ইতিমধ্যে সরকার আমন ধান-চালের সংগ্রহ দর ঘোষণা করে ধান সংগ্রহ শুরু করেছে। চাল সংগ্রহ শুরু করতে এখনো কিছুটা বিলম্ব আছে। কারণ চালকল মালিকদের সঙ্গে খাদ্য বিভাগের চুক্তি হওয়ার পরই চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয় এ বছর আমনে চালকল মালিকদের সঙ্গে চুক্তির সর্বশেষ সময় নির্ধারণ করেছে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত। হয়তো চালকল মালিকদের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার পর চাল সংগ্রহ শুরু হবে। কৃষকের ধানের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করতে ও আপৎকালীন খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে সরকার প্রতি বছর বোরো ও আমন দুই মৌসুমেই অভ্যন্তরীণভাবে কমবেশি ধান-চাল সংগ্রহ করে থাকে। যদিও গেল বোরো মৌসুমে খোলাবাজারে ধানের দাম বেশি ছিল। ফলে খাদ্যগুদামের নিয়মকানুন মেনে
কৃষকদের খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে হয়নি। সরকারের ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৮ লাখ মেট্রিক টন। যা এ সময়কালের সর্বোচ্চ সংগ্রহ-লক্ষ্যমাত্রা। তবে ধানের দাম খোলাবাজারে বেশি থাকায় সরকারের ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি সফল হয়নি। চাল সংগ্রহের অবস্থাও ভালো ছিল না। ধানের দাম বেশি থাকলে চালের দামও বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। ফলে চুক্তিবদ্ধ মিলারদের অনেকেই লোকসান গুনে সরকারকে চাল দিলেও অনেক চালকল মালিক চাল দিতে পারেননি। যে কারণে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয়নি। এবারের আমন সংগ্রহ মৌসুমের অবস্থাও ভালো না। টানা বর্ষণ, উজানের পানির ঢলে উপর্যুপরি বন্যায় এ বছর আউশ ও আমন ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
যদিও সরকারের খাদ্য বিভাগ আপৎকালীন খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে অনেকটা মরিয়া হয়েই কাজ করছে। খাদ্য বিভাগের সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হাটে-বাজারে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রির জন্য লিফলেট বিতরণ করে ব্যাপকভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। ধান সংগ্রহের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ অতীতে কখনো দেখা যায়নি। বরং আগে কৃষকের অভিযোগ ছিল সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে গেলে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। আর এ বছর খাদ্য বিভাগই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে এ বছর কৃষকদের সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে গেলে কোনো ঝামেলায় যে পড়তে হবে না, এটা অনেকটাই নিশ্চিত। কিন্তু খোলাবাজারে যেহেতু কৃষক ধানের উপযুক্ত মূল্য পাবেন, সেহেতু সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রির আগ্রহ যে থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। আবার চাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে খাদ্য মন্ত্রণালয় বরাবরই ধানের দরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চালের মূল্য নির্ধারণ করে না। ফলে সরকারকে চাল দিতে গিয়ে চালকল মালিকদের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়।
আমাদের দেশের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে একমাত্র চালকল শিল্পই অন্যতম। ধান উৎপাদন দেশে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই ধানকে ঘিরেই গোটা দেশে গড়ে উঠেছে প্রায় ২৫ হাজার হাসকিং মিল ও চাতাল। যারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের আপৎকালীন খাদ্য মজুদ গড়ে তুলতে সরকারি খাদ্যগুদামে সেদ্ধ ও আতপ চাল সরবরাহ তো করেই আসছে, উপরন্তু দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চালের চাহিদা পূরণ করে আসছে। আর হাসকিং মিলের উৎপাদিত চালের পুষ্টিগুণও ভালো। কারণ হাসকিং মিলে ধান ছাঁটাই যে পদ্ধতিতে করা হয়, তাতে চালের গায়ে যে পুষ্টিগুণ থাকে তা বিনষ্ট হয় না। অথচ এখন স্বয়ংক্রিয় চালকলে আধুনিক প্রযুক্তির মিল মেশিনারিজের সাহায্যে যে চাল প্রস্তুত করা হয়, তা দেখতে চকচকে হলেও চালের উপরিভাগের পুষ্টিগুণ শূন্য হয়ে যায়।
দেশের অধিকাংশ ভোক্তা এখন মরা দানামুক্ত চাল খেতে চান। ফলে চাল মরা দানামুক্ত করেই বিপণন করা হচ্ছে। চাল থেকে মরা দানা ঝেড়ে ফেললে তো চালের পুষ্টিগুণ নষ্ট হবে না। কারণ বাছাই মেশিনে মরা দানা সহজেই বাছাই করা যায়। আর ‘পলিশার’ মেশিন বাদ দিয়ে শুধু ‘হাস্কার’ মেশিনে ধান ছাঁটাই করলে চাল দেখতেও ভালো হবে এবং পুষ্টিগুণও অক্ষুণœ থাকবে। এ কারণে হাসকিং মিলগুলোর ব্যবহৃত মান্ধাতার আমলের ‘অ্যাংগেল বার্গ’ হলারের বদলে উন্নত প্রযুক্তির ‘হাস্কার’ সংযোজন করে ‘কালার শর্টার’ (বাছাই) মেশিন স্থাপন করলে এই চালকল দিয়েই সরকারের ও ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল প্রস্তুত করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা। সরকার যদি স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণে হাসকিং মিলগুলোকে আধুনিকায়ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা হাসকিং চালকল শিল্পকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। আর বিপুল পরিমাণ শ্রমিককে কাজ হারাতে হবে না। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ হাসকিং মিল চালু থাকলে ধান চাল বেচা-কেনায় প্রতিযোগিতা থাকবে। বাজারে এ ধরনের প্রতিযোগিতা থাকলে কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য একদিকে যেমন নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তারাও কমমূল্যে চাল কিনে খেতে পারবেন।
অন্যদিকে, যখন বাজারে শুধু গুটিকতক স্বয়ংক্রিয় মিলের উৎপাদিত চালের ওপর প্রায় ১৬ কোটি ৭৬ লাখ মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ করার ব্যবস্থায় দেশ চলবে তখন স্বভাবতই হাতেগোনা কয়েকটি স্বয়ংক্রিয় মিলের একচেটিয়া আধিপত্য সৃষ্টি হবে। ফলে ভোক্তাদের চড়া দামেই চাল কিনে খেতে হবে। যে কারণে ভোক্তার কষ্টও বাড়বে। আর সরকার কখনো মিল মালিকদের আবার কখনো আড়তদার কিংবা খুচরা চাল ব্যবসায়ীদের দায়ী করবে। মাঝে মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবে, কাউকে কাউকে জরিমানাও করবে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে না। এই হচ্ছে বাস্তবতা।
প্রকৃত অর্থে ভোক্তার স্বার্থরক্ষা করতে হলে হাসকিং চালকলগুলোকে যুগোপযোগী করে আধুনিকায়নের জন্য সংস্কার করতে হবে। যাতে বাজারে ধান-চাল কেনাবেচার ক্ষেত্রে একটি নীরব প্রতিযোগিতা চালু রাখা যায়। তাহলে একদিকে কৃষকের ধানের ন্যায্যমূল্য যেমন নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে গুটিকতক স্বয়ংক্রিয় চালকল মালিক চালের বাজারকে ইচ্ছা করলেও একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। আর চাল সংগ্রহ অভিযানকে সফল করার প্রকৃত কারিগরই হচ্ছে হাসকিং মিল চাতালের মালিকরা। যারা চালের সংকটকালেও সরকারের চাল সংগ্রহ কার্যক্রমকে সফল করে তুলেছে। এ জন্যই গোটা দেশে গড়ে ওঠা প্রায় ২৫ হাজার হাসকিং চালকলকে সরকার আধুনিকায়ন করার উদ্যোগ নিলে কৃষক ও ভোক্তা উভয়েরই স্বার্থরক্ষা হবে।
লেখক : কৃষিবিষয়ক লেখক
