চিকিৎসার নামে জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (সিনিয়র এএসপি) আনিসুল করিমকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় রাজধানীর আদাবরের মাইন্ড এইড সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড ডি-অ্যাডিকশন হাসপাতালের এক পরিচালকসহ প্রতিষ্ঠানটির ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাদের আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের জন্য ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করলে ঢাকার মহানগর হাকিম শহিদুল ইসলাম সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পিটুনিতে আনিসুল করিমের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা বাদী হয়ে গত সোমবার রাতে আদাবর থানায় হত্যা মামলা করেন।
এদিকে পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুলকে পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে পুলিশ। এছাড়া হাসপাতালটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ কোনো কাগজপত্র নেই উল্লেখ করে পুলিশ বলছে, তারা অবৈধভাবে মানসিক রোগের চিকিৎসার নামে বাণিজ্য চালিয়ে আসছিল।
একইভাবে আনিসুলের মৃত্যুকে ‘হত্যা’ বলছেন তার সহকর্মীসহ অনেক পুলিশ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। কর্মস্থল থেকে ছুটি নেওয়ার এক দিনের মাথায় এবং হাসপাতালে পৌঁছার কিছুক্ষণের মধ্যে হাসপাতাল কর্মচারীদের মারধরের বিষয়টি ভিডিও ফুটেজ থেকে নিশ্চিত হওয়ার পর সেই দাবি আরও জোরালো হচ্ছে। আনিসুল ‘হত্যায়’ জড়িতদের বিচার চেয়ে ফেইসবুকে বিভিন্ন পোস্ট ও কমেন্ট করেছেন তার সহকর্মীসহ অন্য পুলিশ সদস্যরা। একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা যদি হাসপাতালে গিয়ে মারধরের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কী অবস্থায় রয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা।
ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার জাকির হোসেন মজুমদার বলেছেন, ‘ভিডিওতে যা দেখা গেছে তারপর আর কোনোভাবেই বলার সুযোগ নেই এটি স্বাভাবিক মৃত্যু, এটি স্পষ্টতই হত্যাকান্ড। আমরা মর্মাহত এমন অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য। আমরা সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের কয়েকজন সার্জেন্ট বলেছেন, এভাবে তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আনিসুলের মৃত্যু হবে তা তাদের কাছে অকল্পনীয়। আর আনিসুল করিমের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বিএমপি কমিশনার মো. শাহাবুদ্দিন খানসহ পুরো মেট্রোপলিটন পুলিশ।
পুলিশের বাইরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও আনিসুল করিমের মৃত্যুর ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। তারা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুলকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর যাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে তারা হলেনহাসপাতালটির বিপণন ব্যবস্থাপক আরিফ মাহমুদ জয় (৩৫), সমন্বয়ক রেদোয়ান সাব্বির (২৩), প্রধান বাবুর্চি মাসুদ (৩৭), ফার্মাসিস্ট তানভীর হাসান (১৮), ওয়ার্ডবয় জোবায়ের হোসেন (১৯), তানিফ মোল্লা (২০), সজীব চৌধুরী (২০), অসীম চন্দ্র পাল (২৪), লিটন আহাম্মদ (১৮) ও সাইফুল ইসলাম পলাশ (৩৫)।
এছাড়া আনিসুল করিমকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় মাইন্ড এইড সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড ডি-অ্যাডিকশন হাসপাতালের পরিচালক নিয়াজ মোর্শেদকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ নিয়ে ঘটনার দুই দিনের মাথায় মোট ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মৃত্যুঞ্জয় দে সজল হাসপাতালের পরিচালক নিয়াজ মোর্শেদকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়ে গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মোর্শেদকে আদাবর থানা হাজতে রাখা হয়েছে। আগামীকাল (আজ বুধবার) রিমান্ড চেয়ে তাকে আদালতে হাজির করা হবে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগের এসআই মনিরুজ্জামান জানান, আনিসুল করিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ১০ আসামিকে গতকাল আদালতে হাজির করে ১০ দিন করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়। আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আনিসুলকে পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে হত্যা : গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশিদ বলেন, গত সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশে (বিএমপি) কর্মরত জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. আনিসুল করিমকে চিকিৎসার জন্য তার পরিবারের সদস্যরা আদাবরের মাইন্ড এইড সাইকিয়াস্ট্রি ডি-অ্যাডিকশন হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের বিপণন কর্মকর্তা আরিফ মাহমুদ জয় তাকে শৌচাগারে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে হাসপাতালের দোতলায় নিয়ে যান। তখন আনিসের বোন তার সঙ্গে যেতে চাইলে আরিফ ও হাসপাতালের সমন্বয়ক রেদোয়ান তাকে বাধা দেয় এবং কলাপসিবল গেট আটকে দেয়। এরপর আনুমানিক দুপুর ১২টায় আরিফ নিচে এসে আনিসুলের বোনকে উপরে যাওয়ার জন্য ডাক দেয়। বোনসহ পরিবারের লোকজন উপরে গিয়ে আনিসুল করিমকে একটি কক্ষের মেঝেতে নিস্তেজ অবস্থায় শুইয়ে রাখা অবস্থায় দেখতে পান। তখন তার চেতনা ছিল না। পরিবারের সদস্যরা এ সময় একটি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে আনিসুল করিমকে দ্রুত জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আনিসুলের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা বাদী হয়ে সোমবার রাতে আদাবর থানায় হত্যা মামলা করেন জানিয়ে ডিসি হারুন অর রশিদ বলেন, ‘মামলা হওয়ার পর আদাবর থানা পুলিশ হাসপাতালের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করে। এতে দেখা যায়, দুপুর পৌনে ১২টার দিকে গ্রেপ্তারকৃতরা আনিসুল করিমকে হাসপাতালের দোতলার একটি রুমে মারতে মারতে প্রবেশ করায়। তাকে রুমের ফ্লোরে জোরপূর্বক উপুড় করে ৩-৪ জন হাঁটু দিয়ে পিঠের ওপর চেপে বসে। কয়েকজন পিঠ মোড়া করে ওড়না জাতীয় কাপড় দিয়ে তার দুই হাত বাঁধে। কয়েকজন আসামি কনুই দিয়ে আনিসের ঘাড়ের পেছনে ও মাথায় আঘাত করে। ফলে মো. আনিসুল করিম জ্ঞান হারান।’
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে গ্রেপ্তারকৃতরা মারপিট করে পুলিশ কর্মকর্তা আনিসুলকে হত্যা করেছে। হাসপাতালটি পরিচালনার জন্য বৈধ কাগজপত্র ছিল না। এটা একটা ভুঁইফোঁড় হাসপাতাল। তারা অবৈধভাবে মানসিক রোগীর চিকিৎসার নামে বাণিজ্য করে আসছিল। এই হাসপাতালের সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। হাসপাতালটিতে কয়েকজন রোগী আছেন, তারা চলে গেলে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আদাবর থানা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাটি তদন্ত করছে। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
এদিকে চার বছরের এক পুত্র সন্তানের জনক আনিসুল করিমকে গতকাল সকালে গাজীপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা।
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের শোক : জ্যেষ্ঠ এএসপি আনিসুল করিমের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএ)। গতকাল গণমাধ্যমে সংগঠনটির পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আনিসুল করিমের মতো একজন মেধাবী কর্মকর্তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ভীষণ শোকাহত ও মর্মাহত। অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
আনিসুল করিমের বাবা ফাইজ্জুদ্দিন আহমেদ পুলিশের একজন সাবেক ওসি এবং মুক্তিযোদ্ধা। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে আনিসুল ছিলেন সবার ছোট। ৩১তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডার সদস্য আনিসুল করিম তার ব্যাচে প্রথম স্থান অধিকার করেন। মেধাবী এই কর্মকর্তা কর্মজীবনে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), র্যাব, পুলিশ সদর দপ্তর ও সর্বশেষ বিএমপিতে কর্মরত ছিলেন।
