পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) উপাচার্য ড. এম রোস্তম আলীর বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের বাড়িভাড়া ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় আইন এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সুকৌশলে উপাচার্যের বাসভবনকে গেস্ট হাউজ ঘোষণা করে তিনি বাড়িভাড়া ফাঁকি দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। দেশ রূপান্তরের হাতে আসা উপাচার্যের বেতন বিলেও বাড়িভাড়া না দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। এমন কাণ্ডকে সুস্পষ্ট অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহার বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি নিয়ে বিব্রত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এ পরিস্থিতিতে অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ইউজিসি ও পাবিপ্রবি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে ক্যাম্পাসে সার্বক্ষণিক অবস্থান করবেন বলে তার নিয়োগপত্রের নীতিমালায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপনের প্রথম প্রকল্পে ক্যাম্পাসে চার বিঘা জমির ওপর প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে উপাচার্যের বাসভবন নির্মাণ করা হয়। বাসভবনটি মেরামতের জন্য প্রতি বছর ইউজিসি থেকে অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরের মূল বাজেটে ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উপাচার্যের বেতনের ৪৫ শতাংশ বাড়িভাড়া হিসেবে কর্তনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয় ইউজিসি। তবে পাবিপ্রবি উপাচার্য সে নিয়ম মানছেন না। তিনি বাসভবনকে গেস্ট হাউজে রূপান্তর করেন। উপাচার্যসহ তিনজন সেই গেস্ট হাউজে থাকছেন দৈনিক ১২৯ টাকা ভাড়ায়। আর উপাচার্য রাজশাহীতে নিজ বাড়িতে নিয়মিত অবস্থান করেন বলেও তথ্য রয়েছে।
সরেজমিনে পাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে উপাচার্যের বাসভবনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ৯ আনসার সদস্য ছাড়াও উপাচার্যের পিয়ন, আরদালি, মালি, বাবুর্চিসহ ব্যক্তিগত কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন ১৫ কর্মচারী। তারা উপাচার্যের বাসভবনের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত। বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে প্রতি মাসে তাদের বেতনভাতায় ব্যয় হয় কয়েক লাখ টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাড়িটির এক কর্মচারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাড়িটিকে গেস্ট হাউজ বলা হলেও এখানে উপাচার্য স্যার, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক রঞ্জিত কুমার ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ার পারভেজ খসরু ছাড়া কোনো গেস্ট আমার চোখে পড়েনি।’
দেশ রূপান্তরের হাতে আসা উপাচার্যের একটি বেতন বিলে দেখা যায়, নিয়মানুযায়ী উপাচার্যের বাসভবনের জন্য মাসিক ৩১ হাজার ২০০ টাকা বাড়িভাড়া হিসাবে কেটে নেওয়ার কথা। তবে যেহেতু উপাচার্য একে গেস্ট হাউজ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন, তাই মাসে কাটা হচ্ছে ৩ হাজার ৮৭৫ টাকা। এতে প্রতি মাসে ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে ২৭ হাজার ৩২৫ টাকা। সে হিসাবে উপাচার্য রোস্তম আলী পৌনে তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয়কে ফাঁকি দিয়েছেন ৯ লাখ ১ হাজার ৭২৫ টাকা।
নিজের জন্য বরাদ্দ বাড়ি গেস্ট হাউজ হিসেবে ঘোষণা করার এখতিয়ার পাবিপ্রবি উপাচার্যের নেই বলে জানিয়েছেন ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিজের মতো করে নীতিমালা বানিয়ে বাড়িভাড়া কর্তন না করা আইনসিদ্ধ নয় এবং তা নিয়মবহির্ভূত। কোনো অবস্থায় গেস্ট হাউজ ঘোষণা করে বসবাসের সুযোগ নেই, কারণ এতে বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’ এদিকে এ ঘটনাকে ‘লজ্জাকর’ অভিহিত করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক।
পাবিপ্রবির সহযোগী অধ্যাপক ড. এম আবদুল আলীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উপাচার্য স্যারের বাসভবন গেস্ট হাউজ দেখিয়ে বিধি মোতাবেক ভাড়া না কাটলেও তার রাজশাহীর বাড়ির বুয়ার বেতন থেকে শুরু করে সমুদয় খরচ তিনি বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে নেন। এ দুই বাড়ির জন্য উপাচার্য মহোদয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যত কর্মচারী খাটান এবং যত অর্থ ব্যয় করেন তা বহন করা একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে সম্ভব কি না সেটা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। বিষয়টি আমাদের জন্য বিব্রতকরও বটে।’
গেস্ট হাউজ ঘোষণা করা উপাচার্যের বাসভবনে বসবাসকারী পাবিপ্রবি কোষাধ্যক্ষ ড. আনোয়ার পারভেজ খসরুর কাছে এ অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কোনো আবাসন নেই। উপাচার্য স্যার তার বাংলোকে গেস্ট হাউজ করায়, সেখানে ভাড়া দিয়ে অবস্থান করি। অনিয়ম হয়েছে কি না সেটা উপাচার্য স্যার ভালো বলতে পারবেন।’
তবে বাংলোকে গেস্ট হাউজ করায় কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেন পাবিপ্রবি উপাচার্য ড. এম রোস্তম আলী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উপাচার্যের জন্য বরাদ্দ বাড়িটির কারিগরি ত্রুটি রয়েছে। এটা কোনো বাংলোই হয়নি। তা পরিত্যক্ত ফেলে না রেখে গেস্ট হাউজ করায় তাতে বিশ্ববিদ্যালয় কিছু টাকা অন্তত পাচ্ছে।’ বরাদ্দ অর্থ দিয়ে বাড়ি সংস্কার করা যেত কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এখানে গার্ড, ড্রাইভার ও কুকের রুমসহ অনেক কিছুই নেই, সংস্কার করে তা নির্মাণ সম্ভব নয়। নতুন করে তৈরি করতে হবে।’ রাজশাহীর ব্যক্তিগত বাসভবনের খরচ নেওয়া প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, ‘আগের ভিসিরা নিয়েছেন, তাই আমিও নিই।’
তবে তার বাসভবনের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ ৩০ লাখ টাকা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক। এছাড়া বাড়িভাড়া ফাঁকি, পরিবহন পুলে দুর্নীতিসহ পাবিপ্রবি উপাচার্যের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদক পাবনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
