নিয়ম না থাকলেও বুয়ার বেতন নেন উপাচার্য!

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২০, ০৬:৪৮ এএম

বাসভবনকে গেস্ট হাউজ ঘোষণা করে বাড়িভাড়া ফাঁকির পর বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও ইউজিসির নীতিমালা ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি পরিবারের জন্য ব্যবহার, উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য ও ব্যক্তিগত কাজে অর্থ অপচয়সহ একের পর এক অভিযোগ উঠে আসছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) উপাচার্য ড. এম রোস্তম আলীর বিরুদ্ধে। উপাচার্য তার রাজশাহীর বাসভবনের বুয়া ও কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিলও নেন বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে। দেশ রূপান্তরের হাতে আসা এমন কয়েকটি ভাউচারে তার প্রমাণও মিলেছে। এছাড়া উপাচার্যের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অ্যাকাডেমিক শৃঙ্খলা বিনষ্টেরও অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিভিন্ন বিভাগে ডিন ও চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং পছন্দের ব্যক্তিদের পদোন্নতির সুবিধা দিতে বারবার পক্ষপাতমূলকভাবে নীতিমালাও সংশোধন করেছেন তিনি। সম্প্রতি এসব অভিযোগের ফিরিস্তি জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাবিপ্রবির অর্গানোগ্রাম অনুসারে উপাচার্য নিজের ব্যবহারের জন্য একটি জিপ গাড়ি পাবেন। আগের ভিসি আল নকীব চৌধুরীর সময়ে প্রায় ৮০ লাখ টাকায় কেনা হয় একটি নতুন পাজেরো জিপ। কিন্তু দায়িত্ব নিয়েই মাত্র দুই বছর ব্যবহার করা সেই গাড়িটি বাতিল করে দেন উপাচার্য এম রোস্তম আলী। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ১ কোটি টাকায় তার জন্য কেনা হয় একটি নতুন পাজেরো জিপ। আর আগের গাড়িটি রোস্তম আলী পাঠিয়ে দেন রাজশাহীতে তার পরিবারের ব্যবহারের জন্য। সে গাড়ির ড্রাইভার, জ¦ালানি ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে। গত পৌনে তিন বছরে তিনি এ বাবদ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা নিয়েছেন। শুধু গাড়ি বিলাসিতাই নয়, উপাচার্য তার রাজশাহীর বাসভবনের বুয়া ও কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিলও নেন বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে। দেশ রূপান্তরের হাতে আসা এমন কয়েকটি ভাউচারে তার প্রমাণও মিলেছে। চলতি বছরের জুলাই মাসের দুটি ভাউচারে দেখা যায়, উপাচার্য তার রাজশাহীর বাড়ির বুয়া অনু রায়ের বেতন বাবদ ৩ হাজার, কর্মচারী ওয়াজেদের দিন হাজিরা বাবদ ৫০০ এবং ইন্টারনেট বিল বাবদ ৩ হাজার টাকা গ্রহণ করেছেন। অন্য একটি ভাউচারে দেখা যায়, একই বাড়ির ফেব্রুয়ারি মাসের বিদ্যুৎ বিল বাবদ ২ হাজার ৯২৮ টাকা গ্রহণ করেছেন উপাচার্য রোস্তম আলী। এসব ভাউচারে তার একান্ত সচিব মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষর রয়েছে।

পাবিপ্রবি ভিসির এমন বিলাসিতাকে সুস্পষ্ট অনিয়ম ও সরকারি অর্থের অপচয় বলেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার সময়ে পাবিপ্রবি উপাচার্যের জন্য একটি গাড়ি দেওয়া হয়েছিল। সেটি খুব বেশিদিন আগে নয়। এরপরও আবার কেন নতুন গাড়ি কিনতে হলো তা আমার বোধগম্য নয়। এগুলো একেবারেই অনৈতিক কাজ। এসব অনিয়ম খতিয়ে দেখা উচিত।’

উপাচার্যের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অ্যাকাডেমিক শৃঙ্খলা বিনষ্টেরও অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বিভিন্ন বিভাগে ডিন ও চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং পছন্দের ব্যক্তিদের পদোন্নতির সুবিধা দিতে বারবার পক্ষপাতমূলকভাবে নীতিমালা সংশোধন করেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি বিভাগের মধ্যে অন্তত ৭টিতে অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক থাকার পরও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে সহকারী অধ্যাপক কিংবা অন্যদের চেয়ারম্যান ও ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপাচার্যের স্বেচ্ছাচারিতায় অপমানজনকভাবে বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান ও হলের প্রভোস্টদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই সরিয়ে পছন্দের ব্যক্তিদের পদায়ন করা হয়েছে। এসব অনিয়মের দালিলিক প্রমাণও দেশ রূপান্তরকে দেখিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষকরা।

বঙ্গবন্ধু হলের সাবেক প্রভোস্ট প্রফেসর ড. মুশফিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো অভিযোগ না থাকলেও হঠাৎ এক দিন ভিসি স্যার আমাকে ডেকে পদত্যাগ করতে বলেন। আমি তার কাছে কারণ জানতে চাইলে তিনি অন্য একজনকে এ পদে বসাবেন বলে জানান। আমি পদত্যাগে সম্মত না হলে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই অপমানজনকভাবে আমাকে অপসারণ করেন তিনি।’ ভুক্তভোগী এ শিক্ষক আরও বলেন, ‘উপাচার্য স্যার সব কাজেই জামায়াত-শিবিরের লোকজনকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। তিনি কেন এমনটি করছেন সেটাই একটি বড় প্রশ্ন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বই কেনাকাটায়ও উপাচার্য রোস্তম আলী অনৈতিকভাবে তার পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। দেড় দশকের অভিজ্ঞতা, একক কার্যাদেশে ১০ কোটি টাকার বই সরবরাহ করার যোগ্যতা এবং বছরে ১২ কোটি টাকার বই বিক্রির (টার্নওভার) প্রমাণ থাকা এমন সব কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়ে বিদেশি বই কিনতে টেন্ডার তিনি দেন। এসব শর্তের আড়ালে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করেন দেশের বড় প্রকাশক, বিক্রেতা ও সরবরাহকারীরা। এ বিষয়ে আপত্তি ও পুনরায় দরপত্র আহ্বানের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পাবনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাবিপ্রবি উপাচার্য এম রোস্তম আলীর নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে ইউজিসিতে। ইউজিসি সেসব অভিযোগ দুদকে পাঠানোয় আমরা কাজ শুরু করেছি। তদন্ত শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য ড. রোস্তম আলীর বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বই কেনাকাটার বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। অতিরিক্ত গাড়ি ব্যবহার ও রাজশাহীর বাড়ির খরচের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আগের ভিসিরা এসব সুবিধা নিয়েছেন বলে আমিও নিয়েছি। এটি অনিয়ম কি না তা অর্থ দপ্তর জানে।’ আর অ্যাকাডেমিক শৃঙ্খলার বিনষ্টের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘কিছু শিক্ষক সুবিধা না পেয়ে অপপ্রচার করছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত