বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, দেশে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি ৭৬ লাখ। এর মধ্যে প্রায় তিন কোটি মানুষ মানসিক রোগী। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই ভুগছেন মানসিক ব্যাধিতে। অথচ এ বিপুলসংখ্যক মানসিক রোগীর চিকিৎসায় দেশে চিকিৎসাব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। একদিকে যেমন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কারের প্রচন্ড অভাব; তেমনি এখনো দেশে মানসিক রোগের চিকিৎসা চলছে গতানুগতিক পদ্ধতিতে। বিশেষ করে সিরিয়াস ধরনের ‘ভায়োলেন্ট পেশেন্ট’ বা অস্থিরতা রোগীদের শান্ত করা হচ্ছে হাত-পা বেঁধে ও জোরজবরদস্তি করে অবৈজ্ঞানিক ভায়োলেন্ট রুমে। তাদের ওপর চালানো হচ্ছে শারীরিক নির্যাতন। এতে রোগীদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। সর্বশেষ গত সোমবার পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুর জন্য এই অবৈজ্ঞানিক ভায়োলেন্ট রুমে জোরজবরদস্তি করে হাত-পা বাঁধা ও শান্ত করতে নির্যাতনকে দায়ী করা হচ্ছে।
দেশে মানসিক রোগী অনুপাতে সরকারি পর্যায়ে হাসপাতাল ও শয্যা সংকটও তীব্র। সারা দেশে মাত্র দুটি সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। ১০ লাখ মানুষের সেবায় মাত্র পাঁচজন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ২৬০ জন। অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি হিসেবে দেশে প্রতি এক কোটি মানুষের মানসিক চিকিৎসায় চিকিৎসক মাত্র ১৩ জন। আর ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রয়েছেন ৫০ জন, যা এক কোটি মানুষের জন্য তিনজন। এমনকি রাজধানীতে অনুমোদিত বেসরকারি মানসিক হাসপাতালের সংখ্যা মাত্র ১৫টি। সরকারি ৩৭টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৫টি মেডিকেল কলেজে মানসিক রোগের বিভাগ আছে। আবার সেখানে সব কলেজেই ইনডোর ও আউটডোর না থাকায় রোগী ভর্তির সুযোগ নেই।
এমন পরিস্থিতির জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এমবিবিএস কারিকুলামে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি গুরুত্ব না পাওয়াকেও কারণ হিসেবে মনে করছেন। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যবস্থার খুবই অপ্রতুলতা বলছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায়ি পোদ্দার। তিনি গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে যত মানসিক রোগী আছে, তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশ রোগীই মানসিক রোগের চিকিৎসা পান না। অর্থাৎ মোট রোগীর মাত্র ১০ শতাংশ চিকিৎসা পাচ্ছেন। কারণ দুটি একটি হলো অনেক মানসিক রোগী বুঝতে পারেন না তিনি মানসিক রোগী এবং তার চিকিৎসা দরকার। আরেকটা কারণ হলো স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে অপ্রতুলতা। এ পরিচালক বলেন, মানসিক রোগী অনুপাতে চিকিৎসক খুবই কম। দুই লাখ মানুষের জন্য মাত্র একজন মানসিক রোগের চিকিৎসক।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সর্বশেষ (২০১৮ সাল) জরিপে দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, মোট মানসিক রোগীর মধ্যে উদ্বেগাধিক্য ২ শতাংশ, বিষণœতায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, সোমটিক সিমটম ডিজঅর্ডার ২ দশমিক ৩ শতাংশ, অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ, কনভার্সন ডিজঅর্ডার শূন্য দশমিক ৩। এর মধ্যে গুরুতর মানসিক রোগ সিজোফ্রেনিয়া শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ ও বাইপোলার ডিজঅর্ডার ধরনের রোগীর সংখ্যা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ।
ওই জরিপে আরও বলা হয়েছে, দেশে ১৮ বছরের নিচে শিশুদের মানসিক রোগের প্রকোপ বেড়েছে। বর্তমানে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। এছাড়া নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডার ভুগছেন ১ দশমিক ৫ শতাংশ, কনডাক্ট ডিজঅর্ডার শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ, মৃগীরোগে ভুগছেন ২ শতাংশ শিশু।
জরিপে মানসিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সংকট সম্পর্কে জানা গেছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশে ১০ লাখ মানুষের সেবায় মাত্র পাঁচজন মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন। এর মধ্যে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন প্রায় ২৬০ জন। সে হিসাবে প্রতি এক কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবায় মাত্র ১৩ জন চিকিৎসক। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট রয়েছেন ৫০, সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার ৭, আকুপেশনাল থেরাপিস্ট ৩, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাধারণ চিকিৎসক ১০ হাজার ৩০, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী ৯ হাজার ৪০০, মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক হাসপাতালে কর্মরত সেবিকা ৩৮৮, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স ৪ হাজার ৫০০, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইমাম রয়েছেন ১৭২ জন। দুর্যোগ-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাধারণ চিকিৎসক ৬০, সাধারণ স্বাস্থ্যকর্মী ১৬৮ ও এনজিওকর্মী ৭২ জন।
ওই জরিপ অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় দেশে মাত্র দুটি বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত ২০০ শয্যার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। অন্যটি পাবনায় অবস্থিত ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল। পাবনা মানসিক হাসপাতালে প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য শূন্য দশমিক ৪টি শয্যা রয়েছে, সে হিসাবে প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য চার সিট বরাদ্দ। দেশে ৮১৩ শয্যার মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক অন্তর্বিভাগ রয়েছে মাত্র ৪০টি। সে হিসাবে প্রতি এক কোটি জনসংখ্যার জন্য ৫৮টি শয্যা ব্যবস্থা রয়েছে।
এছাড়া শিশু-কিশোরদের জন্য ২০ শয্যার একটি মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক অন্তর্বিভাগ রয়েছে। সাইকিয়াট্রিক চাইল্ড গাইপেন্স ক্লিনিক রয়েছে দুটি, ফরেনসিক সাইকিয়াট্রিক বিষয়ে শয্যা রয়েছে ১০টি, মাদকাসক্তিবিষয়ক চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে ১০টি।
এমনকি মানসিক রোগীদের চিকিৎসায় বাজেটের ঘাটতি রয়েছে বলেও জরিপে উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে মোট বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থাৎ ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা পাস হয়। স্বাস্থ্য বাজেটের শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ, অর্থাৎ ১২৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায়। সেখানে আলাদা করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় কোনো বরাদ্দ নেই।
দেশে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে অপ্রতুলতা তুলে ধরে অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে মানসিক রোগের চিকিৎসক সীমিত। কিছু কিছু জায়গায় আছে, সব জায়গায় নেই। এছাড়া মেডিকেল কারিকুলামে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টা কম জোর দেওয়ায় চিকিৎসকরা এ বিষয়ে আগ্রহী কম। অথচ সব চিকিৎসকেরই এ বিষয়টা জানা থাকা উচিত। কারণ একজন সাধারণ মানসিক রোগীকে দেখবেন একজন সাধারণ এমবিবিএস চিকিৎসক। তিনিই প্রথমে এই ধরনের রোগীর ব্যবস্থাপনা দেবেন। যখন দেখবেন তার পক্ষে ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়, তখন উনি রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রেফার করবেন। এটা সিস্টেম। কিন্তু আমাদের দেশে যেহেতু এমবিবিএস কারিকুলামে মানসিক রোগটা বেশি গুরুত্ব পায়নি, তাই চিকিৎসকদের এ বিষয়ে ট্রেনিং হচ্ছে না। রোগটাকে প্রাথমিক পর্যায়ে ম্যানেজ ও চিহ্নিত করতে পারছেন না। ফলে একজন রোগী যখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে আসছেন, তখন তার মধ্যে রোগটির প্রবণতা বেড়ে যায়।
বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে এ রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে এ চিকিৎসক বলেন, একটা ইনস্টিটিউট আছে (জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ আছে। এছাড়া সরকারি ৩৭টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৫টি কলেজে সাইকিয়াট্রিক বিভাগ আছে। এই ১৫টার মধ্যে আবার সব কলেজে অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগ নেই। কোথায় অন্তর্বিভাগ আছে, কোথাও বহির্বিভাগ আছে। এটাও সমস্যা। এর বাইরে দেশে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থাই নেই। ফলে এ রোগের সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা খুবই অপ্রতুল। আর বেসরকারিভাবে কিছু ক্লিনিক আছে ও চিকিৎসকরা ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস করেন। এই হলো দেশে মানসিক রোগের মোট চিকিৎসা ব্যবস্থা।
চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী এ রোগের প্রকৃত চিকিৎসার ধরন কেমন জানতে চাইলে এ চিকিৎসক বলেন, মানসিক রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কয়েকটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ওষুধ ও সাইকোথেরাপি বা কাউন্সিলিং। এ থেরাপির মাধ্যমে রোগীর পরিবেশের পরিবর্তন ঘটানো এবং রোগী যে কর্ম থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাকে সেই কর্মে নিয়ে যাওয়া। এটাকে আমরা সাইকো সোশ্যাল এক্সপ্রোজ বলি। যারা হালকা সমস্যায় ভোগেন, তাদের সাইকো সোশ্যাল এক্সপ্রোজ দিলেই ভালো হয়ে যান, ওষুধ প্রয়োজন হয় না। যারা জটিল সমস্যায় ভোগেন তাদের ওষুধ লাগে। আবার কিছু জটিল রোগীদের ওষুধের পাশাপাশি ইসিটি বা ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপি দিই। একে ‘শক ট্রিটমেন্ট’ বলে থাকি। কিন্তু ইসিটি ব্যাপারে অজ্ঞানতার কারণে লোকের এ পদ্ধতি সম্বন্ধে অনেক ভুল ধারণা আছে। এ পদ্ধতি অনুসারে রোগীর মস্তিষ্কের কোষগুলোকে উজ্জীবিত করার জন্য তার কপালে খুব অল্প এবং নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে বৈদ্যুতিক প্রবাহ দেওয়া হয়। এর ফলে কয়েক মুহূর্তের জন্য শরীরে খিঁচ ধরতে পারে। সেজন্য এ সময়ে রোগীকে অ্যানেস্থেশিয়া দেওয়া হয় যাতে তিনি কোনো কিছু টের না পান। পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েক মিনিট চলে এবং ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে তার জ্ঞান ফিরে আসে। এগুলোই মানসিক রোগের চিকিৎসার প্রক্রিয়া।
মানসিক রোগীদের মধ্যে ‘ভায়োলেন্ট পেশেন্ট’ বা অস্থিরতায় ভোগেন এমন রোগীদের চিকিৎসার ব্যাপারে খুবই মনোযোগী হতে হবে উল্লেখ করে এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, যে রোগী ভায়োলেন্ট, যে নিজের বা অন্যের ক্ষতি করছে, আমাদের প্রথম লক্ষ্য তাকে আটকানো, যাতে সে নিজের বা অন্যের ক্ষতি করতে না পারে। প্রথমে এটা করি ওষুধের মাধ্যমে। কিন্তু যে খুব বেশি ভায়োলেন্ট, ওষুধ খাচ্ছে না বা খাওয়ানো যাচ্ছে না, সে ক্ষেত্রে ইনজেকশনের মাধ্যমে ওষুধ দিই। এই ইনজেকশন দেওয়ার জন্য তাকে শান্ত করতে হয় ও ধরতে হয়। তখন তাকে আবদ্ধ করার জন্য কয়েকজন মিলে ধরে ইনজেকশন পুশ করেন। কিংবা ইনজেকশন দিলেন, সেটা কাজ করতে সময় লাগবে, এই সময়টা তাকে বেঁধে রাখতে পারেন। ইনজেকশন কাজ করলে ও অস্থিরতা কমে আসলে, তখন তাকে আর আটকে রাখার প্রয়োজন নেই। পরে কেন সে ভায়োলেন্ট সে ব্যাপারে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে ভায়োলেন্ট রোগীদের আটকাতে হয়। কিছু সময়ের জন্য বেঁধেও রাখতে হয়। এটা খুব সাময়িক ব্যাপার। তবে এটা মোটেই দীর্ঘসময় করা যাবে না। তবে যারা ভায়োলেন্ট রোগীদের বেঁধে রাখা বা ধরার কাজ করবে, তাদের অবশ্যই প্রশিক্ষণ দরকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, কীভাবে রোগীদের ধরতে হবে, কীভাবে বাঁধতে হবে, কী দিয়ে বাঁধবে, কত সময় বেঁধে রাখতে পারবে এসব বিষয়ে অবশ্যই প্রশিক্ষণ দরকার। তা না হলে রোগীর ক্ষতি হতে পারে।
এ ব্যাপারে জাতীয় মানসিক হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তারিকুল আলম সুমন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, জনসংখ্যা অনুপাতে যে পরিমাণ চিকিৎসক, জনশক্তি ও অবকাঠামো দরকার, সেটার অপ্রতুলতা আছে। কারণ অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা সেবা গড়ে উঠেছে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সে রকম হয়নি।
সংকট কোথায় জানতে চাইলে এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যেসব হাসপাতাল বা ক্লিনিক হচ্ছে, সেগুলো চালাতে গেলে যে পরিমাণ বিশেষজ্ঞ ও অবকাঠামোগত সুবিধা, সেগুলো নেই। খুবই কম। বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্র বা সেন্টার, সেখানে ফুলটাইম বিশেষজ্ঞ নেই। সরকারের যেসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেখভাল করা, তাদের নজরদারি বাড়াতে হবে। এ রকম একটা ঘটনা ঘটলে একটু নড়েচড়ে বসে। পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এখানে যদি ধারাবাহিক মনিটরিং না করে, তাহলে সংকট কাটবে না।
মানসিক রোগের চিকিৎসার ব্যাপারে এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, পদ্ধতি দুটি ওষুধের মাধ্যমে যেটা করি সেটা বায়োলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট। পাশাপাশি ভায়োলেন্ট পেশেন্ট বা অস্থির রোগীদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি আছে। যেসব রোগী নিজেরা আসতে চায় না, জোর করে আনা হয়, তাদের ক্ষেত্রে শারীরিকভাবে রিস্ট্রেন্থ করতে হয়। সেটারও কিছু পদ্ধতি আছে। কীভাবে বাঁধতে হবে, কীভাবে তাকে ভায়োলেন্ট রুমে নিতে হবে। সেগুলো করতে হলে দক্ষ জনবল লাগবে। একজন রোগী যখন ভায়োলেন্ট হবে, তখন তাকে ইনজেকশন দেওয়ার জন্য ধরতে হবে, বাঁধতে হবে। এজন্য একজন রোগীকে ফোর্স করারও কৌশল আছে। সেখানে দক্ষ জনশক্তির অভাব আছে। সে কারণেই নানা ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ মানসিক রোগী, যারা নিজেদের মানসিক রোগী বলে মনে করে না, তাদের রাখা যায় না। আমাদের আউটডোরে প্রতিদিন যত রোগী আসে, অধিকাংশ রোগীকেই আমরা খাটের সঙ্গে বেঁধে রাখি, তারা চলে যেতে চায়। কোনো রোগীকে জোর করে ইনজেকশন দিতে হয়। আমাদের লোকগুলো দক্ষ। রোগীর লোকজনদের সহযোগিতা নিই। কিন্তু এটাই আরেকটু উপযুক্তভাবে করা দরকার। বিদেশে এর জন্য সোশ্যাল সিকিউরিটি সিস্টেম আছে। ওরাই রোগী আনে, সব ব্যবস্থাপনা করে। এখানে সবকিছুই ডাক্তারদের করতে হয়। অনেক সময় বৈজ্ঞানিকভাবে হয় না।
তিনি বলেন, আমাদের যেটা থাকা উচিত উপযুক্ত ভায়োলেন্ট রুম। কারণ মানসিক রোগী কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করতে পারে। এমন একটা রুম রাখা হয় যেখানে রোগী নিজেকে আঘাত করতে বা ক্ষতি করতে পারবে না। রুমে সিলিং ফ্যান থাকে না। এসি থাকে। জানালার গ্রিল থাকে না। ক্যামেরা থাকে, যেটা দিয়ে বাইরে রোগীর গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হয়। টু-ওয়ে কমিউনিকেশন থাকে। রোগী কী বলে তা বাইরে থেকে শোনা যায়। আমাদের এখানে প্রচুর ভায়োলেন্ট রোগী আসে। আমাদের নতুন যে অবকাঠামো হচ্ছে, সেখানে আধুনিক পদ্ধতির ভায়োলেন্ট রুম করা হচ্ছে। আমাদের তিনজন লোক একজন রোগীর ব্যবস্থাপনা করে। অথচ যে হাসপাতালে পুলিশ কর্মকর্তা মারা গেলেন, সেখানে আটজন লোক এ কাজ করেছে। তার মানে দক্ষতার অভাব। তাও সীমিত সময়ের জন্য ভায়োলেন্ট রুমে রাখতে হবে। বেশি সময়ের জন্য নয়। তাকে বাঁধার মাধ্যমে ফিজিক্যাল রিস্ট্রেন্থ করতে হয়। আরেকটা আছে কেমিক্যাল রিস্ট্রেন্থ। যখনই ওষুধ দিতে পারি, তখন আর বাঁধার দরকার হয় না। ইদানীং অনেক ওষুধ বের হয়েছে, যেটা দিলে আর বেঁধে রাখতে হয় না।
