মেধাবী ও স্থানীয়দের সুযোগ থাকুক স্কুলে

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২০, ১১:৪১ পিএম

করোনা মহামারীর মধ্যে বছরের প্রায় পুরোটা জুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা একের পর এক সংকটে পড়ছেন। সম্প্রতি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর-মাউশি স্কুল-কলেজে টিউশন ফি’র বাইরে অন্যান্য সব ধরনের ফি বা ভাতা নেওয়া নিষিদ্ধ করায় অনেক অভিভাবকই হয়তো খানিকটা স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলেছেন। এদিকে, গত ১৮ মার্চ থেকে শুরু হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি আগামী ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আর এই ছুটির মধ্যেই চলছে আগামী শিক্ষাবর্ষে স্কুলগুলোতে ভর্তি প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার কাজ। তবে, দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার বাড়তে থাকা এবং শীতকালে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে সরাসরি ভর্তি পরীক্ষা না নিয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে ভর্তি নেওয়া হবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এই লটারিও হবে অনলাইনে।

দেশ রূপান্তরে শনিবার ‘স্কুলে ভর্তি লটারিতে!’ শিরোনামের প্রতিবেদনে আগামী শিক্ষাবর্ষে স্কুলগুলোর ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতির কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, মন্ত্রণালয়ের সভায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানরা তিনটি পদ্ধতির বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রথমত, পরীক্ষার বিষয়গুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে সীমিতভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আগের পদ্ধতিতেই পরীক্ষা নেওয়া। দ্বিতীয়ত, অনলাইনে পূর্ণাঙ্গ ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া। তৃতীয়ত, লটারির মাধ্যমে ভর্তি। তবে, সশরীরে সরাসরি ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সংক্রমণের ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে সেটি নাকচের পক্ষে মত দেন বেশিরভাগই। অন্যদিকে, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি না হওয়া আর অনলাইনে একজনের পরীক্ষা অন্যজন দিয়ে দেওয়ারও ঝুঁকি থাকা এবং সব শিক্ষার্থীর ইন্টারনেট এবং ডিভাইস না থাকার কথা বিবেচনা করে সেটিও বাদ দেওয়া হয়। তবে, লটারি পদ্ধতিতে পরীক্ষার সমস্যাগুলো কীভাবে কমিয়ে আনা যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এসব কারণে এখন পর্যন্ত লটারির মাধ্যমেই আগামী শিক্ষাবর্ষে স্কুলের সব শ্রেণিতে ভর্তির বিষয়টি মোটামুটি চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা।

লটারির মাধ্যমে ভর্তির প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় যে সংকট তৈরি হতে পারে সেটি হলো মেধাবী শিক্ষার্থীদের বাদ পড়ে যাওয়া এবং অমেধাবীদেরও ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার সমস্যা। এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে কাজ করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে লটারি পদ্ধতিটিও অনলাইনেই হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া লটারি পদ্ধতির আবেদনে ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’র শিক্ষার্থীদের বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এলাকার স্থানীয় শিক্ষার্থীদের আবেদন নেওয়া এবং ভর্তির বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের উৎসাহিত করার কথাও বলা হয়েছে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দূরের শিক্ষার্থীদের ভর্তি না করার জন্যও উৎসাহিত করা হতে পারে। বার্ষিক পরীক্ষা না নিয়ে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মূল্যায়নের মাধ্যমে পরবর্তী ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উত্তীর্ণ করার সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় আগেই জানিয়েছে। তবে স্কুল পরিবর্তন এবং যেসব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতি বছর শিক্ষার্থী ভর্তি করায় সে বিষয়ের সিদ্ধান্ত এখনো ঝুলে রয়েছে।

বিদ্যমান সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি সব বিদ্যালয়েই প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবশ্যিকভাবে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন করতে হবে। দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে এবং নবম শ্রেণিতে ভর্তি করার কথা জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট বা ‘জেএসসি’ ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট বা ‘জেডিসি’ পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে। এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে এবং লটারির মাধ্যমেই ভর্তি করা হলে কোনো শ্রেণিতেই আর কোনো ভর্তি পরীক্ষা থাকবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে অবশ্যই বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি প্রথমত, মেধাবীরা যাতে কোনোভাবেই ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়; দ্বিতীয়ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেন স্থানীয় শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট কোটা সংরক্ষণ করে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান বিধি অনুসারে, বিদ্যালয়গুলোর সব শ্রেণিতেই অন্তত ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ বা স্কুলের সেবা এলাকা থেকে ভর্তির নিয়ম রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে প্রতিটি স্কুলের সেবা এলাকা নির্ধারণ করার বিধানও রয়েছে। কিন্তু রাজধানীসহ দেশের নামিদামি বিদ্যালয়গুলো আর বেশি খরচের বেসরকারি স্কুলগুলোও এই নীতি খুব একটা অনুসরণ করে না। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করা যায় ভারতে সংবিধান সংশোধন করে দামি প্রাইভেট স্কুলগুলোতেও নতুন ভর্তির ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ কোটা স্কুলের সেবা এলাকার দরিদ্র শিশুদের জন্য সংরক্ষিত রাখার আইন করা হয়েছে। করোনাকালের এই সংকটে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে স্কুলের সেবা এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা সংরক্ষণ এবং মেধাবীদের ভর্তির সুযোগ নিশ্চিত করা হলে দীর্ঘদিনের একটি সংকট নিরসন হতে পারে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত