পদোন্নতি ‘বঞ্চিত’ হয়ে ছিলেন হতাশাগ্রস্ত!

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২০, ০৪:০৮ এএম

চাকরি জীবনে যথাসময়ে পদোন্নতি না পাওয়া এবং বিভাগীয় মামলার কারণে হতাশা থেকে জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিম মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে তার ব্যাচমেটসহ ঘনিষ্ঠরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনে আনিসুলের তেমন কোনো সমস্যা ছিল না বলেও জানিয়েছেন তারা। মেধাবী এই পুলিশ কর্মকর্তা ৩১তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তিনি ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশে সহকারী সুপার হিসেবে যোগ দেন। তার ব্যাচমেটদের সবাই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। এমনকি ৩২ ব্যাচের সবাই এবং ৩৩ ব্যাচের অনেকেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। কিন্তু পদোন্নতি পাননি আনিসুল। গত সোমবার রাজধানীর আদাবরে মাইন্ড এইড সাইকিয়াট্রিক ডি এডিকশন হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মারধরে মারা যান আনিসুল করিম। সর্বশেষ তিনি বরিশাল মহানগর পুলিশের এপিসি ট্রাফিক (দক্ষিণ) বিভাগে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি বরিশালের মুলাদী সার্কেল, পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন শাখা, র‌্যাব সদর দপ্তর, ডিএমপি সদর দপ্তর ও নেত্রকোনা সদর সার্কেলে কর্মরত ছিলেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণরসায়ন বিভাগে এমএসসি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএস ডিগ্রি নেওয়া এই কর্মকর্তার জন্ম গাজীপুর সদরের বরদা ইউনিয়নের মুসলিমাবাদ রোডে। তার বাবার নাম ফাইজ উদ্দিন আহমেদ ও মার নাম রুবিয়া আফরোজ। তার স্ত্রীর নাম শারমিন সুলতানা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আনিসুলের একাধিক ব্যাচমেট জানান, পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনে আনিসুলের তেমন কোনো সমস্যার কথা তারা কখনো শোনেননি। পদোন্নতি না হওয়ায় তিনি হতাশাগ্রস্ত ছিলেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন অতিরিক্ত উপ-কমিশনার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আনিস ছিল আমার ব্যাচে সবচেয়ে মেধাবী। মাত্র ৭ বছর আগে তিনি মেধাতালিকায় প্রথম হয়ে পুলিশে যোগ দেন। কী এমন সমস্যা হয়ে গেছে যে তিনি মানসিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবেন বিষয়টি বোধগম্য নয়।’

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘চাকরিকালীন আনিসের বিরুদ্ধে একটি বিভাগীয় তদন্ত চলমান আছে। যার ফলে তিনি পদোন্নতি পাননি। এর থেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।’

আনিসুল করিমের ব্যাচমেট ও পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত সুপার মৃত্যঞ্জয় দে সজল বলেন, ‘আনিসকে কেন আদাবরের ওই অখ্যাত হাসপাতালটিতে নেওয়া হয়েছে সেটা বোধগম্য নয়।’

আনিসের ভাই রেজাউল করিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আনিস ছিল অত্যন্ত চাপা স্বভাবের। সে কারও সঙ্গে কোনো বিষয়ে আলোচনা করত না। সম্প্রতি তার ওজন অনেক বেড়ে গেছে। অর্থাৎ প্রায় ১০৭ কেজি ওজন হয়ে গেছে। ওজন কমানো ও প্রমোশন নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকায় সে মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ওজন বেড়ে যাওয়ায় তার হার্টে কিছুটা সমস্যা ছিল। এছাড়া রক্তচাপজনিত সমস্যাও ছিল।’

আদাবরের ওই হাসপাতালে কেন নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে রেজাউল বলেন, আনিসের বোন ও ভগ্নিপতি দুজনই চিকিৎসক এবং বিসিএস কর্মকর্তা। কয়েকদিন থেকে অংসলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকায় তারাই চিকিৎসার জন্য আনিসকে ওই হাসপাতালে নিয়ে যান।

স্ত্রীর সঙ্গে কোনো ধরনের দাম্পত্য কলহ ছিল কি না জানতে চাইলে আনিসের এক কৃষিবিদ চাচা বলেন, ‘না আনিসের স্ত্রীর সঙ্গে কোনো ধরনের সমস্যা বা দাম্পত্য কলহ ছিল না। তাদের সংসার মোটামুটি সুখের ছিল। তাদের একটি সন্তান আছে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আনিস সুখেই ছিল। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বরিশাল নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে একটি ফ্লাটে ভাড়া থাকত। কিন্তু কেন সে মানসিক হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে বিষয়টি জানা নেই।’

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আদাবরের ওই হাসপাতালটি পরিচালনার জন্য বৈধ কাগজপত্র ছিল না। সেটি একটা ভুঁইফোড় হাসপাতাল। তারা অবৈধভাবে মানসিক রোগীর চিকিৎসার নামে বাণিজ্য করে আসছিল। হাসপাতালটি বন্ধ করে করে দেওয়া হবে।’

বরিশালের শীতলাখোলায় ট্রাফিক বিভাগের কার্যালয়ে দ্বিতীয় তলায় বামের একটি কক্ষে বসতেন এএসপি আনিসুল করিম। সেই কক্ষে তার ব্যবহৃত টেলিফোন, চেয়ার, টেবিল নানা স্মারক সবই আছে আগের মতোই। গত শনিবার সবশেষ কর্মস্থলে এসেছিলেন তিনি। অফিস করেছেন। এরপর চিকিৎসার জন্য দশ দিনের ছুটিতে যান। একজন সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি ছিল তার। আনিসুলের অস্বাভাবিক মৃত্যুতে ভারী হয়ে আছে মেট্রোপলিটন ট্রাফিক বিভাগ কার্যালয়ের পরিবেশ।

বিএমপির ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আব্দুর রহিম বলেন, ‘সৎ ও নিষ্ঠাবান অফিসার ছিলেন এএসপি আনিসুল করিম। তার এমন মৃত্যু মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যাওয়ার আগের দিনও অফিস করেছিলেন। সুস্থ মানুষটিকে কেন এভাবে হত্যা করা হলো তা বুঝতে পারছি না।’

ট্রাফিক বিভাগের উপ-কমিশনার জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, ‘কর্মস্থলে সুস্থ এবং স্বাভাবিক ছিলেন আনিসুল। কর্মঠ এই পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। আনিসুলকে যে হত্যা করা হয়েছে তা সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট।’

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. শাহাবুদ্দিন খান বলেন, ‘আনিসুল করিমকে হত্যায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। ট্রাফিক বিভাগে তার মতো চৌকস পুলিশ কর্মকর্তার শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত