হেফাজতের কাউন্সিল ঘিরে দু’পক্ষ মুখোমুখি

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২০, ০২:১৫ এএম

প্রতিষ্ঠার এক দশক পর কেন্দ্রীয় সম্মেলন (কাউন্সিল) আয়োজন নিয়ে আবারও আলোচনায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো আজ রবিবার সংগঠনটির সদর দপ্তর হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসায় হবে এ কাউন্সিল। সকাল ১০টা থেকে মাদ্রাসা মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়ে তা চলবে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। এতে সভাপতিত্ব করবেন সংগঠনটির সিনিয়র নায়েবে আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় সম্মেলন ঘিরে সব প্রস্তুতি শেষপর্যায়ে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এই কাউন্সিল ঘিরে দুপক্ষ মুখোমুখি অবস্থায় রয়েছে। প্রয়াত আমির শাহ আহমদ শফীপন্থি নেতারা এ কাউন্সিলকে ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে এটি বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন। এ নিয়ে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ ও চট্টগ্রামে অপর যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাঈনুদ্দিন রুহী সংবাদ সম্মেলন করেছেন। আহমদ শফীর মৃত্যুকে অস্বাভাবিক ও হত্যাকাণ্ড আখ্যা দিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

আহমদ শফী গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর থেকে হেফাজতের আমিরের পদটি শূন্য রয়েছে। আজকের কাউন্সিলে হেফাজতের প্রায় সাড়ে ৩০০ কেন্দ্রীয় শীর্ষ মুরব্বি ঠিক করবেন কে প্রয়াত আমির শফীর স্থলাভিষিক্ত হবেন। জানা গেছে, এ কাউন্সিলে সংগঠনটির বর্তমান নায়েবে আমির আব্দুল কুদ্দুস ফরিদাবাদী, যুগ্ম মহাসচিব মাইনুদ্দীন রুহী, প্রচার সম্পাদক শফীপুত্র আনাস মাদানিসহ কমিটির বেশ কয়েকজন নেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এর প্রেক্ষাপটে হেফাজতের নতুন আমির ও মহাসচিব পদে কারা আসছেন তা নিয়ে সংগঠনটির কর্মী-সমর্থকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। চলছে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হেফাজতের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কওমি অঙ্গন ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ হেফাজতের কাউন্সিলের দিকে তাকিয়ে আছে। আমাদের একটাই চাওয়া হেফাজত আমির ও মহাসচিব পদে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং রাজনৈতিক কোনো অভিলাষ নেই এমন কাউকে নির্বাচিত করা হোক। পাশাপাশি সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকবেন এমন ব্যক্তিদের নির্বাচিত করতে হবে—যারা সংগঠনের জন্য নিবেদিত হয়ে কাজ করে যাবেন। এ ছাড়া সারা দেশে বিস্তৃত ও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত এ সংগঠনের মূল নেতৃত্বে অভিজ্ঞ, দূরদর্শী এবং নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন ব্যক্তিদেরই আনা হবে, এমনটাই প্রত্যাশা হেফাজত নেতাকর্মীদের।

হেফাজত নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, আমির হিসেবে বর্তমান সিনিয়র নায়েবে আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, নায়েবে আমির নূর হোসাইন কাসেমী ও মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর নাম আলোচনায় রয়েছে। এ ক্ষেত্রে হেফাজতের নতুন আমির হিসেবে বর্তমান মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর নাম বিবেচনায় শীর্ষে রয়েছে বলে দাবি সংগঠনটির অধিকাংশ নেতাকর্মীর।

মুফতি ফয়জুল্লাহর সংবাদ সম্মেলন : হাটহাজারী মাদ্রাসায় আজ রবিবার অনুষ্ঠিতব্য হেফাজতে ইসলামের কাউন্সিলকে অবৈধ বলে দাবি করেছেন প্রয়াত আমির আহমদ শফীর অনুসারীরা। গতকাল বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আহমদ শফীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ এ কথা বলেন। আহমদ শফীর মৃত্যুকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে এর বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনেরও দাবি জানান তিনি।

লিখিত বক্তব্য ফয়জুল্লাহ বলেন, ‘একটি চিহ্নিত মহল হেফাজতে ইসলামকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে গভীর ষড়যন্ত্র করছে। মূল প্রতিষ্ঠাতা, উদ্যোক্তা, যাদের শ্রম ও ঘামে হেফাজতে ইসলাম এ পর্যন্ত এসেছে, তাদের বাদ দিয়ে নতুন কতিপয় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ও মহলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চক্রান্ত কওমি অঙ্গনের জন্য ভবিষ্যতে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি মহল পরিকল্পিতভাবে মুফতি আহমদ শফীকে ‘শহীদ’ করে হেফাজতে ইসলামকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে গভীর ষড়যন্ত্র করছে। এসবের নেতৃত্বে রয়েছেন কিছু নেতা, কিছু চরমপন্থি ও উগ্রবাদী। হাটহাজারী মাদ্রাসায় আন্দোলনের নামে আল্লামা শফীর কক্ষ ভাঙচুর এবং তার ওপর অনৈতিক চাপ, অসৌজন্যমূলক আচরণ, তার চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটানো, তার অক্সিজেন খুলে নেওয়া, হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স মাদ্রাসায় প্রবেশ করতে না দিয়ে মাদ্রাসার বাইরে গেটে আটকে দেওয়া এবং হাসপাতালে নেওয়ার আগে যিনি তাকে সেবাশুশ্রুষা করতেন তাকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে নির্যাতন করা—এসবই ছিল তাদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।’

ফয়জুল্লাহ বলেন, ‘শাহ আহমদ শফীকে পরিকল্পিতভাবে ‘শহীদ’ করা হয়েছে। এ কথা জানার পরও এই চরম ও উগ্রপন্থিদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। মনে রাখতে হবে সত্যকে কখনো ধামাচাপা দেওয়া যায় না। সত্য একদিন উদ্ভাসিত হবেই। এই বিজয়কে মিথ্যার আশ্রয়ে চিরকাল ঢেকে রাখা যাবে না। আল্লামা শফীর অস্বাভাবিক শাহাদাতের বিচার বাংলার জমিনে একদিন হবেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকে সংবাদ সম্মেলনে আপনাদের মাধ্যমে সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করা হোক। বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা হোক, দেশবাসীর সত্য জানার অধিকার রয়েছে। দেশের তৌহিদি জনতা আল্লামা শফীকে নিজের জীবনের চাইতেও বেশি ভালোবাসেন। তারা উদগ্রীব হয়ে আছেন কখন আল্লামা শফীর এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠিত হবে। বিচার বিভাগী তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হবে।’

তিনি বলেন, ‘কওমি অঙ্গন ও আল্লামা শফীর চরম বিরোধী ভাণ্ডারীদের মাধ্যমে হেফাজত দখলের ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নাকি ভাণ্ডারীকে এসব ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়েছেন। এসব বলে তারা জনমনে অপপ্রচার চালিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। আজ হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্য ভূলুণ্ঠিত করে যারা হেফাজতে ইসলামকে একটি চিহ্নিত দলের ক্রীড়নকে পরিণত করতে চাচ্ছে অচিরেই তাদের মুখোশ জাতির সামনে উন্মোচিত হবে। এই সংগঠনকে যারা দ্বিখণ্ডিত করার চেষ্টা করছে তাদের আমরা হুঁশিয়ার করে দিতে চাই যে, এদেশের ধর্মপ্রাণ জনগণ ও ওলামায়ে কেরাম এমন চক্রান্ত বাস্তবায়ন হতে দেবে না এবং মেনে নেবে না।’

হেফাজতের ঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে মুফতি ফয়েজুল্লাহ বলেন, ‘একক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কাউন্সিলের নামে একতরফাভাবে কাউকে হেফাজতে ইসলামের দায়িত্ব দেওয়া হলে তা এদেশের ওলামায়ে কেরাম মেনে নেবে না। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে হেফাজতের সর্বোচ্চ আমির কর্র্তৃক গঠিত এবং বর্তমান মহাসচিব কর্র্তৃক অনুমোদিত কমিটির মাধ্যমে হেফাজতের কাউন্সিল সর্বসমর্থিত ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনলেই দেশবাসীসহ ওলামায়ে কেরাম সেই নেতৃত্বকেই গ্রহণ করবে। এছাড়া ভিন্ন পথে কোনো কিছু করার ষড়যন্ত্র হলে তা দেশবাসী রুখে দেবে।’

চট্টগ্রামে রুহীর সংবাদ সম্মেলন : হেফাজতের আজকের কাউন্সিল বন্ধের দাবি জানিয়েছেন সংগঠনটির অপর যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাঈনুদ্দিন রুহী। একই সঙ্গে প্রয়াত আমির আহমদ শফীর মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড আখ্যায়িত করে এ বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়েছেন তিনি। গত শুক্রবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংগঠনের ব্যানারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনের ব্যানারে আয়োজক হিসেবে হেফাজতে ইসলামের নাম রাখা হলেও শফীর স্ত্রীর অনুরোধে এ সংবাদ সম্মেলন করা হচ্ছে বলে জানান মাওলানা রুহী। হেফাজতের সহকারী কোষাধ্যক্ষ সরোয়ার আলম, প্রচার সম্পাদক শামসুল হক,  ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ওসমান কাশেমীসহ বেশ কয়েকজন এতে উপস্থিত ছিলেন।

রুহী বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের একটি সাংগঠনিক নিয়মনীতি আছে। সংগঠনের নিয়ম অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদ নির্ধারণ হয়। এক্ষেত্রে কাউন্সিলের প্রয়োজন নেই। আহমদ শফীর হত্যার বিচারের দাবি না তুলে ১৫ নভেম্বর কাউন্সিলের ডাক দেওয়া হয়েছে। এ কাউন্সিলের মাধ্যমে হুজুরের গড়া সংগঠনকে সুপরিকল্পিতভাবে বিএনপি, জামায়াত-শিবিরের হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। অবিলম্বে এ সম্মেলন বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত ১৬ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী মাদ্রাসায় কিছু ছাত্রকে উসকে দিয়ে লেলিয়ে দেওয়া ক্যাডার বাহিনী মাদ্রাসা অবরুদ্ধ করে রাখে। ওই সময় জোরপূর্বক হুজুরের কক্ষে প্রবেশ করে ভাঙচুর ও হুজুরকে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে শফী হুজুরকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এতে হুজুর অসুস্থ হয়ে পড়লে মুখে অক্সিজেন দেওয়া হয়। কিন্তু জামায়াত-শিবিরের প্রেতাত্মারা অক্সিজেন মাস্ক খুলে দিলে তিনি মৃত্যুর মুখে পড়েন। পরিকল্পিতভাবে হুজুরকে হত্যা করা হয়েছে। তাই হুজুরের স্ত্রী ফিরোজা বেগম ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচারের দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে তার মৃত্যুর রহস্য উদ্ধারে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত