করোনা সংকটের সময় দেশের কভিড হাসপাতালগুলোর ৩৫ শতাংশে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির এক গবেষণা বলছে, করোনাকালে ৯৩টি ক্রয় বিল কারসাজির মাধ্যমে সরকারের ১২ কোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। সুরক্ষাসামগ্রী কিনতে চার-পাঁচগুণ দাম বাড়িয়ে ৫০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বরাদ্দ নেওয়া হয়। অথচ ওই সুরক্ষাসামগ্রী মাত্র ১২ কোটি টাকায় কেনা হয়েছে। এছাড়া নমুনা সংগ্রহ-পরীক্ষা ও ত্রাণ বিতরণের বড় ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে টিআইবি। গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘করোনাভাইরাস সংকট মোকাবিলায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ’ (দ্বিতীয় পর্ব) শীর্ষক গবেষণায় এসব কথা বলা হয়েছে।
অনলাইন ও টেলিফোন জরিপের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, ত্রাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণা করা হয়েছে। দেশের ৪৭টি জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন টিআইবির গবেষকরা। এতে বলা হয়েছে, করোনাকালে বিদ্যমান আইন অনুসরণের ঘাটতি দেখা গেছে। এ সংক্রান্ত দুটি আইন যথাযথভাবে মানা হয়নি। এছাড়া করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পসহ বিভিন্ন জিনিস ক্রয়ে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০০৮ অনুসরণের ক্ষেত্রেও ঘাটতি লক্ষ করা যায়।
সরকারি ক্রয়ে দুর্নীতি
টিআইবির প্রতিবেদন বলছে, জরুরি পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ লঙ্ঘন করে বিভিন্ন প্রকল্পে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি ব্যবহার করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অনেক ক্ষেত্রে মৌখিক আদেশে ক্রয় করা হয়েছে। কোনো ক্রয়ে ই-জিপি ব্যবহার করা হয়নি। কয়েকটি সিন্ডিকেট স্বাস্থ্য খাতের সব ধরনের ক্রয় নিয়ন্ত্রণ করেছে। এসব সিন্ডিকেটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিএমএসডি, বিভিন্ন হাসপাতালের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ দুদকের কিছু কর্মকর্তার সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও পাওয়া যায়। মাস্ক, গ্লাভস ও পিপিইর মতো জরুরি স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নামসর্বস্ব যে প্রতিষ্ঠানকে ৩২ কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয় তা একটি অটোমোবাইল কোম্পানি (গাড়ি ব্যবসায়ী)।
একই প্রকল্পের অধীন অন্য একটি ক্রয়ে সুরক্ষাসামগ্রী পোশাক ক্রয়ের জন্য ৫০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা প্রকল্প বাজেট বরাদ্দ করা হয়। প্রতিটি পোশাক বাজারমূল্যের চেয়ে চার-পাঁচগুণ বাড়িয়ে বরাদ্দ রাখা হয়। ঢাকার একটি কভিড-ডেডিকেটেড হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ক্রয় কমিটিকে অবহিত না করে হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক নিজের শ্যালক ও ভাগ্নের একটি নামসর্বস্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেন। স্টোরে মালামাল জমা দেওয়ার আগেই বিল পরিশোধ করে দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তা আর সরবরাহ করা হয়নি। করোনার সময়ে এ ধরনের ৯৩টি ক্রয়ে বিল কারসাজির মাধ্যমে ১২ কোটি ১০ লাখ ৬৫ হাজার ৯০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি প্রকল্পের অধীনে ৮৩টি হাসপাতালে লিকুইড অক্সিজেন ট্যাংক বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২৩টি হাসপাতালে অক্সিজেন ট্যাংক সরাসরি ক্রয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পিপিআরের বিভিন্ন বিধি লঙ্ঘন করে সরাসরি ক্রয়ের ক্ষেত্রে একজনের কাছ থেকে দর প্রস্তাব আহ্বান করা হয়, কেন্দ্রীয়ভাবে দর যাচাই কমিটি গঠন করা হয়নি এবং যান্ত্রিক বিষয়গুলো দেখভালের জন্য বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের নিয়ে কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। দুর্নীতির কারণে এসব হাসপাতালে ট্যাংক স্থাপনে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১৬৬ কোটি টাকা।
নমুনা পরীক্ষায় দুর্নীতি
টিআইবির গবেষণায় দেখা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অনুমোদিত একটি প্রতিষ্ঠান ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা ছাড়াই ১৫ হাজার ৪৬০ জনকে ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে। এখনো ৩৪.৪ শতাংশ সেবাগ্রহীতাকে তিন বা ততোধিক দিন করোনার প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। জরিপে অংশ নেওয়া সেবাগ্রহীতাদের ৯.৯ শতাংশ নমুনা পরীক্ষায় ভুল প্রতিবেদন পেয়েছেন। যথাসময়ে প্রতিবেদন না পাওয়ায় অনেক প্রবাসীর কর্মক্ষেত্রে ফেরায় ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, অনেক কষ্টে জোগাড় করা ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়। এছাড়া কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া প্রতিবেদন নিয়ে ভ্রমণ করায় ছয়-সাতটি দেশে বাংলাদেশিদের গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং যাত্রীদের ফেরত পাঠানো হয়। অনেক দেশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হতে প্রাপ্ত সনদ গ্রহণ করেনি।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনিয়ম-দুর্নীতি
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগদ সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে জরিপে অংশ নেওয়া ৫৬ শতাংশ উপকারভোগী দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। সুবিধা পাওয়ার জন্য গড়ে ২২০ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। তালিকায় নাম থাকার পরও ৬৯ শতাংশ ব্যক্তি এখনো নগদ সহায়তা পাননি। জরিপে ওএমএস (চাল) সহায়তা উপকারভোগীদের ১৫ শতাংশ দুর্নীতির শিকার হন। টিআইবি জানিয়েছে, নগদ ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচিতে ৭৯ শতাংশ সংসদ সদস্য, মেয়র, ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বার ও কাউন্সিলর জড়িত ছিল। ৪৮ শতাংশ ছিল স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা। করোনাকালে যেসব জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে, তাদের ৯০ জনই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত।
এছাড়া হাসপাতালে মানসম্মত সুরক্ষাসামগ্রীর ঘাটতি, হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতার ঘাটতি, অকার্যকর কমিটি, জবাবদিহিতার অভাব, মতপ্রকাশে বিধিনিষেধ, পরীক্ষাগারে সক্ষমতার ঘাটতি, স্বচ্ছতার অভাব, প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে বিতরণে বড় ধরনের অনিয়ম ও বৈষম্য পেয়েছে টিআইবি। এ পরিস্থিতি উত্তরণে ১৫টি সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
