কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নাট্যকার হিসেবে যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৩ সালে বিটিভির জন্য ‘প্রথম প্রহর’ নাটক লেখার মধ্য দিয়ে। ১৯৮৫ সালে তার লেখা ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। ‘এইসব দিনরাত্রি’র ব্যাপক সফলতার পর ১৯৮৮ সালে হুমায়ূন আহমেদ লিখলেন ধারাবাহিক নাটক ‘বহুব্রীহি’। নাটকে প্রধান ভূমিকায় সোবহান সাহেব চরিত্রে অভিনয় করা আবুল হায়াতের মতে, এটি ছিল তার ক্যারিয়ারের সেরা নাটক। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন আলী যাকের, আবুল খায়ের, আসাদুজ্জামান নূর, আলেয়া ফেরদৌসী, লুৎফুন্নাহার লতা, আফজাল হোসেন, লাকী ইনাম, আফজাল শরীফসহ অনেকে।
১৯৯১ সালে নির্মিত হয় ‘অয়োময়’ ধারাবাহিক। এতে অভিনয় করেন আসাদুজ্জামান নূর, সুবর্ণা মুস্তাফা, বিপাশা হায়াত, লাকী ইনাম, সারা যাকের, তারানা হালিম, আবুল হায়াত, দিলারা জামান, আবুল খায়ের, ড. ইনামুল হক, আফজাল শরীফ।
বাংলা নাটকের ইতিহাসে এক মাইলফলক ধারাবাহিক ‘কোথাও কেউ নেই’। এই নাটকের চরিত্র ‘বাকের ভাই’ হয়ে উঠে তুমুল জনপ্রিয়। নব্বই দশক থেকে হইচই শুরু হওয়া এ চরিত্রের জনপ্রিয়তা এখনো কমেনি। বাকের ভাই চরিত্রে অভিনয় করে আসাদুজ্জামান নূরও হয়ে ওঠেন তুমুল জনপ্রিয়। নাটক চলাকালে বাকের ভাইকে এতটাই আপন করে নিয়েছিলেন দর্শক যে নাটকে যেন তার ফাঁসি না হয় সে জন্য মিছিল বের করেছিল দর্শকরা। অবশেষে তার মৃত্যুর পর গায়েবানা জানাজা পড়ার কথাও শোনা যায়। ১৯৯৩ সালে প্রচার হওয়া এ নাটকে মুনা চরিত্রে অভিনয় করে নিজের বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে সেরা অভিনয় করেছিলেন সুবর্ণা মুস্তাফা। এ ছাড়া এ নাটকে অভিনয়ে করেছেন আফসানা মিমি, শহীদুজ্জামান সেলিম, শীলা আহমেদ, মাসুদ আলী খান, আবুল খায়ের, লাকী ইনাম, মোজাম্মেল হক, আব্দুল কাদের, দিবা নার্গিস, লুৎফর রহমান জর্জ, পুতুল, তমালিকা, বিজরী, মাহফুজ আহমেদ, হুমায়ুন ফরীদিসহ আরও অনেকে।
১৯৯৫ সালের ‘নক্ষত্রের রাত’ নাটক দিয়ে নির্মাণে আসেন হুমায়ূন আহমেদ। মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনবোধ নিয়ে নির্মিত এই নাটকে অভিনয় করেছেন জাহিদ হাসান, শমী কায়সার, আবুল হায়াত, দিলারা জামান, আফসানা মিমি, আলী যাকের, সারা যাকের, মেহের আফরোজ শাওন, শীলা আহমেদ, আজিজুল হাকিম, দিহান, আবুল খায়ের, লাকী ইনাম অন্যতম।
বিটিভিতে ১৯৯৬ সালে প্রচার শুরু হয় ‘আজ রবিবার’ ধারাবাহিকটি। প্যাকেজ আকারে এই নাটকটি নির্মাণ করেন মনির হোসেন জীবন। এখানে আনিস ও তিতলী-কঙ্কা চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক সমাদৃত হন জাহিদ হাসান, শাওন ও শীলা আহমেদ। এ ছাড়া বড় চাচার চরিত্রে আলী যাকের ও মতি মিয়ার চরিত্রে ফারুক আহমেদ বেশ সুপরিচিতি পান। এই জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটকটিতে অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেন আবুল খায়ের, আবুল হায়াত, সুবর্ণা মুস্তাফা, আসাদুজ্জামান নূরসহ আরও অনেকে।
হুমায়ূনের অন্যান্য জনপ্রিয় ধারাবাহিকের মধ্যে রয়েছে ‘সবুজ ছায়া’, ‘সবুজ সাথী’, ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’, ‘জোছনার ফুল’, ‘এই মেঘ এই রোদ্র’, ‘কালা কইতর’, ‘চন্দ্র কারিগর’।
দেশ রূপান্তরকে জাহিদ হাসান বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল ভাই, বন্ধুস্থানীয়। তিনি একই সঙ্গে আমার বড় ভাই আবার শিক্ষকও। আমার ক্যারিয়ারের উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন হুমায়ূন আহমেদ। তার রচনা ও নির্মাণশৈলীও ছিল অসাধারণ, যা এক দুই বাক্যে বলা সম্ভব নয়। ধারাবাহিক নাটক লিখে তার মতো আর কেউ এত জনপ্রিয়তা পাননি।’
জাহিদ হাসান আরও বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। তার অনেকগুলো ধারাবাহিকে অভিনয় করেছি। তার সঙ্গে সিনেমাও করেছি। হুমায়ূন ভাই রাইটার হিসেবে অনেক বড়মাপের। অভিনয়ের স্বার্থে চরিত্রের বিশ্লেষণে দুর্দান্ত ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। প্রতিটি চরিত্র তিনি যত্ন করে লিখতেন এবং পরিচালনা করতেন।’
দেশ রূপান্তরকে অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কাজের বা মেশার অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কারণ লেখক হিসেবে, নির্মাতা হিসেবে বা ব্যক্তি মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন ম্যাজিক্যাল মানুষ। তো এমন একজন ম্যাজিক্যাল মানুষের সঙ্গে মেশার অভিজ্ঞতা ভাষায় বলা সম্ভব নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে মেশার অভিজ্ঞতা হচ্ছে উনি আমার জীবনের আশীর্বাদস্বরূপ। উনি যেভাবে কাজ করতেন যেভাবে লিখতেন বা নির্দেশনা দিতেন, সেভাবে আগে কেউ করেনি এতটুকু বলতে চাই। আমি কাজের শুরুতেই বরাবরই বলতাম, স্যার, আপনি একটু আমাকে দেখিয়ে দেন। উনি যেভাবে আমাকে দেখিয়ে দিতেন, সেভাবে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, সেটা করতেও পারিনি। কারণ তিনি প্রতিটা বিষয়, প্রতিটা অভিনয় এত গভীরভাবে দেখিয়ে দিতেন যে সেটা একজন অভিনেতার পক্ষে করা কঠিন। কারণ তিনি যে গভীর দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়গুলো দেখতেন, সেই গভীর দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়গুলো দেখা আমাদের মতো অভিনেতাদের জন্য খুবই কঠিন।’
বাকের ভাইখ্যাত অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরের মতে, তার অভিনয়জীবনের সেরা কাজ ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের বাকের ভাই চরিত্রটি। হুমায়ূন আহমেদ নিখুঁতভাবে বাকের ভাই চরিত্রটি তৈরি করেছিলেন।