পিরোজপুরে ৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকার আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প

ড্রেজারে বালি ভরাট করে ট্রাক ভাড়ার বিল

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২০, ০২:০২ এএম

পিরোজপুর সদরে সরকারি একটি আবাসন প্রকল্পের জন্য বালি ভরাটসহ কিছু ভূমি উন্নয়নের কাজে ৪ কোটি ৫৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৫৭ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ১০ কিলোমিটার এলাকায় নদী না থাকায় বালি ভরাট করতে হবে ট্রাক দিয়ে। গণপূর্তের মূল্যতালিকা-২০১৮ অনুযায়ী প্রতি ঘনমিটার বালি ভরাট করতে খরচ হবে ৩০২ টাকা। সে হিসাবে প্রকল্পটিতে ৮১ হাজার ৩৯৪ ঘনমিটার বালি ভরাটের জন্য মোট খরচ দেখানো হয় ২ কোটি ৪৫ লাখ ৮১ হাজার ৮৭ টাকা। কিন্তু বাস্তবে প্রকল্পের পুরো বালি ভরাট করা হয়েছে এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা বলেশ্বরী নদী থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে গণপূর্তের মূল্যতালিকা-২০১৮ অনুযায়ী প্রতি ঘনমিটারের দর ১৯৫ টাকা। এ হিসাবে খরচ আসে ১ কোটি ৫৮ লাখ ৭১ হাজার ৮৯৪ টাকা। এখানে ৮৭ লাখ টাকার বেশি খরচ দেখানো হয়েছে। আবার বালি ভরাটে ৪ ফুট ঘনত্ব দেখিয়ে বিল করা হলেও বাস্তবে ৩ ফুটেরও কম ভরাট করা হয়েছে। সেখানেও কমপক্ষে ৬১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বেশি খরচ দেখানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ও দাপ্তরিক নথিপত্র পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

নথিপত্রে দেখা গেছে, বালি ভরাটের পর আবার রাস্তা নির্মাণের জন্য আরেক দফা ভরাটের জন্য খরচ দেখানো হয়েছে। এতে আরও ৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা খরচের কথা বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকার প্রকল্পের মধ্যে ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা খরচের অসত্য তথ্য দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের (জাগৃক) পিরোজপুর সদরের সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্পে। এ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাগৃকের খুলনা ডিভিশনের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মইনুল হক মোতাইদ (বর্তমানে চট্টগ্রামে কর্মরত), উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. অলিউল ইসলাম ও উপসহকারী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম। কাজটি বাস্তবায়ন করছেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান শেখ বাবলু এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার বাবুল শেখ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জাগৃকের খুলনা ডিভিশনের অধীনে সদর উপজেলায় সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্পের মাটি ভরাট, এইচ বি বি রোড, প্যালাসাইডিং, আর সি সি সারফেস ড্রেন নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এ কাজের মোট খরচ ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৫৮ লাখ ১৮ হাজার ৬৫৭ টাকা। এ বিষয়ে গত ৪ ফেব্রুয়ারি দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মইনুল হক মোতাইদ একটি প্রাক্কলন প্রস্তুত করেন। সেখানে তিনি বলেন, পিরোজপুর শহরের আশপাশে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বালু তুলে ভরাট করার কোনো সুযোগ নেই। তাই মাটি ভরাট করার জন্য ডিপিপিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ২০১৮-এর শিডিউল অব রেইট অনুযায়ী প্রতি ঘনমিটার দর ৩০২ টাকা।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বালি ভরাটের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের ২০১৮-এর শিডিউল অব রেইট অনুযায়ী প্রতি ঘনমিটার দর ৩০২ টাকা ধরা হলেও এক কিলোমিটার দূরের বলেশ্বরী নদী থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালি ভরাট করা হয়েছে। এক্ষেত্রে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ২০১৮-এর শিডিউল অব রেইট অনুযায়ী প্রতি ঘনমিটার দর ১৯৫ টাকা। এ প্রকল্পে মোট ৮১ হাজার ৩৯৪ দশমিক ৩৩ ঘনমিটার মাটি ভরাটের জন্য মোট খরচ দেখানো হয় ২ কোটি ৪৫ লাখ ৮১ হাজার ৮৭ টাকা। প্রকৃতপক্ষে ড্রেজারে সরকার নির্ধারিত মূল্যে বালি ভরাটের জন্য খরচ হওয়ার কথা ১ কোটি ৫৮ লাখ ৭১ হাজার ৮৯৪ টাকা। এখানে ৮৭ লাখ টাকার বেশি খরচ দেখানো হয়েছে। আবার বালি ভরাটে ৪ ফুট ঘনত্বের কথা বলা হলেও বাস্তবে ৩ ফুটেরও কম ভরাট করা হয়েছে। সেখানে ২০ হাজার ৩৪৮ ঘনমিটার বালি ভরাট না করে এর দর বাবদ দাম প্রায় ৬১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বেশি খরচ দেখানো হয়েছে। একইভাবে একটি ইটের রাস্তা নির্মাণের জন্য একবার বালি খননের কথা উল্লেখ করে সেখানে ৪ লাখ ৪০ হাজার ৪৫১ টাকা খরচের কথা বলা হয়েছে। একই স্থানে আবার বালি ভরাটের নামে ৮ লাখ ৫২ হাজার ৪৮১ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রকল্পের শুরুতে যেখানে বালি ভরাট করা হয়েছে সেখানে রাস্তা নির্মাণের সময় বালি কিছুটা খুঁড়ে ব্লক তৈরি করে ইট বসাতে পারে। সেখানে টাকা এত খরচ হওয়ার কথা না। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো একই স্থানে আবার রাস্তা নির্মাণের কথা বলে বালি ভরাটের নামে আরও ৮-৯ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। এসব প্রকল্পের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের ওপর নির্ভর করতে হয় সংশ্লিষ্টদের। তারা যদি মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রকল্পের প্রস্তাব দেয় সেক্ষেত্রে অনুমোদনকারী কর্র্তৃপক্ষের তেমন কিছুই করার থাকে না। এক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলী যোগসাজশে এ কাজটি করেছেন।

জানতে চাইলে জাগৃকের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. দেলওয়ার হায়দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিরোজপুরে আমাদের একটি প্রকল্পর কাজ চলছে। সেখানে পাওয়া অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা পাঠানো হবে। এরপর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

জাগৃকের সদস্য (প্রকৌশলী ও সমন্বয়) কাজী ওয়াসিফ আহমাদ বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ শুনেছি। তবে বিস্তারিত না জেনে মন্তব্য করতে পারব না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মইনুল হক মোতাইদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মোবাইল ফোনে কথা রেকর্ড হয়। তাই আমি কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। সরাসরি দেখা হলে কথা বলা যাবে।’ এরপর এ প্রকৌশলী ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান শেখ বাবলু এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার বাবুল শেখের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত