বৈশ্বিক মহামারী করোনার ধাক্কায় প্রতি মাসে প্রায় ১১ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডকে (বিএসএল)। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বিএসএলের মালিকানাধীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বলাকা লাউঞ্জ এবং বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) গত মার্চ মাস থেকে এ অর্থ লোকসান শুরু হয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে কমপক্ষে ১১ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। সেই হিসাবে এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। লোকসানের জালে পড়ে একটি সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণের বিপরীতে থাকা মাসিক ৭ কোটি টাকা কিস্তিও বকেয়া পড়েছে। তবে কর্র্তৃপক্ষ বলছে, এই অবস্থায় বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় ‘বিশেষ ছাড়’ দিয়ে ক্ষতি কিছুটা কমিয়ে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে বিএসএলের সচিব (যুগ্ম সচিব) নাজমুস সাদাত সেলিম গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনায় আমাদের প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। করোনার আগে যেখানে প্রতি মাসে গড়ে ২০ থেকে ২৩ কোটি টাকা আয় হতো; সেখানে বর্তমানে ২ কোটি টাকাও আসছে না। ব্যাংকের কিস্তিও বকেয়া পড়েছে। তবে আশা কথা হচ্ছে, গত মাসে আমাদের তুলনামূলক বেশি আয় হয়েছে। আমরা বিভিন্ন প্যাকেজের মাধ্যমে ছাড় দিয়ে চেষ্টা করছি ঘুরে দাঁড়াতে।’
বিএসএল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন রূপে ইন্টারকন্টিনেন্টালের যাত্রা শুরু হয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। রূপসী বাংলার পর এটি নতুন রূপে নির্মাণ করতে খরচ হয়েছে ৭০০ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে নিজস্ব তহবিল থেকে ১৩০ কোটি আর অগ্রণী ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে ৫৭৪ কোটি টাকা। বিশাল এ ঋণের জন্য প্রতি মাসে ৩ কোটি টাকা সুদসহ মোট ৭ কোটি টাকা কিস্তি দিতে হয়। কিন্তু গত আট মাসে একটি কিস্তিও দিতে পারেনি সংস্থাটি। ফলে ব্যাংকের কাছে তাদের কিস্তি বাবদ বকেয়া পড়েছে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা। এছাড়া হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বলাকা লাউঞ্জ ও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র মিলে কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন ও অন্যান্য খরচসহ প্রতি মাসে ৬ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়। সেখানে গড়ে দেড় থেকে ২ কোটি টাকাও আয় হচ্ছে না।
কর্মকর্তারা আরও জানান, ইন্টারকন্টিনেন্টালের মূল ভবন বাদে নকশা থেকে শুরু করে সাজসজ্জা, থাকার কক্ষ, রেস্তোরাঁ, হলরুমের অবয়ব এমনকি প্রবেশপথও পরিবর্তন করা হয়েছে। বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, আসবাবপত্র, নকশা ও সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করা হয়েছে হোটেলটিতে। আগে যেখানে হোটেলটির গ্র্যান্ড বলরুম ছিল, সেখানে এখন গড়ে তোলা হয়েছে সুবিশাল এলিমেন্টস রেস্তোরাঁ। খোলামেলা সুসজ্জিত এ রেস্তোরাঁয় রয়েছে ইতালি, ভারতীয়, কন্টিনেন্টাল, প্যান-এশিয়ান ও জাপানি নানা ধরনের খাবারের সম্ভার। গ্রাহকের পছন্দের খাবারটি তৈরি হচ্ছে গ্রাহকের সামনেই। এলিমেন্টস ছাড়াও ইন্টারকন্টিনেন্টালের অভ্যন্তরে রয়েছে ছোট-বড় আরও চারটি রেস্তোরাঁ। এর মধ্যে আছে স্টেক ও সি-ফুডের জন্য অ্যামবার রুম নামে বিশেষ একটি রেস্তোরাঁ। এ রেস্তোরাঁর জন্য রয়েছে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষ রন্ধনশিল্পী। এছাড়া রয়েছে সুইমিং পুলসংলগ্ন অ্যাকুয়াডেক, নিচতলায় ক্যাফে সোশ্যাল এবং ওপাস বার ও রেস্তোরাঁ। স্থানান্তর করা হয়েছে সুইমিংপুলও। নিচতলা থেকে সরিয়ে এটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে দোতলায়। ফলে সুইমিংপুলে আসা লোকজন রমনার পার্কের সবুজ বেষ্টনীরও কাছাকাছি থাকেন।
কর্মকর্তারা জানান, প্রায় সাড়ে ৪ একর জমির ওপর হোটেলটি প্রথম চালু হয় ১৯৬৬ সালে। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত এটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল ইন্টারকন্টিনেন্টাল। ১৯৮৪ সালে যুক্ত হয় শেরাটন কর্র্তৃপক্ষ। ২০১১ সালে শেরাটন চলে যাওয়ার পর সরকারি উদ্যোগে রূপসী বাংলা নামে এটি পরিচালিত হলেও ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে চালু হয় ইন্টারকন্টিনেন্টাল। এখন কক্ষসংখ্যা ২২৬টি। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকায় হোটেলটি পুরোদমে চালু হওয়ার পর প্রতি মাসে ২০ থেকে ২৩ কোটি টাকা আয় হতো। এ থেকে ব্যাংকঋণের কিস্তি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য ইউটিলিটি সার্ভিস চার্জ বাবদ অর্থ পরিশোধ করার পরও বিপুল পরিমাণ অর্থ তহবিলে জমা হতো। কিন্তু দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর কয়েক মাসে আয় একেবারের শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। তবে গত কয়েক মাস ধরে গ্রাহকের কিছুটা দেখা মেলায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা মাসে আয় হচ্ছে।
