আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে সিনিয়র এএসপি মো. আনিসুল করিমকে পিটিয়ে হত্যা মামলায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. আবদুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারের বাসা থেকে তাকে আটক করে আদাবর থানা পুলিশের একটি দল। পরে তাকে আনিসুল করিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।
এ নিয়ে এএসপি আনিসুল হত্যা মামলায় মোট ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হলো। এর মধ্যে চারজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
গত ৯ নভেম্বর রাজধানীর আদাবরের মাইন্ড এইড সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড ডি-এডিকশন হসপিটালে চিকিৎসা করাতে গিয়ে কর্মচারীদের মারধরের শিকার হয়ে মারা যান ৩১তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা এএসপি আনিস। এ ঘটনায় ১০ নভেম্বর রাতে আদাবর থানায় নিহতের বাবা ফয়েজ উদ্দিন বাদী হয়ে ১৫ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
গতকাল সকালে গ্রেপ্তারের পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আদাবর থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশনস) মো. ফারুক মোল্লা আসামি ডা. মামুনকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলাম দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ডা. মামুন এজাহারনামীয় আসামি না হলেও মামলার তদন্তে তার নাম উঠে এসেছে।
গতকাল এ বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, মানসিক হাসপাতাল থেকে ডা. মামুন প্রায়ই রোগী ভাগিয়ে মাইন্ড এইড হাসপাতালে পাঠাতেন। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে এএসপি শিপনকে তার কর্মস্থল থেকে ঢাকায় এনে স্বজনরা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে তারা একজন চিকিৎসক পান। তিনি রোগীকে না দেখেই দুটি ইনজেকশন লিখে দেন। হাসপাতালের এক কর্মচারী নিচেই পুলিশ কর্মকর্তাকে ইনজেকশন পুশ করেন। পরে আনিসের স্বজনরা হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ডা. আবদুল্লাহ আল মামুনের কাছে যান। মামুন তাদের পরামর্শ দেন, সরকারি এ হাসপাতালে এ ধরনের রোগীর খুব ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায় না। দ্রুত রোগীকে আদাবরের মাইন্ড এইড হাসপাতালে ভর্তি করলে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে। এরপরই মাইন্ড এইডের ম্যানেজার আরিফকে ফোন করে মামুন বলেন, তিনি একজন রোগী পাঠাচ্ছেন। যেন দ্রুত ভর্তি করানো হয়। ডা. মামুনের কথায় আস্থা রেখে স্বজনরা মাইন্ড এইড হাসপাতালে এএসপি আনিসকে নিয়ে যান। সেখানে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে মারধর করে কর্মচারীরা। তাদের মারধরে আনিস মারা যাওয়ার পর আবার মাইন্ড এইড হাসপাতাল থেকে ডা. মামুনকে ফোনে বিষয়টি জানানো হয়। আনিস মারা গেছেন জেনেও তাকে ওই হাসপাতাল থেকে বের করে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তির জন্য দৌড়ঝাঁপ করেন ডা. মামুন। যেন কোনোভাবেই তার দায়িত্ব অবহেলা বা রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি সামনে না আসে।
উপকমিশনার হারুন আরও বলেন, আনিস হত্যায় এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাছাড়া দালাল চক্রের ২৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এএসপি আনিসের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তারদের মধ্যে চারজন আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের বক্তব্যে মাইন্ড এইড হাসপাতালের অপকর্মে ডা. মামুনের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে।
সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে আদাবরের ওই বেসরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলে ডা. মামুন চিকিৎসা ব্যয়ের ৩০ শতাংশ কমিশন হিসেবে পেতেন জানিয়ে উপকমিশনার হারুন বলেন, কমিশনের লোভে ডা. মামুন ওই হাসপাতালসহ বিভিন্ন ভূঁইফোড় হাসপাতালে রোগী পাঠিয়ে দিতেন। মাইন্ড এইড হাসপাতালের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদন ছিল না। এসব অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের তালিকা করা হচ্ছে। এগুলো বন্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সুপারিশ করা হবে।
২৮তম বিসিএসের কর্মকর্তা ডা. মামুন রাজশাহী মেডিকেল কলেজে লেখাপড়া করেছেন। তিনি মাইন্ড এইড সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড ডি-এডিকশন হসপিটাল ছাড়াও টাঙ্গাইলের ঢাকা ক্লিনিক এবং মাইন্ড ওয়েল হাসপাতালে রোগী দেখেন। মানসিক রোগের চিকিৎসক না হয়েও ডা. মামুন রোগী দেখতেন। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি তার অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন।
