রাজধানীর বাড্ডায় নিজ বাসায় অভিযান চালিয়ে কথিত স্বর্ণব্যবসায়ী মো. মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরকে (৫৩) গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। এ সময় তার বাড়ি থেকে অস্ত্র, মাদক, সোনা ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়। গত শুক্রবার মধ্যরাতে শুরু হওয়া এই অভিযান শেষ হয় গতকাল শনিবার সকালে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন র্যাব-৩ এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু। মনিরের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়।
র্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, গোল্ডেন মনির ’৯০-এর দশকে ছিলেন কাপড়ের দোকানের সেল্সম্যান (বিক্রয় কর্মী)। সেখান থেকে সোনা চোরাচালান ও ভূমি দখলের মধ্য দিয়ে হয়েছেন হাজার কোটি টাকার মালিক। রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) কিছু অসৎ কর্মকর্তার সহযোগিতায় সিল জালিয়াতির মাধ্যমে ঢাকার ডি.আই.টি প্রজেক্টের পাশাপাশি বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা এবং কেরানীগঞ্জে ২০০-এর বেশি প্লটের মালিক হয়েছেন। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে উঠে আসে মনিরের অবৈধ পথে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়ার তথ্য। এর পর থেকে মনিরের ওপর নজরদারি শুরু করে র্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি টের পেয়ে দুবাই পালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন মনির। এজন্য এমিরেটস এয়ারলাইনসের (ই.কে ৫৮৫) একটি ফ্লাইটের টিকিটও কাটেন। গতকাল বেলা ১১টায় ছিল তার বিমানযাত্রার সময়। কিন্তু সেই সুযোগ দেয়নি র্যাব। মনিরের বাসায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও অনুমোদনবিহীন বিদেশি মুদ্রা রাখার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মনিরের রাজধানীর মেরুল বাড্ডার ১৩ নম্বর রোডের ৪১ নম্বর বাড়িতে গত শুক্রবার মধ্যরাত থেকে অভিযান শুরুর পর গতকাল শনিবার সকালে তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানায় র্যাবের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ। ছয়তলা ভবনের ওই বাসার প্রতিটি তলায় তল্লাশি চালায় র্যাব। এসময় মনিরের কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, কয়েক রাউন্ড গুলি, বিদেশি মদ এবং ১০টি দেশের অনুমোদন বিহীন বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা, ৬০০ ভরি সোনা এবং নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। পরে গতকাল বিকেল ৪টার দিকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের জমজম টাওয়ারে মনিরের অফিসে অভিযান চালায় র্যাব। তার বিরুদ্ধে অনুমোদনবিহীন বিদেশি মুদ্রা, অবৈধ অস্ত্র ও গুলি এবং মাদক রাখার অপরাধে বাড্ডা থানায় আলাদা তিনটি মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন র্যাব কর্মকর্তারা। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত র্যাব কোনো মামলা করেনি বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন বাড্ডা থানার ওসি পারভেজ ইসলাম।
গতকাল মনিরের মেরুল বাড্ডার ওই বাসার সামনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে উৎসুক মানুষের ভিড়। মাটি থেকে ভবনের পঞ্চম তলা পর্যন্ত জড়িয়ে আছে মাধবি লতা। দ্বিতীয় তলার বারান্দায় নেট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পাখির বাসা। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখিও দেখা যায়। স্থানীয়রা জানান বেশ শৌখিন ছিলেন মনির। বাসার দারোয়ান আবু তাহের দেশ রূপান্তরকে জানায়, ৬ তলা ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ডুপ্লেক্স বাসা করে থাকেন মনির। চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় রয়েছে গুদাম। সেখানে বিভিন্ন গাড়ির সরঞ্জাম রাখা। শুধু ষষ্ঠ তলা ভাড়া দেওয়া।
র্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মনির হোসেন নব্বই দশকে ঢাকার গাউছিয়া মার্কেটে কাপড়ের দোকানে সেলসম্যানের কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে এক পর্যায়ে রাজধানীর মৌচাক মার্কেটে ক্রোকারিজের দোকানে চাকরি নেন। তখন এক লাগেজ (শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিমানে বিদেশ থেকে বিভিন্ন মালামাল আনা) ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর মনির লাগেজ ব্যবসা শুরু করেন। তাদের ব্যবসার মূল রুট ছিল ঢাকা-সিঙ্গাপুর-ভারত। প্রথমে তিনি কাপড়, কসমেটিকস, ইলেকট্রনিক্স, কম্পিউটারসামগ্রী, মোবাইল ও ঘড়িসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র শুল্ক ফাঁকি দিয়ে লাগেজে করে আনা-নেওয়া করতেন। পরবর্তী সময়ে লাগেজ ব্যবসা থেকে মনির সোনা চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বায়তুল মোকাররমে উমা জুয়েলার্স নামে একটি জুয়েলারি দোকান দেন, যা তার এই চোরাচালানি কার্যক্রমকে সহায়তা করে। কালক্রমে মনির হোসেন বড় মাপের সোনা চোরাকারবারি হিসেবে অবস্থান গড়ে তুললে পরিচিতি পান ‘গোল্ডেন মনির’ নামে। চোরচালানের দায়ে ২০০৭ সালে বিশেষ ক্ষমতা আইনে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়।
র্যাব আরও জানায়, ২০০১ সালে তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী, গণপূর্ত ও রাজউকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেন মনির। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভূমি জালিয়াতি শুরু করেন এবং বাড্ডায় রাজউকের ডিআইটি প্রজেক্টে অনেক প্লট প্রতারণার মাধ্যমে নিজের করে নেন। রাজউক থেকে প্লটসংক্রান্ত সরকারি নথিপত্র চুরি এবং অবৈধভাবে রাজউকের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক সিল ব্যবহার করে পূর্বাচল, বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা এবং কেরানীগঞ্জে বিপুলসংখ্যক প্লট নিজের করে নেন। ভূমি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকায় রাজউক ২০১৯ সালে তার বিরুদ্ধে মামলা করে। রাজউকের ৭০টি প্লটের নথি নিজ কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে আইন বহির্ভূতভাবে হেফাজতে রাখায় তার বিরুদ্ধে করা রাজউকের মামলাটি চলমান রয়েছে। এছাড়াও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন করায় দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা করে।
গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় মনিরের বাসার সামনে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘শুক্রবার রাত ১১টা থেকে র্যাব ৩-এর একটি দল সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই অভিযানের মূল ভিত্তি ছিল অবৈধ অস্ত্র এবং মাদকসংক্রান্ত একটি তথ্য। আপনারা ইতিমধ্যে জেনেছেন তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, কয়েক রাউন্ড গুলি, বিদেশি মদ এবং প্রায় ১০টি দেশের বিভিন্ন পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাÑযার পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৯ লাখ টাকার মতো এবং ৬০০ ভরি সোনা অর্থাৎ প্রায় ৮ কেজি পরিমাণ সোনা ও নগদ ১ কোটি ৯ লাখ টাকা জব্দ করতে সক্ষম হয়েছি।’
গোল্ডেন মনির সম্পর্কে এই র্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘মূলত সে একজন হুন্ডি ব্যবসায়ী, সোনা চোরাকারবারি এবং ভূমির দালাল। তার ‘অটো কার সিলেকশন’ নামে একটি গাড়ির শোরুম আছে। এটির স্বত্বাধিকারী তিনি। এর পাশাপাশি গাউছিয়াতে একটি সোনার দোকানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। আমরা তার বাসা থেকে দুটি বিলাসবহুল অনুমোদনবিহীন বিদেশি গাড়ি জব্দ করেছি, যার একেকটির মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি তার অটো কার সিলেকশন থেকে আমরা আরও তিনটি বিলাসবহুল অনুমোদনবিহীন গাড়ি জব্দ করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গোল্ডেন মনিরের আরেকটি পরিচয় আছে, সেটি হচ্ছে ভূমিদস্যু। রাজউকের কতিপয় কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছেন। ঢাকা শহরের ডি.আই.টি প্রজেক্টের পাশাপাশি বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা এবং কেরানীগঞ্জে তার ২০০-এর বেশি প্লট আছে বলে র্যাব জানতে পেরেছে। ইতিমধ্যে ৩০টি প্লট থাকার কথা আমাদের কাছে সে প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছে। রাজউকের কাগজপত্র জালিয়াতি করে বিপুল পরিমাণ অর্থ সম্পদ এবং সোনা চোরাকারবারি করে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে। আমরা প্রাথমিকভাবে তার বিরুদ্ধে আরও বেশকিছু অভিযোগ পেয়েছি। র্যাব তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিআরটিএ এবং মানি লন্ডারিংয়ের জন্য সিআইডি ও ট্যাক্স ফাঁকিসংক্রান্ত বিষয়ে এনবিআরকে অনুরোধ জানাবে।’
গোল্ডেন মনিরের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা জানতে চাইলে আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আমরা জানতে পেরেছি তিনি একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংম্পৃক্ত ছিলেন এবং ওই রাজনৈতিক দলকে অর্থ জোগানোর বিষয়টি প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে স্বীকার করেছেন।’ তবে রাজনৈতিক দলটির নাম জানতে চাইলে আশিক বিল্লাহ এড়িয়ে যান।
