ক্যানসার হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপনে তিন কর্মকর্তার অবহেলা

৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২০, ০৪:২৫ এএম

জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিআরএইচ) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) জন্য কেনা উচ্চমাত্রাসম্পন্ন কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস যন্ত্র (ভেন্টিলেটর) স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহারে অবহেলায় হাসপাতালের সাবেক ও বর্তমান তিন কর্মকর্তাকে ৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ সংক্রান্ত রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেয়। হাসপাতালের কর্মকর্তা এ এম এম শরিফুল আলম (অবসরে), মোল্লা ওবায়দুল্লাহ (অবসরে) ও আইসিইউতে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা মানস কুমার বসুকে ক্ষতিপূরণের এ অর্থ দিতে হবে। আর ক্ষতিপূরণের এ অর্থ হাসপাতালের উন্নয়ন তহবিলে জমা করতে স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে তাদের কাছ থেকে পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি (পিডিআর) অ্যাক্ট অনুযায়ী টাকা আদায় করতে বলা হয়েছে।

রায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হাইকোর্ট বলেছে, ‘দেশের একমাত্র ক্যানসার রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং হাসপাতালে চরম অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কর্তব্যে অবহেলা শুধুমাত্র দুঃখজনকই নয়, তা নিন্দনীয় ও উদ্বেগের বিষয়।’ এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় অর্থ যথাযথভাবে ব্যয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চিকিৎসাসামগ্রী কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়মনীতি অনুসরণ করারও নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

রায়ে বলা হয়, ক্যানসার ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক মোয়াররফ হোসেনের দাবি অনুযায়ী ২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বর ও ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই পাঠানো দুটি চিঠির মাধ্যমে ন্যাশনাল ইলেকট্রো মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারকে (নিমিউ অ্যান্ড টিসি) ভেন্টিলেটরগুলো সচল করার  অনুরোধ করেন। তবে এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী নিমিউ কোনো চিঠি পায়নি। ফলে মোয়াররফ হোসেন নিমিউকে আদৌ চিঠি দিয়েছিলেন কি-না, সে বিষয়টির অধিকতর তদন্ত করতে আদেশ পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ক্যানসার ইনস্টিটিউটের উচ্চপদস্থ তিন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করতে বলেছে হাইকোর্ট। তদন্তে মোয়াররফ হোসেনের দাবির পক্ষে প্রমাণ না পেলে তার কাছ থেকেও ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করতে বলা হয়েছে।

ক্যানসার ইনস্টিটিউটের আইসিইউ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন নজরে আনা হলে গত ২ জানুয়ারি ওই হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে রুল জারি করে হাইকোর্টের একই বেঞ্চ। একই সঙ্গে রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সদ্য অবসরে (এলপিআর) যাওয়া হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোয়াররফ হোসেনের অবসরকালীন সুবিধা স্থগিতের নির্দেশ দেয় আদালত। রায়ে তার অবসরকালীন আর্থিক সুবিধা স্থগিতের আদেশটি প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এদিকে হাসপাতালের চিকিৎসাসামগ্রী কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণে বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছে হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দেশের সব সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণে কিছু নিয়মনীতি অনুসরণ করতে হবে। চিকিৎসার জন্য যন্ত্রপাতি, চিকিৎসাসামগ্রী বা ওষুধ কেনার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ কমিটি দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চাহিদা নিরূপণ করে সরকারি ক্রয় বিধিমালা অনুসরণ করে কেনাকাটা করতে হবে।

এ ছাড়া চাহিদাসম্পন্ন যন্ত্রপাতি স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো/ইমারত নির্মাণ প্রয়োজন কি-না তা নিরূপণ করা, সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক উপযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, প্রাক্কলন নির্ধারণে সঠিক ও বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ করা, ঠিকাদারের কাছ থেকে যন্ত্রপাতি গ্রহণ বা বুঝে নেওয়ার আগে সরবরাহকৃত পণ্যের মান ও গুণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া, প্রতিটি হাসপাতালে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করার কথা বলা হয়েছে হাইকোর্টের রায়ে। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি-অনিয়ম রোধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সুপারিশের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রায়ে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত