ক্যাস্ত্রো শ্যাভেজ মোরালেসদের বন্ধু

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২০, ০২:৫৪ এএম

ডিয়েগো ম্যারাডোনা এক ইতিহাস। উত্থান-পতন-যুদ্ধ-প্রেম আর মহানুভবতায় সমাকীর্ণ এক ঘটনাপ্রবাহও বটে। জীবনের মধ্যে চিরকাল ভালো-মন্দের দুই বিপরীত স্রোতধারা বয়ে বেড়ালেও একটা জায়গায় ম্যারাডোনা কোনো দিন আপস করেননি। আজন্ম সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী থেকে গেছেন। আদর্শের কারণেই ফিদেল ক্যাস্ত্রোর মতো মহান বিপ্লবী বন্ধু হয়েছিলেন ম্যারাডোনা।

আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সের দারিদ্র্যপীড়িত লানুসের গোঁড়া ক্যাথলিক পরিবারে জন্ম হয়েছিল ম্যারাডোনার। আট ভাইবোনের পরিবারে তিনি ছিলেন পঞ্চম। বাবা কাজ করতেন কারখানায়। বস্তির রাস্তাঘাট আর অলিগলিতে খেলে বেড়াতেন ছোট্ট ডিয়েগো। শুধু খেলা তো নয় ছোট্ট দুটি পা থেকে ফুলের মতো পাস বাড়াতেন। ড্রিবল করতেন। তাই দেখে সঙ্গীরা তাকে বলত ‘এল পিবে দে ওরো’; মানে সোনার বালক। খেলা দেখেই একজন ম্যারাডোনাকে ‘ফিওরিতো’ নামে ডাকতেন। যার মানে ফুলের মতো সুন্দর।

ছিয়াশির মেক্সিকো বিশ্বকাপ ‘ফিওরিতো’ কী জিনিস তা প্রথম বুঝতে পারে। ফুটবল যে কী ভয়ংকর সুন্দরভাবে খেলা যায় তা প্রথম দেখিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। গোটা দুনিয়া তার দুটি পায়ের কাছে নতজানু হয়েছিল। বিশ্বকাপ জেতার পরের বছর তিনি প্রথমবার গিয়েছিলেন কিউবা। ফিদেল ক্যাস্ত্রোর সঙ্গে সেই তার প্রথম দেখা। ১০ নম্বর জার্সিটা উপহার দিয়েছিলেন মহান বিপ্লবীকে। সেই সাক্ষাতে ম্যারাডোনাকে ছোট্ট একটা উপদেশ দিয়েছিলেন কিউবার রাষ্ট্রনায়ক, ‘আদর্শের সঙ্গে কখনো আপস করো না।’ বন্ধুর এই কথাটা আজীবন মেনে চলেছেন। ক্যাস্ত্রোর সঙ্গে যে কারণে তার বন্ধুত্বটাও চিরস্থায়ী হয়েছিল।

অবসরের পর মাদকাসক্ত ম্যারাডোনাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন ক্যাস্ত্রো। ‘লা পেড্রেরা’ ক্লিনিকে রিহ্যাবের মাধ্যমে সুস্থ হয়েছিলেন ম্যারাডোনা। এরপর কিউবার নায়কের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ডিয়েগো বলেন, ‘এমনকি রাত ২টার সময়ও ফোন করতেন ক্যাস্ত্রো। আমিও সব সময় কথা বলতে প্রস্তুত থাকতাম। কোনো ইভেন্ট থাকলে জানতে চাইতেন, আমি যেতে চাই কি-না। এগুলো আমি ভুলব না কোনোদিন।’ ক্যাস্ত্রোও আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির বন্ধুত্বের মর্যাদা করেছেন আজীবন, ‘ডিয়েগো আমার মহান বন্ধু। কোনো সন্দেহ নেই যে ও অসাধারণ এক অ্যাথলিট। আর কিউবার সঙ্গে ম্যারাডোনার বন্ধুত্ব রেখে গিয়েছে কোনো পার্থিব লাভ ছাড়াই।’ ক্যাস্ত্রোর মৃত্যুর খবর পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ম্যারাডোনা ছুটে গিয়েছেন কিউবাতে, ‘আমার কাছে উনি ছিলেন দ্বিতীয় বাবার মতো। আর্জেন্টিনায় যখন আমার সামনে দরজাগুলো বন্ধ হচ্ছিল, তখন উনি কিউবার দরজা খুলে দিয়েছিলেন। আমি এই সময় কিউবার মানুষের পাশে থাকতে চাই। আর বিদায় জানাতে চাই আমার বন্ধু ফিদেলকে।’ দিনটি ছিল ২৫ নভেম্বর, ২০১৬। সেই ২৫ নভেম্বরেই মৃত্যু হলো ম্যারাডোনার।

২০০৫ সালে হাভানার এক টিভি চ্যানেলে ফিদেল আর ম্যারাডোনার পাঁচ ঘণ্টার এক সাক্ষাৎকার প্রচার করেছিল। যেখানে দুই বন্ধুর সম্পর্কের রসায়ন বোঝা গিয়েছিল। ওই সময়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিবাদের আয়োজন করেছিল কিউবা। সমর্থন জানিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। পরে আর্জেন্টিনায় বুশবিরোধী মিছিলেও হাঁটেন তিনি। এবং বলেন, ‘বুশ একজন খুনি। আমি চাই না আর্জেন্টিনার মাটিতে তার পা পরুক।’

কেবল ক্যাস্ত্রো নন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ, বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসেরও সমর্থক ছিলেন তিনি। ২০০৭ সালে শ্যাভেজের সাপ্তাহিক টিভি শোতে তিনি বলেন, ‘আমি শ্যাভেজপন্থি। ওর প্রতি আমার আস্থা আছে। ফিদেল কিংবা হুগো যা করছে সব ঠিক আছে।’ ২০১৭ সালে আমেরিকার মদদে ভেনেজুয়েলায় ডানপন্থিদের উত্থানের সময় প্রবল প্রতিবাদ করেছিলেন ম্যারাডোনা। বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে যা আসে সেটাকেই ঘেন্না করি আমি। সব শক্তি দিয়ে ঘেন্না করি।’ শ্যাভেজের মৃত্যুর পর ভেনেজুয়েলার বামপন্থি ব্যাটন আসে নিকোলাস মাদুরোর হাতে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামার ঘোষণা দিয়ে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘দরকার হলে মাদুরোর হয়ে সেনা সেজে আমি যুদ্ধে নামব, তবু সাম্রাজ্যবাদের দাসত্ব মেনে নেব না।’

লাতিন আমেরিকার নাগরিক জীবনের অসাম্য আর বঞ্চনা দূর করতে বামপন্থাই ছিল ম্যারাডোনার আস্থা। এখানে কোনো দিন আপস করেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত