বাইডেন ৩০৬ ট্রাম্প ২৩২

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২০, ০২:১৭ এএম

অবশেষে সিএনএনসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিডিয়া নেটওয়ার্কগুলো ঘোষণা দিয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন অ্যারিজোনা ও জর্জিয়ায়ও জয়লাভ করেছেন। ইলেকটোরাল কলেজে তার চূড়ান্ত ভোটসংখ্যা দাঁড়াল ৩০৬-এ। ট্রাম্প পেলেন ২৩২, নর্থ ক্যারোলিনাকে নিয়ে। হতে পারে কাকতালীয়। ২০১৬ নির্বাচনে ট্রাম্প জিতেছিলেন ঠিক ৩০৬টি ভোট নিয়ে, যা এবারে পেয়েছেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী বাইডেন। তখন ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তিনি ল্যান্ডসøাইড বিজয় অর্জন করেছেন। যদিও হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে দেশব্যাপী গণনায় প্রায় ৩০ লাখ ভোটে পিছিয়ে ছিলেন। এবার পিছিয়ে গেছেন প্রায় ৬০ লাখ ভোটের ব্যবধানে। তবু এখন পর্যন্ত পরাজয় স্বীকার করে নেননি।

ট্রাম্প ১৯৭৬-এর পরে তৃতীয় ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট, যিনি দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হয়েছেন। জিমি কার্টার হেরে গিয়েছিলেন রোনাল্ড রিগ্যানের কাছে সেবারে। আর বিল ক্লিনটন জিতেছিলেন জর্জ বুশের বিরুদ্ধে ১৯৯২-এ। রিগ্যান পেয়েছিলেন ৪৮৯টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট, আর বিল ক্লিনটন ৩৭০টি। তখনকার দিনে দেশ এতটা বিভক্ত ছিল না, এখন যতটা। ট্রাম্প আরও একটা কারণে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। তিনিই একমাত্র অভিশংসিত (ইমপিচড) প্রেসিডেন্ট, যিনি দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন।

প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ স্টেটসগুলোকে ‘ব্যাটেলগ্রাউন্ড বলা হতো না ২০০০-এ, বুশ-গোর নির্বাচনের আগে খুব একটা। বলা হতো সুইং স্টেটস। ২০০০-এ জর্জ ডব্লিউ বুশ জিতেছিলেন ২৭১টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট নিয়ে। প্রয়োজনের চেয়ে মাত্র একটি ভোট বেশি পেয়েছিলেন, ফ্লোরিডার ভোটগুলো তার পক্ষে আসায়। তাও সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের ফলে। ফ্লোরিডা তখন থেকেই অন্যতম ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেট হিসেবে খ্যাতি পায়। ২০০৪-এ ফ্লোরিডা আবারও বুশের পক্ষে যায় দ্বিতীয় মেয়াদে অনেক বেশি ভোটের ব্যবধানে। কিন্তু ২০০৮ ও ২০১২ সালে বারাক ওবামা ফ্লোরিডায় জেতেন দু-দুবার। ফ্লোরিডাকে চিত্রিত করা হতে থাকে লাল-নীলের মাঝামাঝি ‘পার্পল’ বা বেগুনি স্টেট হিসেবে। ট্রাম্প অল্প ভোটের ব্যবধানে জিতে নেন ফ্রোরিডা ২০১৬-তে। এবারে ২০২০-এও ফ্লোরিডা ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। অধিকাংশ জরিপের ফলাফলে দেখা যাচ্ছিল বাইডেন এগিয়ে আছেন ৩ শতাংশের মতো। কিন্তু প্রকৃত নির্বাচনে ট্রাম্প ফ্লোরিডায় বাইডেনের চেয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ ভোট বেশি পেলেন। ২০১৬-তে পেয়েছিলেন মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। বাইডেনকে সাফল্যের সঙ্গে ‘সোশ্যালিস্ট’ বানিয়ে দিতে পেরেছে রিপাবলিকানদের প্রোপাগান্ডা মেশিন। এতে কাজ হয়েছে। মায়ামি অঞ্চলে বসবাসকারী কিউবা ও ভেনেজুয়েলার অভিবাসীরা একচেটিয়া ভোট দেন রিপাবলিকান টিকিটে। নিজেদের ভূতপূর্ব দেশের অভিজ্ঞতার কারণে তারা ‘সোশ্যালিজমে’র নামও শুনতে চান না। ডেমোক্র্যাটরা যেখানে এই মেট্রোপলিটান অঞ্চলে এগিয়ে ছিল ২১ পয়েন্টে চার বছর আগে, সেই ব্যবধান কমে আসে এবারে মাত্র সাত পয়েপ্টে। তারপরও মায়ামি-ডেইড কাউন্টিতে বাইডেনই অধিকাংশ ভোট পান। তাই ফ্লোরিডাকে এখনো বেগুনিই বলা যায়। বলা হয়, ফ্লোরিড না নিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থীরা সহজে জিততে পারেন না। কিন্তু পেলেই যে জিতবেন তার নিশ্চয়তা নেই। এ কথাটা এবারেও সত্যি প্রমাণিত হলো।

তবে ফ্লোরিডা নয়, এবারে চমক দিয়েছে জর্জিয়া। ১৯৯২-এর পরে আর কখনোই জর্জিয়া ডেমোক্রেটিক প্রার্থীর পক্ষে আসেনি। তবে লাল রঙের ঔজ্জ্বল্য ক্রমেই কমে আসছিল, জর্জিয়ায়। কোনো রকমে জিতেছিলেন রিপাবলিকান গভর্নর প্রার্থী ব্রায়ান কেম্প ২০১৮-এর নির্বাচনে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেটিক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা স্টেসি আব্রামস মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ ভোটের ব্যাবধানে হেরে যান। এবারেও সিনেট নির্বাচনে কোনো প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়ায় আবার ভোট নেওয়া হবে জানুয়ারির ৫ তারিখে। এই দুই আসনের নির্বাচনের ফলে নির্ধারিত হবে সিনেট কোন পার্টির নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

পুলিশের হাতে ব্রেওনা টেলরের মৃত্যু এবং তার প্রতিক্রিয়া কৃষ্ণাঙ্গদের সংঘবদ্ধ এবং প্রতিবাদমুখর করে জর্জিয়ায়। আটলান্টা ও অন্যান্য বড় শহরাঞ্চলের ভোটেই জয়লাভ করেন বাইডেন। ব্যবধান কম হওয়ায় এই স্টেটে ভোট পুনর্গণনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাইডেন মাত্র ১৪ হাজারের মতো ভোট বেশি পান ট্রাম্পের চেয়ে। পুনর্গণনার ফলে বাইডেনের ভোট কমে ফল উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা ক্ষীণ।

যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণাঞ্চল, যা ‘সানবেল্ট’ নামে খ্যাত, রিপাবলিকান পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যগতভাবে। কিন্তু এই ‘সানবেল্টের’ দুর্গ আর দুর্ভেদ্য নয়। জর্জিয়ার মতো টেক্সাস, নর্থ ক্যারোলিনা, অ্যারিজোনায়ও ফাটল ধরেছে। টেক্সাস ও নর্থ ক্যারোলিনাকে আগে ব্যাটেলগ্রাউন্ড বিবেচনা করা হতো না। এখন হচ্ছে, যদিও এবারে রিপাবলিকান পার্টি এই দুটো বড় স্টেটকে ধরে রাখতে পেরেছে। পারেনি অ্যারিজোনাকে। মাত্র ১০ হাজার ভোটের (১ শতাংশেরও কম) ব্যবধানে বাইডেন জিতেছেন এই স্টেটে। ১৯৫২-এর পরে একবার মাত্র অ্যারিজোনা ডেমোক্রেটিক পার্টি পেয়েছিল, বিল ক্লিনটনের দ্বিতীয় নির্বাচন ১৯৯৬-এ। আবারও সেই একই ধারার পুনরাবৃত্তি। ম্যারিকোপা কাউন্টির ফিনিক্স শহরের ভোটাররা, যাদের মধ্যে হিস্পানিকরাই বেশি, দলে দলে ভোট দেন বাইডেনকে।

সানবেল্ট এলাকার এই দুটি স্টেট দীর্ঘমেয়াদে ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য আশাব্যঞ্জক। এবারে যদিও মিশিগান, উইসকনসিন, পেনসিলভানিয়া ফিরে পাওয়ায় এই দুটোকে ছাড়াই বাইডেন জিততে পারতেন। হিলারি ক্লিনটনের দুর্ভাগ্য, এই তিনটি ‘রাস্টবেল্ট স্টেটে’র একটিও তিনি পাননি। যদিও ১৯৯২-এর পর থেকে এই তিনটির একটি রিপাবলিকানরা পায়নি, ব্যতিক্রম শুধু ২০১৬। ওবামা অনেক ভোটের ব্যবধানে জিতেছিলেন ২০০৮ এবং ২০১২-তে। বাইডেন এবার জিতলেও তাকে ভালোই বেগ পেতে হয়েছে। মিশিগানে কম, উইসকনসিন ও পেনসিলভানিয়ায় বেশ কিছুটা। এগুলো ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ভোটের সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায়। মিশিগানে ট্রাম্প পেয়েছিলেন ১০ হাজার ৭০৪ ভোট বেশি, হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে। এবারে বাইডেন জিতেছেন ১ লাখ ৪৭ হাজারের ব্যবধানে। উইসকনসিনে ২০১৬-এর নির্বাচনে ট্রাম্প পেয়েছিলেন ২৩ হাজার ভোট বেশি, এবার বাইডেন হারিয়েছেন ট্রাম্পকে মাত্র ২০ হাজারের মতো ভোট বেশি পেয়ে। পেনসিলভানিয়ায়ও একই চিত্র। হিলারি ক্লিনটন হেরেছিলেন ৪৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে। বাইডেন পেয়েছেন ৪৫ হাজার ভোট বেশি। এই তিন স্টেট ছিল ২০১৬-তে হিলারি ক্লিনটন এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য ট্র্যাজেডির কারণ। এবার এগুলোই দিয়েছে বাইডেনকে বিজয়মুকুট। নির্বাচনের আগে দুই প্রার্থীই এই স্টেটগুলোয় সময় এবং অর্থ ব্যয় করেছেন। জানতেন জয়-পরাজয় নির্ভর করছে এই তিনটিতে হারা-জেতার ওপর।

রাস্টবেল্ট অঞ্চলের ওহাইয়োতে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। এই স্টেটে ট্রাম্প প্রায় ৪ লাখ ভোট বেশি পান বাইডেনের চেয়ে। তেমন হেরফের হয়নি ২০১৬-এর তুলনায়। ফ্লোরিডার মতো ওহাইয়ো সম্পর্কেও বলা হয় স্মরণাতীত কালে কোনো রিপাবলিকান প্রার্থী এই স্টেট ছাড়া জিততে পারেননি। ওবামা দু-দুবারই ওহাইয়োতে জিতেছিলেন। বাইডেন প্রমাণ করলেন, ফ্লোরিডা ও ওহাইয়ো ছাড়াও একজন ডেমোক্রেটিক প্রার্থী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন।

জর্জিয়ায় আটলান্টা, অ্যারিজোনায় ফিনিক্স, মিশিগানে ডেট্রয়েট, উইসকনসিনে মিলওয়াকি, পেনসিলভানিয়ায় ফিলাডেলফিয়া-ব্যাটেলগ্রাউন্ড স্টেটগুলোর বড় বড় শহরের নাম। এই শহরগুলোই ছিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির সাফল্যের কারণ। এমনকি যে স্টেটগুলো বাইডেন পাননি, সেগুলোতেও শহর-নগরের ভোটারদের কাছ থেকে তিনি বেশি ভোট পেয়েছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্পের তুলনায়। অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সী এবং অশে^তাঙ্গ ভোটাররা অধিক হারে থাকেন শহরে। তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়েছেন বাইডেন। এই ধারা অব্যাহত থাকবে নাকি পরিবর্তিত হবে, তা নির্ভর করছে জনগোষ্ঠীর এই দুই প্রধান অংশ, তরুণ সমাজ আর অশ্বেতাঙ্গ, দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নিজেদের পক্ষে টানার সাফল্য-ব্যর্থতার ওপর। রাজনীতির এই সমীকরণে ডান-বামের টানাপড়েনও যুক্ত হবে, সন্দেহ নেই। ডেমোক্রেটিক পার্টির নির্বাচনী ‘বিগ টেন্টে’ সবাই আগের মতো সহাবস্থানে থাকবে এই আশা করা যায় না। নির্বাচনের আগে ও পরে ট্রাম্পের ভূমিকা আর ট্রাম্পিজম নিয়ে বিতর্ক এবং সংঘাত রিপাবলিকান পার্টি এড়াতে পারবে বলে মনে হয় না। মোদ্দাকথা, দুই পার্টিই নিজেদের নীতি-আদর্শ, কর্মসূচি ও কৌশলের পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হবে সামনের বছরগুলোতে।

ইমেরিটাস প্রফেসর, ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র।  [email protected] 

নভেম্বর ১৪, ২০২০

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত