তারকা থেকে ধ্রুবতারা হয়ে থাকলেন তিনি। সত্যজিৎ রায়ের ‘অপু’ আর ‘ফেলুদা’ খ্যাত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় চলে গেলেন অনন্তযাত্রায়। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম সেরা এই অভিনতো হাসপাতালে ৪১ দিনের লড়াইয়ের পর গতকাল রবিবার ভারতীয় সময় ১২টা ১৫ মিনিটে কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গত ৬ অক্টোবর করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল সৌমিত্রকে। ১৬ অক্টোবর তার করোনাভাইরাস রিপোর্ট ‘নেগেটিভ’ আসে, কিন্তু অন্যান্য স্বাস্থ্য জটিলতা থাকায় তার অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কভিড-১৯-এর কারণে সব রকম চিকিৎসার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ, দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক শোকবার্তায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই প্রতিভাবান অভিনেতার মৃত্যুতে অভিনয়জগতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তার সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।’ প্রধানমন্ত্রী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ এক টুইট বার্তায় বলেন, “সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর ফলে ভারতীয় সিনেমা এক মহীরুহকে হারাল। ‘অপু ট্রিলজি’ ও সত্যজিৎ রায়ের একাধিক ছবিতে অভিনয়ের জন্য তাকে বিশেষভাবে মনে রাখবে মানুষ। অভিনয়ের জগতে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গভীর শোক প্রকাশ করে টুইটে বাংলা ভাষায় লিখেছেন, ‘শ্রী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণ চলচ্চিত্রজগৎ, পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক অপূরণীয় ক্ষতি। তার কাজের মধ্যে বাঙালির চেতনা, ভাবাবেগ ও নৈতিকতার প্রতিফলন পাওয়া যায়। তার প্রয়াণে আমি শোকাহত। শ্রী চট্টোপাধ্যায়ের পরিবার ও অনুরাগীদের সমবেদনা জানাই।’
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক শোকবার্তায় বলেন, ‘সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার বিশেষ শ্রদ্ধা ও প্রীতির সম্পর্ক ছিল। তার সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ, আন্তরিক ব্যবহারে তিনি সকল সময়ে আমাদের চিত্ত স্পর্শ করেছেন। তার মৃত্যু বাংলার জনজীবনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল।’
এ ছাড়া সৌমিত্রের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, ভারতের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদসহ অনেকে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শোকবার্তায় বলেন, ‘সংস্কৃতি অঙ্গনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তার কাজের মাধ্যমে অমর হয়ে থাকবেন।’
ভারতের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী গভীর শোক প্রকাশ করে এক টুইট বার্তায় লিখেছেন, ‘দাদাসাহেব ফালকে জয়ী অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তিনি এমন এক অসাধারণ অভিনেতা ছিলেন, যাকে গোটা দেশ শ্রদ্ধা করত। তার পরিবারের প্রতি, বন্ধু, আত্মীয়ের প্রতি আমার সমবেদনা রইল।’
বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ কিংবদন্তি এই অভিনেতার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। মন্ত্রী বলেন, ‘সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অভিনয়জগতে দক্ষতা, প্রাজ্ঞতা ও বিনয়ের যে অধ্যায় তৈরি করে গেছেন, তা সমগ্র অভিনয়জগতের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।’
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, ‘সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে বাংলা অভিনয়জগতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। তিনি তার সৃষ্টিশীল কর্মের মধ্য দিয়ে অভিনয়প্রেমী দর্শকদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।’
মৃত্যুর খবর পেয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুপুরেই ছুটে যান হাসপাতালে। সৌমিত্রের মেয়ে পৌলমীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে রবীন্দ্র সদনে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং কেওড়াতলা শ্মশানে শেষকৃত্য আয়োজনেও উপস্থিত ছিলেন মমতা। বেলভিউ হাসপাতাল থেকে বেলা ২টায় মরদেহ নেওয়া হয় গল্ফগ্রিনের বাড়িতে। সেখান থেকে টালিগঞ্জের টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে কিছু সময় মরদেহ রাখা হয়। সেখানে অভিনয়জগতের মানুষেরা শ্রদ্ধা জানান। এরপর রবীন্দ্র সদনে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ১৪টি সিনেমা ছাড়াও তিন শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ছয় দশকের ক্যারিয়ারে মৃণাল সেন, তপন সিনহা, তরুণ মজুমদার, গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেনদের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি। মঞ্চনাটকে নিয়মিত অভিনয় করতেন এবং আবৃত্তিশিল্পী হিসেবেও রয়েছে তার খ্যাতি।
২০১৫ সালে ঢাকার জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। গঙ্গা যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসবে তার অভিনীত ও নির্দেশিত নাটক ‘ছাড়িগঙ্গা’ মঞ্চস্থ হয়। অমিত রঞ্জন বিশ্বাসের সঙ্গে যৌথভাবে নাটকটি লিখেছেনও সৌমিত্র। ‘ছাড়িগঙ্গা’ নাটকে তার সঙ্গে অভিনয় করেন পৌলমী বসু ও দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৯৩৫ সালের ১৯ জানুয়ারি নদীয়ার কৃষ্ণনগরে সৌমিত্রের জন্ম। বাবা মোহিত কুমার চট্টোপাধ্যায় একজন আইনজীবী ও মঞ্চ অভিনেতা। মা আশালতা চট্টোপাধ্যায়ও যুক্ত ছিলেন মঞ্চনাটকে; তিনি স্থানীয় নাটকের দল ‘প্রতিকৃতি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। সৌমিত্রর স্কুলজীবন কেটেছে কৃষ্ণনগরের সেন্ট জোনস বিদ্যালয়ে। কলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে ¯স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ¯স্নাতকোত্তর করার ফাঁকেই নির্দেশক অহীন্দ্র চৌধুরীর হাত ধরে মঞ্চনাটকে তার অভিষেক। উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ‘কিং লিয়ার’ অবলম্বনে সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘রাজা লিয়র’ নাটকে নাম-ভূমিকায় অভিনয় করে দারুণ প্রশংসিত হন সৌমিত্র। সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা চরিত্রের রূপায়ণ করে চলচ্চিত্রে স্থায়ী আসন নিয়ে আছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। আবৃত্তি ও মঞ্চনাটকে ব্যস্ত সৌমিত্র চলচ্চিত্র নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। তবে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ তার মন বদলে দেয়। অপু ট্রিলজির দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘অপরাজিত’র অপু চরিত্রের জন্য অভিনয়শিল্পী খুঁজছিলেন সত্যজিৎ রায়। আর সত্যজিতের সহকারী নিত্যানন্দ দত্তের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল সৌমিত্রর। সেই সূত্রে অডিশন দিতে গেলেও চরিত্রের সঙ্গে বয়সের তারতম্যের কারণে সেবার সুযোগ মেলেনি তার। তবে সৌমিত্রকে মনে ধরেছিল সত্যজিতের। ১৯৫৯ সালে অপু ট্রিলজির শেষ চলচ্চিত্র ‘অপুর সংসার’-এ তরুণ অপুর চরিত্রে সৌমিত্রকেই তিনি বেছে নেন।
সৌমিত্র অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘অপুর সংসার’, ‘চারুলতা’, ‘অভিযান’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘অশনি সংকেত’, ‘সোনার কেল্লা’, ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’, ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘গণশত্রু’, ‘গণদেবতা’, ‘তিন ভুবনের পারে’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ প্রভৃতি।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনী নিয়ে ‘অভিযান’ নামে বায়োপিক নির্মাণ করছিলেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। গত মার্চে সেই বায়োপিকে শুটিং করেছিলেন সৌমিত্র। পরে করোনার লকডাউন শুরু হলে শুটিং বন্ধ হয়ে যায়। নিজের বায়োপিক দেখে যেতে পারেননি তিনি।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ভারতের পদ্মভূষণ, দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ড, সংগীত নাটক অ্যাওয়ার্ড, টেগোর রত্ন অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাকে ২০১২ সালে সামগ্রিক অবদানের জন্য চলচ্চিত্র পুরস্কার, ২০১৫ সালে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড (হল অফ ফেম) ও ২০১৭ সালে ‘বঙ্গবিভূষণ’ সম্মানে ভূষিত করে।
১৯৬০ সালে সৌমিত্র বিয়ে করেন দীপা চট্টোপাধ্যায়কে। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে পৌলমী চট্টোপাধ্যায় সংস্কৃতি চর্চা করেন।
