২০ বছরে স্মৃতি ঝাপসা হওয়ার কথা। আমার কিন্তু এখনো স্পষ্ট মনে পড়ছে ১০ নভেম্বরের সকাল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে এসেছিলেন। গ্যালারি রঙিন। সবার মধ্যে কেমন একটা উৎসবী মেজাজ। প্রথম টেস্টটা আমাদের কাছে ছিল উৎসব। ঠিক ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। ভেতরে ভেতরে শিহরণ টের পাচ্ছিলাম।
নাঈমুর রহমান দুর্জয় ভাই টস করতে যাওয়ার আগে ভাবছিলাম, দেশের হয়ে প্রথম টেস্টের প্রথম বলটা আমিই করব। কেউ কোনোদিন এই রেকর্ডটা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। টসে আমরা জিতেছিলাম। প্রথমে ব্যাট কারার সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম বলটা করার জন্য তাই আমাকে প্রায় দেড় দিনের বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
আমি যেমন টেস্টে প্রথম বলটা করার জন্য উদগ্রীব ছিলাম শাহরিয়ার হোসেন (বিদ্যুৎ) আর মেহরাব হোসেন অপিও তেমনি দেশের হয়ে প্রথম বল খেলার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে প্রথম বলটা খেলেছিল শাহরিয়ার। শুনেছি ও প্রথম টেস্টের জার্সি, টুপি সব সংরক্ষণ করেছে। ছেলেদের তা দেখিয়ে গর্বও করে। করারই কথা। আমার মতো ওরও প্রথম বল খেলার রেকর্ড কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
আমাদের ওপেনিং জুটি বেশিক্ষণ টেকেনি। জাহির খানের বলে সাবা করিমের হাতে ক্যাচ দিয়ে অপি (৪) আগে আউট হয়েছিল। এরপর সুনীল জোশির বলে আউট হন শাহরিয়ার (১২)। মাত্র ৪৪ রানে ২ উইকেট হারানোর পর আমরা কেউ ভাবিনি ৪০০ রান করতে পারব। মনে আছে অসুস্থতার কারণে (হেড কোচ) এডি বার্লো তখন দলের সঙ্গে নেই। অবশ্য না থেকেও তিনি ছিলেন। বোলার-ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে নিজের টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলেন। ‘টেস্ট ক্রিকেট ইজ ডিফারেন্ট বল গেম’ বলে আমাদের সাবধানও করেছিলেন। কিন্তু উপদেশ শুনে তো আর অভিজ্ঞতা হয় না। কোনো রকম ধারণা ছাড়াই খেলতে নেমে আমরা প্রথম ইনিংসে যা করেছিলাম এখনো অসাধারণ মনে হয়।
দুর্দান্ত খেলেছিলেন (হাবিবুল বাশার) সুমন আর (আমিনুল ইসলাম) বুলবুল ভাই। নেমেই জাভাগাল শ্রীনাথের বলে ব্যাট চালিয়ে একজন বেঁচে গিয়েছিলেন। বল যায় সিøপের ওপর দিয়ে। এরপর অজিত আগারকার এবং মুরালী কার্তিকের বলে সুমন ভাইয়ের খেলা দেখে মনে হয়েছিল উনি ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচ খেলছেন। লাঞ্চের সময় তিনি ৪৪ রানে অপরাজিত ছিলেন। পরে একাত্তর করে আউট হন। প্রথম দিন সম্ভবত সত্তরের ঘরে অপরাজিত ছিলেন বুলবুল ভাই। হোটেল লবিতে অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী তাকে বলেছিলেন, নতুন বল নেওয়ার আগেই যা পার রান করে নাও। পরে শ্রীনাথ-জাহিরদের খেলতে পারবে না।
দ্বিতীয় দিন লাঞ্চের আগেই সেঞ্চুরি করেছিলেন বুলবুল। লাঞ্চের সময় সাবের হোসেন চৌধুরী (তৎকালীন বিসিবি সভাপতি) তাকে চার্লস ব্যানারম্যানের রেকর্ড ভাঙার জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন (অভিষেক টেস্টে ১৬৯ করেছিলেন ব্যানারম্যান)। প্রথম ইনিংসে আমরা সবাই ভালো ব্যাটিং করেছিলাম। আমি ২৮ রানে অপরাজিত ছিলাম। সুনীল যোশীকে একটা ছক্কা মেরেছিলাম।
বল হাতেও বাংলাদেশের শুরুটা মন্দ হয়নি। তৃতীয় দিনের সকালে কয়েকটা উইকেট নিয়ে আমরা ভারতকে চাপেও ফেলেছিলাম। এক পর্যায়ে তাদের স্কোর ছিল ৫ উইকেটে ১৯০। এখান থেকে গাঙ্গুলী আর যোশি দলকে টানেন। আমি ১৯ ওভার বল করে উইকেট শূন্য ছিলাম। দ্বিতীয় ইনিংসে সদাগোপন রমেশকে বোল্ড করি। প্রথমদিকে শিব সুন্দর দাসও আমার বলে ক্যাচ দিয়েছিল। স্লিপে দাঁড়িয়ে শাহরিয়ার তা ধরতে পারেনি।
অনভিজ্ঞতার কারণে দ্বিতীয় ইনিংসে আমাদের ব্যাটিং বিপর্যয় হয়েছিল। একশোও করা সম্ভব হয়নি (৯১ রানে অল আউট)। ঐতিহাসিক টেস্ট ভারত জিতেছিল ৯ উইকেটে। ফলটা অপ্রত্যাশিতও ছিল না। তবে প্রথম ইনিংসে ভালো খেলার পর দ্রুত টেস্ট থেকে ছিটকে পড়ায় খারাপ লেগেছিল। মনে পড়ছে ভারতীয় হাইকমিশন সুন্দর একটা অনুষ্ঠানের অয়োজন করেছিল। দু’দলের ক্রিকেটাররা সেখানেই ভালোভাবে কথা বলার সুযোগ পায়। আমরা তখন উপদেশ নেওয়ার দলে। সৌরভ-শচিন-দ্রাবিড়দের সঙ্গে কথা বলে টেস্ট বোঝার চেষ্টা করেছিলাম। ছবিগুলো এত টাটকা যে, ১০ নভেম্বর তারিখটা ২০ বছর পেছনে ফেলে এসেছি মনে হচ্ছে না।
হাসিবুল হোসেন শান্ত : বাংলাদেশের আইসিসি ’৯৭ ট্রফি জয়, প্রথম বিশ্বকাপ ও প্রথম টেস্ট দলের সদস্য
