নিজ প্রতিষ্ঠানে ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইসের (ইএফডি) বসাতে নারাজ ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, করোনার কারণে আট মাস রেস্তোরাঁয় ব্যবসা নেই। মেট্রোরেলের কারণে অনেক রেস্তোরাঁয় ক্রেতা আসতে পারে না। এর ওপর দোকানে ইএফডি মেশিন বসানো হচ্ছে। ক্রেতা থেকে ভ্যাট নিলে ক্রেতা আসতে চায় না। এভাবে চলতে থাকলে রেস্তোরাঁ বন্ধ করে গ্রামে চলে যেতে হবে। ভ্যাটের ক্ষেত্রে এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কথা এনবিআরকে ভাবতে হবে। গতকাল রাজধানীর ফারস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট আয়োজিত ‘ইএফডি-এসডিসির ব্যবহার এবং উপকারিতা সম্পর্কে অবহিতকরণ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে’ সেমিনার ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনার ডা. এস এম হুমায়ুন কবীর।
সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, ‘ভ্যাট নিয়ে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়ের মধ্যেই বিরূপ মনোভাব। দোকানির মনোভাবে ভ্যাট যেন তার ওপর অতিরিক্ত বোঝা, তাকে ভ্যাট দিতে হয়, ভ্যাট দিতে তার ব্যবসা চলে না, ক্রেতা আসে না। আর ক্রেতার বক্তব্য হলো আমি ভ্যাট দিয়ে আসি। সেই ভ্যাট সরকারের কোষাগারে যায় কি-না তা আমি জানি না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরকারের কাছে যায় না। ব্যবসায়ীর কেন মনে হবে ভ্যাট তার ওপর বোঝা? ভ্যাট তো ব্যবসায়ী তার লাভের অংশ বা পকেট থেকে দেবে না। ভ্যাট তো ভোক্তা দিচ্ছে সরকারি কোষাগারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। মাঝপথে কিছু সময় সেই ভ্যাট ব্যবসায়ীর কাছে আমানত হিসেবে থাকে। এতে ব্যবসায়ীর লাভের অংশে ক্ষতি করল, সরকারি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো এটা কী ধরনের বিষয় আমি বুঝি না।
চেয়ারম্যান প্রশ্ন করে বলেন, আমি ভ্যাট নিই বলে ক্রেতা আমার দোকানে আসে না, কম আসে, আসতে চায় না ব্যবসায়ীরা বলেন। ‘আপনি তো এদেশের নাগরিক। দেশ এখন যে অবস্থায় আছে, তাতে কি আপনারা খুশি নন? আপনি কি একটি উন্নত ও ডিজিটাল দেশ চান না? যদি সেটা চান, সেটা কীভাবে সম্ভব? আপনি চান সব কিছু, কিন্তু ভ্যাট দেবেন না, ট্যাক্স দেবেন না কিছুই দেব না। শুধু সরকার দেবে। সরকার কোথা থেকে দেবে? সরকার কি বিদেশির কাছ থেকে হাত পেতে, ভিক্ষা করে দেবে? আমরা কি সেই জাতি আছি এখনো, থাকব? আমরা নিজস্ব টাকায় পদ্মা সেতু করছি। ঢাকা শহরে মাটির নিচ দিয়ে গাড়ি চলবে। ফ্লাইওভার হয়েছে, সেটা দেখে কি আমাদের ভালো লাগে না? মহাশূন্যে আমরা স্যাটেলাইট পাঠিয়েছি। স্বপ্ন থাকতে হবে। স্বপ্ন না থাকলে জাতি বড় হতে পারে না। ভবিষ্যৎ প্রজšে§র কথা চিন্তা করে উন্নয়ন করতে হবে। আর এসব উন্নয়ন কর্মকা-ের জন্য সরকারের তো অর্থ লাগবে। রাজস্ব এলেই দেশের উন্নতি হবে।’
তিনি বলেন, ইএফডির মাধ্যমে যারা ভ্যাট দেবেন, আগামী জানুয়ারি থেকে তাদের ইনভয়েস লটারি করা হবে। আর সেই লটারির মাধ্যমে ভোক্তাদের পুরস্কার দেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ইএফডি জনপ্রিয় করা, ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করতে এনবিআর এ উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের আশ^স্ত করে তিনি বলেন, যত বেশি রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে তত বেশি আমরা ভ্যাটের হার কমাতে পারব। ইএফডি মেশিন ব্যবহারের মাধ্যমে ভ্যাটের আদায় বৃদ্ধি পেলে আমরা ভ্যাট আদায় আরও সহজ করব। পুরস্কারের ব্যবস্থা করলে ইএফডির মাধ্যমে জনগণের ভ্যাট দেওয়ার অনীহা দূর হবে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের আরও বেশি উন্নয়ন হবে। ফলে দেশের ছেলেমেয়েরা আর বিদেশে যাবে না। আর ব্যবসায়ীদের জন্য সুখবর হচ্ছে, যারা ভাবছেন এখন ইএফডি নেওয়ায় বিক্রি কমছে, এটা ভুল। আগামী জানুয়ারি থেকে ইএফডির ইনভয়েস লটারি হবে। এর মাধ্যমে ভোক্তা ভ্যাট দেবে এবং প্রতি মাসে পুরস্কার পাবে। আর যারা পুরস্কার পাবে, তাদের লটারি নম্বর গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হবে। ফলে নিকটস্থ ভ্যাট অফিস থেকে পুরস্কারের টাকা নিতে পারবে ভোক্তারা। তাই যাদের দোকানে ইএফডি আছে, ভোক্তারা কিন্তু সেইসব দোকান খুঁজে পণ্য কিনতে শুরু করবে।
রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের একজন প্রতিনিধি বলেন, করোনার কারণে আট মাস ব্যবসা নেই। মেট্রোরেলের কারণে অনেক রেস্তোরাঁয় ক্রেতা আসতে পারে না। এর ওপর দোকানে ইএফডি মেশিন বসানো হচ্ছে। ভ্যাট নিলে ক্রেতা আসতে চায় না। এভাবে চলতে থাকলে রেস্তোরাঁ বন্ধ করে গ্রামে চলে যেতে হবে। ভ্যাটের ক্ষেত্রে এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কথা এনবিআরকে ভাবতে হবে।
এনবিআর সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি) ড. আবদুল মান্নান শিকদার বলেন, ২৫ আগস্ট থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ইএফডি ও এসডিসি বসানো হয়েছে। দেশ প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে। তাহলে এনবিআর কেন পিছিয়ে থাকবে। ব্যবসায়ীরা বলে, ক্রেতা ভ্যাট দেয় না। ক্রেতা বলে, ব্যবসায়ী চালান দেয় না। ইএফডি ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও ভোক্তার দুঃখ দূর হবে। ইএফডি এনবিআর সরাসরি মনিটরিং করছে বলে আশ^স্ত করেন তিনি।
এনবিআর সদস্য জাকিয়া সুলতানা বলেন, একজন ব্যবসায়ী শুধু ব্যবসায়ী নয়, একজন সচেতন নাগরিক। ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকেও তিনি এ ভ্যাটের আমানতকারী। এখন কিছু জায়গায় মেশিন বসেছে। সব জায়গায় মেশিন বসানো হলে বৈষম্য কমে আসবে। ইএফডি বাস্তবায়ন হলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে আমরা আরও একধাপ এগিয়ে যাব।
