যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেতা জো বাইডেন। এবার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে একে একে নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের পদক্ষেপ নেবেন তিনি। গুরুত্বের ভিত্তিতে শুরুর দিকে কী কী করবেন ইতিমধ্যে তারও একটা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন তিনি। অবধারিতভাবেই তার এই পরিকল্পনায় সবার আগে আছে করোনাভাইরাস মোকাবিলা। এরপরে আছে অর্থনীতি, বর্ণবাদ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যু। এছাড়া ওবামা কেয়ার বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তহবিল বাতিলসহ বেশ কয়েকটি ইস্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া নীতিমালাগুলোর সংস্কারের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বিবিসি, সিএনএন, ওয়াশিংটন পোস্টসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, আজ সোমবার করোনা মোকাবিলায় ১২ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স ঘোষণার কথাও জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই প্রেসিডেন্ট। প্রাথমিকভাবে তা আগামী দুই মাসের জন্য হতে পারে। শপথ গ্রহণের পর এই টাস্কফোর্সকেই একটি স্থায়ী চেহারা দেওয়া হতে পারে।
গত রবিবার বাইডেন জানিয়েছেন, দেশের সেরা বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত হবে এই টাস্কফোর্স। এর প্রথম ও প্রধান কাজ হবে যুক্তরাষ্ট্রে করোনা সংক্রমণের লাগাম টেনে ধরা। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ; রোগীদের চিকিৎসার পরিকাঠামো নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রশাসনকে সে বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া। এ ছাড়া করোনার কার্যকর ভ্যাকসিন আসলে পরে তা কীভাবে দেওয়া হবে, এ নিয়েও সিদ্ধান্ত নেবে এই দলটি।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই করোনা নিয়ে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লাগাতার আক্রমণ করেছেন বাইডেন। বারবার অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্পের ভুল সিদ্ধান্তের জন্যই করোনা গোটা যুক্তরাষ্ট্রে এভাবে সংক্রমণ ছড়িয়েছে। ট্রাম্প যেভাবে বিজ্ঞানীদের অপমান করেছেন, পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন, তার তীব্র বিরোধিতা করেছেন বাইডেন। নির্বাচনী প্রচারের সময়ই বিজয়ী জো বাইডেন জানিয়ে দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে তার প্রথম কাজ হবে মার্কিন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি ও করোনার টাস্কফোর্স তৈরি করা।
বাইডেন জানিয়েছেন, বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর তৈরি হবে এই টাস্কফোর্স। টাস্কফোর্স মানুষের জন্য সহানুভূতির সঙ্গে কাজ করবে। সেই সঙ্গে মানুষ যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে নতুন টাস্কফোর্স সে সম্পর্কিত বেশকিছু নির্দেশ জারি করতে পারে।
এদিকে বাইডেন শিবির থেকে সংবাদমাধ্যমগুলোকে জানানো হয়েছে, করোনাভাইরাসের পরীক্ষা অনেক বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হবে এবং মার্কিন নাগরিকদের মাস্ক পরতে বলা হবে।
সিএনএন জানাচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া নীতিমালাগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব সংস্কার করবেন বাইডেন। ট্রাম্পের নেওয়া বেশকিছু বিতর্কিত নির্বাহী আদেশ, যার জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন দরকার হয় না, সেগুলোকে আগের অবস্থানে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন জো বাইডেন।
এর মধ্যে আছে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি। ২০১৫ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক পদক্ষেপ গ্রহণে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি গ্রহণ করা হয়। প্যারিস চুক্তিতে এই শতাব্দীতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৭ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এবার ভোটের দিনই তা কার্যকর হয়। কিন্তু বাইডেন ভোটের আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি নির্বাচিত হলে আবারও এই চুক্তিতে ফিরে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। করোনার মতো এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তার প্রশাসনের জন্য।
এছাড়া করোনা ইস্যুকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় তহবিল বন্ধ এবং তার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার যে সিদ্ধান্ত নেয় তারও পরিবর্তন করবেন বাইডেন। চলতি বছর মে মাসে ট্রাম্পের দেওয়া ওই ঘোষণা জুলাই মাসে কার্যকর হয়। তবে একটি আনুষ্ঠানিক উপায়ে ডব্লিউএইচও থেকে সরে যেতে আরও সময় দরকার ছিল। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে সংস্থাটিকে সর্বোচ্চ তহবিল সরবরাহ করে যুক্তরাষ্ট্র। গত বছর ডব্লিউএইচওর বার্ষিক বাজেটের প্রায় ১৫ শতাংশ বা চারশ মিলিয়ন ডলার দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
এছাড়া যে সাতটি দেশের নাগরিকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা প্রত্যাহার করা হবে। গত নির্বাচনে জিতে ক্ষমতা গ্রহণের পরই ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়া, ইরান, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া, সোমালিয়া ও সুদানের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ওপর নিষেধজ্ঞা জারি করেন। বাইডেন শিবির জানিয়েছে, ওই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে বাইডেন প্রশাসনের অন্যতম কাজ।
বাইডেন বর্ণভিত্তিক বৈষম্য উচ্ছেদকে তার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভিত হিসেবে তৈরি করতে চান। তিনি সরকারি তহবিল ব্যবহার করে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে বাসস্থান ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে চান। কৃষ্ণাঙ্গ, ল্যাটিনো ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পদের বৈষম্য দূর করতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাতে আরও জোরালোভাবে কাজ করে সেটিও নিশ্চিত করতে চান বাইডেন। পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর জন্যও কিছু পরিবর্তন পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশেষ করে কোনো অপরাধীকে আটক করার সময় কিছু শক্তি প্রদর্শনের পন্থার নীতিমালায় পরিবর্তন আনবেন তিনি। সে জন্য একটি কমিশন করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
করোনাভাইরাসের মহামারীর কারণে অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে তা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে নানা পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে বাইডেন শিবির। এর মধ্যে রয়েছে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই দ্বিগুণ কর্মসংস্থান তৈরি করতে চান তিনি। পাশাপাশি প্রচারের সময় বাইডেন শিক্ষার্থীদের ঋণ মওকুফ, অবসর ভাতা ভোগীদের সামাজিক সুরক্ষা চেক বৃদ্ধি এবং ছোট ব্যবসায়ের জন্য অর্থ সরবরাহ করার যে পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ছিলেন তারও কিছু কিছু বাস্তবায়ন শুরু করতে পারেন তিনি।
এছাড়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এখন যে ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ আয় বৈষম্য আছে তা কমাতে ধনীদের ওপর কর বাড়াতে পারেন। বাড়াতে পারেন করপোরেশনগুলোর কর হারও। যার ফলে এক দশকে ৩ ট্রিলিয়ন ডলার বেশি রাজস্ব আয় সম্ভব হবে, যা দিয়ে করোনার কারণে যে সরকারি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে তা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
চীনের সঙ্গে চলা বাণিজ্যযুদ্ধের পুরোপুরি অবসান না হলেও কিছু কিছু জায়গায় শিথিলতা আসতে পারে। যাতে করে রপ্তানি আয় বাড়ার একটা পথ তৈরি করতে পারেন বাইডেন।
ধারণা করা হচ্ছে, বাইডেন বারাক ওবামার সময়কার কিছু নীতিকে পুনর্বহাল করবেন। বিশেষ করে শিশু বয়সে যারা কোনো বৈধ কাগজ ছাড়া অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া।
জো বাইডেন তার বিজয়ী ভাষণেও আসছে দিনগুলোতে তার নীতিমালা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দিয়েছেন। আহ্বান জানিয়েছেন, ঐক্য, সহনশীলতা ও সহযোগিতার নতুন যুক্তরাষ্ট্র গঠনের।
সে সব করতে নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য এরই মধ্যে একটি ট্রানজিশন ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন জো বাইডেন। অবশ্য রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো ভোটের ফল মেনে নেননি। ঘোষণা দিয়েছেন আইননি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন তাতে খুব একটা লাভ হবে না বর্তমান প্রেসিডেন্টের। সময় মতোই নতুন প্রেসিডেন্টের হাতে দায়িত্ব বুঝিয়ে হোয়াইট হাউজ ছাড়তে হবে ট্রাম্পকে।
