদের।’

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ এইচ এস তৌহিদুল আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কভিডসংক্রান্ত জটিলতা দেখভাল করার দায়িত্ব স্বাস্থ্য বিভাগের। তাদের ভুল বা গাফিলতির খেসারত যাত্রীকে দিতে হচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত