এএসপি আনিসকে ‘পিটিয়ে হত্যা’

মাইন্ড এইডের ৪ মালিককে খুঁজছে পুলিশ

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২০, ০২:০৯ এএম

রাজধানীর আদাবরে মাইন্ড এইড সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড ডি-অ্যাডিকশন হাসপাতালে জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (সিনিয়র এএসপি) আনিসুল করিমকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় হাসপাতালটির চার অংশীদারকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তারা হলেন মো. আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. সাখাওয়াত হোসেন, সাজ্জাদ আমিন ও মো. ফাতেমা খাতুন। তাদের গ্রেপ্তারে একাধিক দল কাজ করছে বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

এদিকে এএসপি আনিসুল করিমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। আর আনিসুলের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার অভিযোগপত্র দ্রুতই দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশীদ।

মানসিক অসুস্থতা নিয়ে চিকিৎসার জন্য মাইন্ড এইড সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড ডি-অ্যাডিকশন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আনিসুল করিমকে গত সোমবার দুপুরে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ইতিমধ্যেই হাসপাতালটির দুই মালিককে (পরিচালক) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে হাসপাতালের পরিচালক ও বিপণন ব্যবস্থাপক আরিফ মাহমুদ জয় সাত দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। আর গত মঙ্গলবার গ্রেপ্তার করা হলেও অসুস্থতার কারণে রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন হাসপাতালটির আরেক পরিচালক নিয়াজ মোর্শেদ।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মৃত্যুঞ্জয় দে সজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার পরেই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া হাসপাতালের মালিক ও মার্কেটিং ম্যানেজার জয়সহ ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা সবাই সাত দিন করে পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন। আর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল থেকে আরেক মালিক নিয়াজ মোর্শেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি প্যারালাইজড হওয়াই ওই হাসপাতালেই তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে আদালতে আবেদন করা হয়েছে।’

এ পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘নিহত আনিসুল করিমের বাবা ফাইজ উদ্দিন আহমেদের করা মামলার এজাহারনামীয় ১৫ আসামির মধ্যে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য চার আসামির মধ্যে হাসপাতালের চার অংশীদার (মালিক) এখনো পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

জড়িতদের কাউকেই ছাড়া হবে না : এএসপি আনিসুল করিমকে ‘পিটিয়ে হত্যার’ ঘটনায় জড়িতদের কাউকে ছাড়া হবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। গতকাল সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িতদের কাউকে ছাড়া হবে না। আমরা যতটুকু জেনেছি, চিকিৎসার জন্য জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিমকে মানসিক হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন তার বোন। সেখান থেকে কোনো একপর্যায়ে তাকে মাইন্ড এইড হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে যাওয়ার পর আমরা একটা ভিডিওতে দেখলাম তাকে নিয়ে ধস্তাধস্তি করা হচ্ছে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তিনি মারা যান বলে হৃদরোগ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।’

এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘এ ঘটনায় তদন্ত চলছে। আমরা এখনো তদন্ত রিপোর্টটা পাইনি। সেটি পেলে জানাতে পারব, ঘটনাটা কী ঘটেছে। নিহতের বাবা এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা করেছেন আদাবর থানায়। ওই হাসপাতাল পরিচালনার সঙ্গে জড়িত তিনজনসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। নিশ্চয়ই একটি তদন্ত রিপোর্ট হবে। তখন আমরা আরও বিস্তারিত জানতে পারব। তদন্ত শেষে এ ঘটনায় আরও যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করা হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি এখন পর্যন্ত যা শুনেছি, যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ মানসিক হাসপাতালের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। যেসব হাসপাতালের অনুমোদন নেই, অনিয়ম হচ্ছে সেগুলোর বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে তাদের সঙ্গে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

দ্রুতই দেওয়া হবে অভিযোগপত্র : গতকাল দুপুরে নিহত আনিসুল করিমের গাজীপুরের বাসায় যান ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশীদ। তিনি সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আনিসুল করিমের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি অভিযোগপত্র দ্রুত সময়ের মধ্যে দেওয়া হবে।’ এ সময় তিনি নিহতের পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানান। গাজীপুর জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

গাজীপুরে বিচার দাবিতে মানববন্ধন : হাসপাতাল কর্মচারীদের মারধরে নিহত আনিসুল করিমের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে গতকালও পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ সহপাঠী, বন্ধুবান্ধব ও স্বজনরা তার গাজীপুরের বাসায় ভিড় জমান। এছাড়া আনিসুল হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের বিচার দাবিতে এদিন মানববন্ধন কর্মসূচি হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় নিহতের স্ত্রী, বাবা ও ভাইবোনসহ স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় আনিসুল হত্যার সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আইজিপির হস্তক্ষেপ কামনা করেন তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাইজ উদ্দিন আহমেদ ও বড় ভাই রেজাউল করিম সবুজ। পাশাপাশি স্ত্রী-সন্তানসহ আনিসুলের পরিবারের পাশে থাকার জন্য অনুরোধ জানান তারা। সেখানে বাবা ও বড় ভাই ছাড়াও আনিসুলের বোন শামসুন্নাহার সুমন ও ডা. উম্মে সালমা এবং স্ত্রী শারমিন সুলতানাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে আনিসুল হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও অপরাধীদের বিচার দাবিতে গতকাল সকালে তার বাসার পার্শ্ববর্তী হাড়িনাল সড়কে এবং জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে আলাদা মানববন্ধন কর্মসূচি হয়। এছাড়া এদিন সকালে গাজীপুর শহরে আনিসুলের সহপাঠী, বন্ধুবান্ধব ও এলাকাবাসী মানববন্ধন করেন।

আনিসুল করিমের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় বলা হয়েছে, তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গত সোমবার দুপুরের দিকে চিকিৎসার জন্য তাকে মাইন্ড এইড হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালটিতে ভর্তির কিছুক্ষণ পরই কর্মচারীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও মারধরে তার মৃত্যু হয়। গত মঙ্গলবার পুলিশ অনুমোদনবিহীন ওই হাসপাতালটি বন্ধ ঘোষণা করে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। আনিসুল করিমের মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ক্ষোভ জানিয়ে বলেছে, তারা উচ্চপর্যায়ের কমিটি করে ঘটনাটি মনিটরিং করছে।

আনিসুল করিম ৩১তম বিসিএসে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ৩৩ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন তিনি। এক সন্তানের জনক আনিসুলের বাড়ি গাজীপুরে। সর্বশেষ তিনি বরিশাল মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের সহকারী কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন। এ পুলিশ কর্মকর্তা ৩১তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তিনি ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশে সহকারী সুপার হিসেবে যোগ দেন। ‘পদোন্নতি বঞ্চিত’ হওয়া, বিভাগীয় তদন্ত ও অতিরিক্ত ওজনজনিত কারণে তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত