এনজো ফ্রান্সেসকোলি : ফুটবলের এল প্রিন্সেপে

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২০, ১১:১৩ পিএম

যেমন অভিজাত চেহারা, তেমন ফুটবল স্কিল। লোকে তাই এনজো ফ্রান্সেসকোলিকে ডাকত ‘এল প্রিন্সিপে’ নামে। ঘটনা হলো ফুটবলের ‘দ্য প্রিন্স’ ছিলেন জিনেদিন জিদানের শৈশব হিরো। ফরাসি ফুটবলের কিংবদন্তি ফ্রান্সেসকোলিকে ‘ফুটবল ঈশ্বর’ বলতেন। শুধু কি তাই, বিশ্বকাপ জেতার পরেও জিদান অকপটে বলেছেন, ‘তার ব্যাপারে এতই মুগ্ধ ছিলাম যে, মাঠে চলাফেরাও নকল করতাম, তিনি যা করতেন আমিও তাই করতাম। এনজোর মতো খেলতে যা করা দরকার সবই করেছি।’

শৈশবের মুগ্ধতার কারণেই জিদান বড় ছেলের নাম রেখেছিলেন এনজো। ছিয়ানব্বইয়ে জিদান খেলতেন জুভেন্তাসে। উরুগুয়ের যুবরাজ তখন রিভাল প্লেটে খেলেন। ইন্টার কন্টিনেন্টাল কাপে তাদের দেখা হয়। ফ্রান্সেসকোলি প্রথম দেখার স্মৃতিচারণ করে পরে বলেছিলেন, ‘এত বড় তারকা যখন এসে বলে, প্রতি বিকেলেই সে আমাকে দেখতে যেতো...আমি কী করতাম, কী বলতাম, কীভাবে খেলতাম সব...আর তা মিলেও যায়...তখন অবাক না হয়ে পারি না। জিদানের স্ত্রীর কাছে শুনেছি, ঘরেও নাকি মাঝে মধ্যে আমার জার্সি গায়ে ঘুমিয়ে পরত। ফুটবলাররা একটু পাগলই হয়।’ রিভার প্লেটের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে নিজের ৯ নম্বর জার্সি জিদানকে উপহার দেন ফ্রান্সেসকোলি। যা নিয়ে আজীবন গর্ব করেছেন ফরাসি কিংবদন্তি।

ফর্মের চূড়ায় থেকে ১৯৮৬’র বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছিলেন ফ্রান্সেসকোলি। তেমন কিছু করতে পারেননি। অথবা সামান্য কিছু করলেও লোকে তা মনে রাখেনি। কারণ মেক্সিকো বিশ্বকাপে অলৌকিক ফুটবল খেলে ১৯৮৬ সালটা নিজের করে নিয়েছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। উরুগুয়ে প্রথম রাউন্ডেই ডেনমার্কের কাছে ১-৬ গোলে হেরে যায়। দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠলেও আর্জেন্টিনার বাধা টপকাতে পারেনি। ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল। সেই বিশ্বকাপে ডেনমার্কের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে একমাত্র গোলটি করেছিলেন ফ্রান্সেসকোলি। সফল হতে না পারার কারণ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তখন পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। বাজে ট্যাকেলকে প্রশ্রয় দেওয়া হতো। স্পেন বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গেও একই ব্যাপার ঘটেছিল। আমি বিশ্বকাপ খেলতে গিয়েছিলাম বিশাল প্রত্যাশা নিয়ে। তুখর ফর্মেও ছিলাম। দল তাড়াতাড়ি বিদায় নেওয়ায় খুব হতাশ হই।’ ১৯৯০ বিশ্বকাপেও উরুগুয়ের অধিনায়ক ছিলেন ফ্রান্সেসকোলি। শেষ ১৬ থেকে বিদায় নেওয়ার পর বলেছিলেন, ‘খাতায় কলমে শক্তিশালী হলেই হয় না। বিশ্বকাপে সফল হতে আরও কিছু লাগে। ফুটবল দক্ষতা গোলে রূপান্তরিত করা কঠিন।’

১৯৬১ সালের ১২ নভেম্বর উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে জন্মেছিলেন ফ্রান্সেসকোলি। দুটি বিশ্বকাপ খেলে সফল হতে না পারলেও কোপা আমেরিকায় নিজের ফুটবল প্রতিভার ছাপ রেখেছেন। উরুগুয়েকে তিনবার শিরোপা জিতিয়েছেন (১৯৮৩, ৮৭, ৯৫)। ১৯৮১ সালে দক্ষিণ আমেরিকার যুব চ্যাম্পিয়শিপে উরুগুয়েকে সেরা করেছিলেন। দেশের হয়ে ৭৩ ম্যাচে ১৭ গোল করেছেন। দুটি বিশ্বকাপে ৮ ম্যাচ খেলে করেছেন একটি মাত্র গোল। ফ্রান্সেসকোলি লম্বা সময় সৌরভ ছড়িয়েছেন ক্লাব ফুটবলেও। নব্বইতে তিনি অলিম্পিক মার্শেইকে ফার্স্ট ডিভিশনের শিরোপা জেতান। রিভারপ্লেটকে ৪ বার প্রথম বিভাগে চ্যাম্পিয়ন করেন। তার পায়ের ছোঁয়াতেই আর্জেন্টাইন ক্লাবটি ৯৬ ও ৯৭-এ কোপা লিবার্তেদোরেস আর সুপার কোপা জিতেছিল। এরপর বুট জোড়া তুলে রাখার সময় ফ্রান্সেসকোলি বলেছিলেন, ‘পেশাদার ফুটবল শুরুর সময়ে যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও অনেক বেশি পেয়েছি। দুটি বিশ্বকাপ খেলেছি। যদিও বার্সেলোনা কিংবা জুভেন্তাসের মতো ক্লাবে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে ফুটবল আমাকে যা দিয়েছে তাতে সামান্য এই অপ্রাপ্তি নিয়ে আফসোস করা ঠিক হবে না। ফুটবল অনেক বন্ধু দিয়েছে। যেখানে খুশি যাওয়ার অধিকার দিয়েছে।’

ফুটবল ছাড়ার পর ফ্রান্সেসকোলি থাকতেন আর্জেন্টিনায়। এখন থাকেন মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের মিয়ামিতে। সেখানেই গোল টিভি নামে একটা ফুটবল চ্যানেল খুলেছেন ২০০৩ সাল থেকে, যার সিইও হিসেবে তিনি দারুণ সফল। ক্যামেরার সামনে ফুটবল নিয়ে কথা বলেও দিনের অনেকটা সময় কাটে তার। ফ্রান্সেসকোলির দুই ছেলের একজন হতে চায় পাইলট। অন্যজন ফুটবলার। যদিও ‘এল প্রিন্সিপে’ তাদের বলেছেন, ‘ছেলেরা শোনো, যাই করো নিজের মতো হও।’

এটাই ফ্রান্সেসকোলির জীবন দর্শন। ফুটবল মাঠে ও মাঠের বাইরে তিনিও ছিলেন নিজের মতো। তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছে অনেকেই। তার মতো হতেও চেয়েছে। অপার্থিব চেহারা আর ফুটবল প্রতিভা নিয়ে তিনি কোনো দিন কারও মতো হতে চাননি। এখানেই তার জিত!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত