নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য তৈমূর আলম খন্দকারের বিরুদ্ধে বেরিয়ে আসছে আরও অপকর্ম ও অনিয়ম। অভিযোগ রয়েছে, ২০০৩ সালে তার ছোট ভাই সাব্বির আলম খন্দকার হত্যা মামলা নিয়ে তিনি ব্যবসা করেছেন।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, মামলার বাদী হয়েও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মামলা থেকে সরে দাঁড়ান তৈমূর আলম। তিনি দাখিল করা চার্জশিটের বিরুদ্ধে ছয় বছর টানা নারাজি পিটিশন প্রত্যাহার করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সাব্বির হত্যা মামলার প্রধান আসামি তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপিদলীয় এমপি গিয়াসউদ্দিনকে বাঁচানো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই সময় সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তৈমূরের পক্ষে গিয়াসউদ্দিন সর্বাত্মক কাজ করবেন এমন শর্তে আপন ভাইয়ের হত্যা মামলায় নারাজি পিটিশন প্রত্যাহার করে নেন তৈমূর। ওই সময় জনমনে কানাঘুষা ছিল সিটি নির্বাচনে কোটি টাকা অনুদান পাওয়া।
সাব্বির হত্যাকান্ডের পর থেকে তৈমূর ও তার পরিবার অভিযোগ করে আসছিল, গিয়াসউদ্দিনই সাব্বির আলম হত্যাকান্ডের মূল নায়ক। রাজনৈতিকভাবে গিয়াসউদ্দিনের সঙ্গে বিরোধিতা থাকলেও টাকার কারণে তৈমূর আলম খন্দকারের সঙ্গে গুপ্ত সমঝোতা হয়। এ নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মী থেকে শুরু করে পরিবারের লোকজনও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জানা যায়, নিহত সাব্বির আলম খন্দকার ছিলেন দেশের গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার অ্যান্ড ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালক ও সাবেক সহসভাপতি। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক ও জেলা কমিটির সভাপতি তৈমূর আলম খন্দকারের ছোট ভাই। ২০০৩ সালের শুরুর দিকে অপারেশন ক্লিন হার্ট চলাকালে একটি অনুষ্ঠানে প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিতিতে সাব্বির আলম নিজের জানাজায় সবাইকে শরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন। এই বক্তব্য দেওয়ার কয়েক দিন পর ১৮ ফেব্রুয়ারি শহরের মাসদাইর এলাকায় নিজ বাড়ির অদূরে আততায়ীদের গুলিতে নিহত হন তিনি।
২০০৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সাব্বির হত্যাকা-ের পর তার বড় ভাই তৈমূর আলম বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনের তৎকালীন বিএনপিদলীয় এমপি গিয়াসউদ্দিন, তার শ্যালক জুয়েল, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি জাকির খান, তার ভাই জিকু খান ও মামুন খান, শাহীন ওরফে বন্দুক শাহীন, রায়হান, মনির, এরশাদ, মনিরুল ইসলাম সজল, অহিদুল ইসলাম ছক্কু, সাইদুর রহমান, সাঈদ হোসেন রিপন, রিয়াজুল ইসলাম, হালিম, টুকু মিয়া, কাওসার, মামুন, নাদিম হোসেন, মঙ্গল ওরফে লিটন, মোক্তার হোসেন, মনিরুজ্জামান শাহীন, নাজির ও আবদুল আজিজসহ ১৭ জনকে আসামি করে ফতুল্লা থানায় মামলা করেন। মামলার পর নয়জন তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তীকালে মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) স্থানান্তর করা হয়। সিআইডির এএসপি মসিহউদ্দিন দশম তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে প্রায় ৩৪ মাস তদন্ত শেষে ২০০৬ সালের ৮ জানুয়ারি আদালতে আটজনকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করেন। এতে মামলা থেকে গিয়াসউদ্দিন, তার শ্যালক জুয়েল, শাহীনকে অব্যাহতি দিয়ে সাবেক ছাত্রদল সভাপতি জাকির খান, তার দুই ভাই জিকু খান ও মামুন খানসহ আটজনকে আসামি করা হয়।
মামলার প্রধান আসামি গিয়াসউদ্দিনকে মামলা থেকে বাদ দেওয়ায় মামলার বাদী তৈমূর আলম খন্দকার সিআইডির দেওয়া চার্জশিটের বিরুদ্ধে ওই বছরের ২৪ জানুয়ারি আদালতে নারাজি পিটিশন দাখিল করেন। নারাজি পিটিশনে তৈমূর আলম বলেছিলেন, ‘গিয়াসউদ্দিনই সাব্বির আলম হত্যাকা-ের মূল নায়ক। গিয়াসউদ্দিন ও তার সহযোগীদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা একটি গোঁজামিলের চার্জশিট দাখিল করেছেন। পরে আদালত মামলাটি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেয়।
সাব্বির হত্যা মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন জানান, তৈমূর আলম খন্দকার আদালতে দাখিল করা নারাজি পিটিশনটি আবেদন করে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। কারণ তিনি চাচ্ছেন দ্রুত মামলাটির নিষ্পত্তি করতে। নারাজি প্রত্যাহারের পর আদালত অন্য আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করার জন্য সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে। বর্তমানে মামলাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পিটিশনের ওপর সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
প্রসঙ্গত, এ চার্জশিট দেওয়ার পর থেকে তৈমূর আলম খন্দকার বারবার অভিযোগ করেন, মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের ব্যাপারে তদন্ত সংস্থা সিআইডির চরম গাফিলতি রয়েছে। মামলার প্রধান আসামি বিএনপিদলীয় সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিন ও তার সহযোগীদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা একটি গোঁজামিলের চার্জশিট দাখিল করেছেন। আসামিদের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ সাপেক্ষে তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তারা মামলা দুর্বল করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর সিটি করপোরেশন নির্বাচন সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে সিদ্ধিরগঞ্জে গিয়াসউদ্দিনের সঙ্গে তৈমূরের একটি সমঝোতা বৈঠক হয়। এতে গিয়াসউদ্দিন প্রস্তাব দেন, যদি সাব্বির হত্যা মামলা থেকে তাকে রেহাই দেওয়া হয় তাহলেই তিনি তৈমূরের পক্ষে নির্বাচনে কাজ করবেন। ওই বৈঠকে তৈমূর ১০-১২ জন সিনিয়র নেতার সামনে ওয়াদা করেন এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নারাজি পিটিশন প্রত্যাহার করে গিয়াসউদ্দিনকে রেহাই দেন। এছাড়া অন্তরালে রয়েছে কোটি টাকা নির্বাচনে অনুদান দেওয়ার কানাঘুষা।
সাব্বির আলমের পরিবারের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সাব্বির হত্যা মামলা দিয়ে শুরু থেকেই অন্য দুই ভাই তৈমূর ও খোরশেদ রাজনীতি করেছেন। বিশেষ করে গিয়াসউদ্দিনের সঙ্গে বিরোধ থাকায় তাকে চাপে রাখার চেষ্টা করছিলেন তৈমূর। কিন্তু মেয়র হওয়ার লোভে সেই গিয়াসউদ্দিনের সঙ্গে সমঝোতা করেছেন তিনি।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল বুধবার তৈমূর আলম খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি আপন ভাইয়ের হত্যাকা- নিয়ে ব্যবসা করিনি। ২০০৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সাব্বির আলম খন্দকার হত্যাকা-ের পর তৎকালীন বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, সাব্বিরের হত্যাকান্ডে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ গিয়াসউদ্দিন জড়িত নন। পরে একপর্যায়ে আমি গিয়াসউদ্দিনের নাম বাদ দিতে বলি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিরীহ জনগণের পক্ষে কাজ করি বলে আমার বিরুদ্ধে একটি চক্র ষড়যন্ত্র করছে। সেই চক্র আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মিথ্যা তথ্য দেয়। পরে দুদক তদন্ত করে আয়বহির্ভূত সম্পদের কোনো তথ্য না পেয়ে আমাকে অব্যাহতি দিয়েছিল।’
