ক্ষতিপূরণ না পেয়ে মামলায় অনাগ্রহী বাসমালিকরা

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২০, ০৭:২৪ এএম

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুনে যাত্রীবাহী বাস পুড়লেও মেলে না ক্ষতিপূরণ। তাই মামলা করার উৎসাহ নেই পোড়া বাসমালিকদের। সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আগুনে পোড়া ও ভাঙচুরের শিকার একাধিক বাসমালিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের অনাগ্রহের কথা জানা গেছে। তারা বলেন, অনেক মালিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাস কিনে রাস্তায় নামান। এ বাসের উপার্জনেই অনেক মালিকের সংসারের খরচ চলে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুনে বাস পুড়লেও কেউ দায় নিতে চান না। একে অন্যকে দোষারোপ করা হলেও বাসমালিকদের ক্ষতির কথা কেউ বলে না।

এক বাসমালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় রাজধানীর মগবাজারে পুলিশের রিক্যুইজিশন নেওয়া বাস পুড়িয়েছিল দুর্বৃত্তরা। সেই ঘটনায় মামলা করে কোনো প্রতিকার পাননি জৈনপুর বাসমালিক সমিতির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কামাল হোসেন। মামলা করে, বিভিন্ন জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করেও ক্ষতিপূরণের একটি টাকাও পাননি তিনি। বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত ৫ লাখ টাকা খরচ করে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুনে পোড়া বাসটি মেরামত করেছিলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল সোমবার কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা তো পাই না তেমন কিছু। আমার গাড়িতে পুলিশের ডিউটি চলাকালে সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দিয়েছিল। ওই গাড়ির ক্ষতিপূরণও আমি পাইনি। ২০১১ সালে জ্বালাও-পোড়াও ঘটনার সময় বাসমালিকরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন। কিন্তু তারপর আর দেওয়া হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গাড়ির ছবি তুলে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করে ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাগজপত্র জমা দিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ক্ষতিপূরণের দাবিতে আবেদন করতে হয়। কিন্তু এগুলো সবই করা হয়েছিল, কিন্তু একটি টাকাও মেলেনি। একই তথ্য জানিয়েছেন ১২ নভেম্বর গুলিস্তান আহাদ পুলিশ বক্সের সামনে আগুনে পোড়া জৈনপুর পরিবহনের বাসমালিক ড. আফজাল হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন বাসমালিকদের অভিজ্ঞতা শুনে আমিও কোনো মামলা করার উৎসাহ পাইনি। সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গিয়েও ফিরে এসেছি।

গত বৃহস্পতিবার ঢাকা-১৮ ও সিরাজগঞ্জ-১ আসনের উপনির্বাচন চলাকালে দুপুরের পর থেকে রাজধানীর নয়াপল্টন, শাহবাগ, মতিঝিল, ভাটারা, বংশাল, কলাবাগান, সূত্রাপুর, উত্তরা, খিলক্ষেত এলাকার ১১টি যাত্রীবাহী বাসে ক্ষতিসাধন করে দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনায় ১২ থানায় ১৬টি মামলা করা হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত বাসগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বা বিআরটিসির একটি দ্বিতল বাস রয়েছে। যেটির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য বিআরটিসি কর্র্তৃপক্ষ যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন শুরু করেছে। তবে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বাসমালিকরা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে হতাশার কথা জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ ইচ্ছেমতো মামলায় করায় তারা প্রকৃত ঘটনার বিবরণ দিয়ে অভিযোগ করতে পারেননি। এছাড়া মামলা করার পরও নানা ধরনের তদবির ও সুপারিশ সংগ্রহ করতে করতেই অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। যার কারণে তারা ক্ষতিপূরণের জন্য মামলা করতে উৎসাহী নন।

বিভিন্ন থানায় করা মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ১২ নভেম্বর দুপুর পৌনে ২টার দিকে সচিবালয়ের পেছনে প্রেস ক্লাবসংলগ্ন লিংক রোডের সামনে রজনীগন্ধা পরিবহনে (ঢাকা মেট্রো-ব-১২-০৬৪৪) আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন মামলার বাদী শাহবাগ থানার এসআই চম্পক চক্রবর্তী। একইদিন আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে দেওয়ান পরিবহনের আরেকটি যাত্রীবাহী বাস (ঢাকা মেট্রো-ব-১৩-১৫৭২) পোড়ানো হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই কাজী মো. জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এতে বাসটির ২৪ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। মতিঝিলে হওয়া ১৬নং মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, রূপায়ণ হাউজিং প্রজেক্টের সামনে দুর্বৃত্তদের পোড়ানো বাস ক্ষতি হয়েছে দেড় লাখ টাকা। বিআরটিসি দ্বিতল যাত্রীবাহী বাসে (ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-৫০০১) ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করা হয় মামলার এজাহারে। মামলার বাদী এজাহার আরও উল্লেখ করেন, গাড়িতে ভাঙচুর করে বিআরটিসি দ্বিতল যাত্রীবাহী বাসের বাম পাশের গ্লাস ভেঙে ফেলে এবং আগুনে গাড়ির ডান পাশের অংশ পুড়ে যায়। যার ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ভাটারা থানাধীন কুড়িল প্রগতি সরণির কোকা-কোলার সামনে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এখানে একটি যাত্রীবাহী বাস আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। দুর্বৃত্তরা ক্ষতি করেছে ২৩ লাখ টাকার।

বাাংলাদেশ বাসমালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১১টি যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে ও ভাঙচুর চালিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে বাসমালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে। অনেক মালিক আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। শিগগিরই যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সরকারের কাছে এ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য লিখিত আবেদন করব। তিনি আরও বলেন, ২০১৪ সালের পর থেকে যত বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, একটিরও ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়নি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ২০১৪ সালে সারা দেশে যখন জ্বালাও-পোড়ানোর শিকার হচ্ছিল গণপরিবহন, তখন সরকারের পক্ষ থেকে বাসমালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সেই আশ্বাস পূরণ করা হলেও পরে কোনো বাস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আর কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত